মাইকেল কিমেজ পরামর্শ দিয়েছেন ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ এবং বিশ্বমঞ্চে তার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাকে মাথায় নিয়ে। চীন, রাশিয়া বা ভারত এই ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ ধারণাকেই তো ভাঙতে চায়। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক কিছুটা দোলাচলে আছে। কারণ, আঙ্কারার চোখ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নেই নিবদ্ধ। না হলে, সিরিয়ায় ইসরায়েলের বিজয়কেতন তুরস্কের হাত ধরে উড়ত না। কিমেজ সম্ভবত এটা দেখতে পাননি বা দেখলেও অন্যদের দেখাতে চাননি।
এখানে সিরিয়া প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন ইউক্রেনেও একটু নজর দেওয়া যাক। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত শত্রু রাশিয়াকে এই সময়ে বরং কাছে টানছে। হ্যাঁ বিরল মৃত্তিকা ধাতু, যা সংবাদমাধ্যমে মোটাদাগে বিরল খনিজ নামে প্রচার পাচ্ছে, তার হিসাব এর সঙ্গে আছে। কিন্তু তার সঙ্গে ভূরাজনৈতিক নানা মাপজোখও আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তো বটেই, এমনকি জো বাইডেন প্রশাসনও চীনকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। যাবতীয় মার্কিন নীতি এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেই স্নায়ুযুদ্ধের কালের মতো করে দেশে দেশে আবার সরকার ও প্রশাসন ধরে নানা নাড়াচাড়া হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত কয়েক বছরে হওয়া নানা পটপরিবর্তন সে কথাই বলে, যা সামনের দিনগুলোতে আরও হবে। বিশ্বের বহু দেশেই পোশাক বদলের মতো করে শাসক বদল হতে থাকবে অন্তত আরও কিছুদিন। ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ সম্পর্কিত ধারণা এবং তার স্বার্থরক্ষা মগজে বসে যাওয়ার কারণেই সম্ভবত মাইকেল কিমেজ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
ফলে ইউরোপ উচাটন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, এই ভাগ‑বাটোয়ারায় নিজেদের হিস্যাটা বুঝে নিতে হলে তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছটান দিলে নিজেদের একাট্টা করার চেষ্টা করাই তাদের জন্য একমাত্র পথ। সে পথে ইউরোপ হাঁটছেও। ইউক্রেন ইস্যুতেই তারা বারবার আলোচনায় বসছে। সর্বশেষ লন্ডনের বৈঠকে ইউরোপের ১৮টি দেশ একসঙ্গে বসেছিল। এটিই প্রমাণ করে যে, ইউরোপও তার সম্মিলিত ‘সভ্যতা’র ধারণাকে পুঁজি করতে চাইছে। সেটি আঁকড়ে ধরতে গিয়ে ইউরোপের তরফ থেকেও যদি একটি ‘প্যান ইউরোপিয়ান’ সভ্যতার নব সংজ্ঞায়ন হাজির করা হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কি অভিনব?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কি অভিনব কিছু? এমনটা কি আগে কখনো দেখা যায়নি? উত্তর হচ্ছে–না। এটা অভিনব তো নয়ই, বরং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তুঙ্গু বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এমন অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে। ১৯৩০‑এর মহামন্দার সময় এই একই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান সামনে ছিল। তখন এমনকি পরাশক্তি হিসেবেও দেশটির কোনো স্বীকৃতি বা সক্ষমতা ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোগুলোর মধ্যে চলা নিরন্তর সংঘাতে সে কোনো অংশ হতে চায়নি। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলোই, বিশেষত ব্রিটেন সে সময় বিশ্বের ভাগ্যবিধাতা ছিল। সে সময় সবার জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটা নিরাপদ দেশের হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল সবাইকে। যদিও নিজ দেশের ভেতরে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর ওপর পীড়ন ও উচ্ছেদ কার্যক্রমও অব্যাহত ছিল। পাশাপাশি ছিল বাণিজ্য। পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থান ঘোষণার ক্ষেত্রে এই বাণিজ্যই ছিল সেই তুল্যমূল্য, যা নির্ধারণ করে দিত কার সাথে কেমন সম্বন্ধ হবে তার।
সেই ১৯৩০‑এর মহামন্দার সময়ে মার্কিন নীতিটি ছিল আইসোলেশনিজম বা ‘স্বাতন্ত্র্যবাদ’‑এর। এর বাংলাটি স্বাতন্ত্র্যবাদের বদলে সংরক্ষণবাদ বা অবরুদ্ধবাদ বলাটা মনে হয় ভালো। কারণ, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির মূল ভাষ্যটি ছিল–ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চলের সংঘাতগুলোতে কোনোভাবেই জড়িয়ে না পড়া, আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে থাকা। অর্থাৎ, এক ধরনের একঘরে হয়ে থাকার নীতি নিয়েছিল দেশটি। যদিও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও স্বার্থ সংরক্ষণের নীতিটি অব্যাহত ছিল। আর বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে সে সময়ও উঠেছিল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপের বিষয়টি। অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটেই এই নীতি নেওয়া হয়েছিল। ফলে ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে হামলার আগ পর্যন্ত এই নীতিতে বড় কোনো বদল হয়নি। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র পুরোনো বিশ্বকাঠামোর দ্বন্দ্বগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে। এই নীতির পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দেশটির জড়িয়ে পড়া, যেখানে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার পরিসরের চেয়ে তার ক্ষতি হয়েছিল বেশি। একইসঙ্গে একটা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল দেশটির মানুষ।
হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফল যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালোভাবে কেউ ঘরে তুলতে পারেনি। এই এক ফলের ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্ব শাসন করছে দেশটি। কিন্তু এই সময়ে এসে প্রশ্ন উঠেছে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইউক্রেন, গাজাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে এবং তাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী পেল? বিশ্বব্যাপী ‘গণতন্ত্র প্রকল্প’ বেচতে গিয়ে তার ঝোলায় আসলে কী ঢুকল? প্রশ্নটি উঠছে আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাঁকবদলের সন্ধিক্ষণে এসে।
১৯৩০‑এর দশকের চেয়ে এই সময়ে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পার্থক্য এখানেই যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ঘোষিত এই স্লোগানে অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করছেন। আর আগের মতো নয়া পরাশক্তির হাতছানি নয়, বরং পরাশক্তির তকমা হারানো বা তা রক্ষার চেষ্টা রয়েছে এই ঘোষণার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে তাঁর বলা বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর মধ্যে ‘কানাডা দখল’, ‘গ্রিনল্যান্ড দখল’, ‘পানামা খাল দখল’, কিংবা ‘প্রতিরক্ষাকে যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে বদলে সমরায়ণের’ ভাষ্যগুলো বলে দেয় পরাশক্তির অবস্থানটি যেকোনো মূল্যে রক্ষা করাই তাঁর লক্ষ্য। ফলে ৩০‑এর দশকের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর চেয়ে এবারেরটি অনেকাংশেই আলাদা। কারণ, এত এত দখল তো আর সংঘাত ছাড়া সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে বিপজ্জনক পথে হাঁটছেন, তা হলো মার্কিন প্রযোজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া এবং পরিচিত মিত্রদের পিঠ দেখানো। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে যে, স্নায়ুযুদ্ধকালে আকার পাওয়া এবং স্নায়ুযুদ্ধের পর বিজয়কেতন ওড়ানো সেই ‘গণতন্ত্র’, ‘মানবাধিকার’, ‘আইনের শাসন’ ইত্যাকার অস্ত্রভাণ্ডারকে অযৌক্তিক এবং অনুসরণ‑অযোগ্য ঘোষণা করে ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ পরাশক্তি অভিধাটি কী করে রক্ষা করবেন?
এ ক্ষেত্রেই আলোচনায় ঢুকে পড়ে ১৯৫০‑এর দশকের মার্কিন নীতি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান, আইজেনহাওয়ার, জন এফ কেনেডি প্রমুখের নেতৃত্বে স্নায়ুযুদ্ধের সে সময়ে মোটাদাগে অ্যান্টি‑কমিউনিজম প্রচারযন্ত্র ও কর্মকৌশল প্রযুক্ত হয়েছিল। খেয়াল করুন, সে সময় উদারবাদকে দুর্বল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সময়েও কিন্তু তাই ঘোষণা করা হয়েছে। সে সময় টেকনোক্র্যাটদের দক্ষতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এবার ট্রাম্প প্রশাসনে ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের সংযুক্তি কিন্তু সে বার্তাই দেয়। পাশাপাশি ওই সময়ের মতো এখন আবার জাতীয়তাবাদী জজবা ও ক্লু‑ক্লাক্স‑ক্লানের মতো বিভিন্ন ধর্মবাদী ও জাতিবাদী কট্টর রক্ষণশীলদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র নামের দেশটি। ফলে এবারের ‘রক্ষণশীলতা’ বা ‘সংরক্ষণশীল’ অবস্থান অনেকটাই ১৯৩০ ও ১৯৫০‑এর দশকে অনুসৃত মার্কিন নীতির সমন্বয় বলা যায়।
এই রক্ষণশীলতাকে বুঝতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে। যেতে হবে হুইটেকার চ্যাম্বারস‑এর কাছে। তাঁর লেখা ‘উইটনেস’ নামের বইটি কমিউনিস্টবিরোধী এবং সেই সূত্রে উদারবাদবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রে রক্ষণশীলতার পৃষ্ঠপোষক ও প্রচারক হয়ে উঠেছিল। মার্কিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন সোভিয়েত চর হিসেবে কাজ করা হুইটেকারের আত্মজীবনী এটি। এটা এতটাই রক্ষণশীলতার প্রচারক হয়ে উঠেছিল যে, প্রথম প্রকাশক র্যানডম হাউস বইটির প্রচার সেভাবে করছে না মর্মে রক্ষণশীলদের প্রকাশনা সংস্থা রিজেন্সি হিস্টোরি বইটির স্বত্ব কিনে নেয়। এখনো এই প্রতিষ্ঠানই বইটির প্রকাশ ও প্রচার অব্যাহত রেখেছে। এর মূল ভাষ্যটি আসলে কী? মূল ভাষ্য হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটদের চিত্ত দৌর্বল্যের কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পেয়েছে।
হুইটেকারের যে ভাষ্যটি সে সময় সব ওলট‑পালট করে দিয়েছিল, তা হলো–অ্যালগার হিস একজন সোভিয়েত এজেন্ট। অ্যালগার হিস ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির ঘনিষ্ঠ। নীতি প্রণয়ন সম্পর্কিত নানা বিষয়ে তাঁর প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে হিসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন হুইটেকার। এই এক সাক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিকে ভয়াবহ বিপদে ফেলেছিল। এটা এতটাই যে, সে ঘটনার চার দশক পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তাঁর প্রশাসন এবং তাঁর সিআইএ প্রধান হিস ইস্যুতে ‘যথেষ্ট প্রমাণ’ নেই বলে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে এটি যে রক্ষণশীল রাজনীতির বড় অস্ত্র সাব্যস্ত হবে, তাতে সংশয়ের কিছু নেই। (চলবে)
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


নয়া বিশ্ব: ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে পৃথিবীটা কেমন চান
নয়া বিশ্ব: শি, পুতিন, মোদি বনাম নিঃসঙ্গ ইউরোপ
