মে দিবস বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক দিন। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনটি সারা বিশ্বে একযোগে ‘মহান মে দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম শ্রম ঘনত্বের এই দেশেও আজ বহুধা আয়োজনে পালিত হচ্ছে দিনটি। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে না তোলা, শ্রম বৈষম্য ও মজুরি বৈষম্যকে জিইয়ে রাখার বহুধা আয়োজনও সমানভাবে চলমান। এহেন আয়োজন-নিয়োজন দেখে সাধারণ একজন তেল, কালিমাখা কলারের মানুষগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে ভাবনার মধ্যে একটি বিষয় বারবার উকিঁ দিচ্ছে–দেশের সকল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা।
ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের শাসক শ্রেণির কাছে জনসংখ্যা কোনো সমস্যা নয়। কারণ, তারা জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করে সম্পদ হিসেবে দেখাতে চায়। ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা গেলে তা সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা। শাসক শ্রেণি তাই জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তর করার জন্য উদ্যোগী হয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এসব কর্মকাণ্ডে মানসম্মত জনশক্তি কতটা অর্জিত হচ্ছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ উদ্যোগগুলোয় যতটা না আন্তরিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়, তার থেকে বেশি ব্যবসায়িক মানসিকতা দৃশ্যমান। দেশে যেমন সরকারই থাক, এখানে রাজনীতি সমানভাবে সক্রিয়। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই শুধু আস্ফালন দিয়েই জনশক্তি তৈরির কাজ চলমান। শাসক শ্রেণির অবহেলায় দেশে মধ্যম স্তরের জনশক্তি দীর্ঘদিন দুই শতাংশের উপরে উঠতে পারেনি। অথচ ২০২০ সালে এই জনশক্তিকে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৪০ শতাংশ করার ঘোষণা করা হয়েছিল। করোনা ২০২০ সালের অর্জনকে বাধাগ্রস্থ করেছে বলে হয়তো টার্গেট পূরণ সম্ভব হয়নি। আশা করা যায় আগামী টার্গেটগুলো শাসক শ্রেণি পূরণ করতে সক্ষম হবে।
শাসক শ্রেণি নিজেদের টার্গেট পূরণে বিশাল কর্মকাণ্ডের জাল বিস্তার করেছে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণটাই পরিকল্পনাহীন। শাসক শ্রেণি স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এ পর্যন্ত কোনোদিন ভেবেও দেখেনি দেশ ও জাতির কল্যাণে জনশক্তির রূপ কেমন হওয়া প্রয়োজন। কোন পেশাজীবী কতজন প্রয়োজন? শুধু দরজা খুলে দিয়েছে, আপাতত বাজার ব্যবস্থার চাহিদা বিবেচনায় জনগণ শুধু দক্ষতা অর্জনের সনদ সংগ্রহ করছে। এই দক্ষতা কোথায়, কীভাবে ব্যবহার হবে, তার কোনো পরিকল্পনা না থাকায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো উপকার হচ্ছে বলে মনে হয় না। আবার সাধারণ মানুষের মনে কী হচ্ছে, তাতে শাসক শ্রেণির কিছু যায়‑আসে না। তারা তাদের গৃহীত কর্মযজ্ঞের কাহিনি প্রচারে ব্যস্ত।
দেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় সেবার মান ঠিক রাখতে টিমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। দেশে আজ জনগণের জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার নামে এলএমএফ কোর্স বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সবাইকে এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো হবে। এ ব্যবস্থায় বর্তমানে গ্রামের মানুষ চিকিৎসা সেবার অনেকটাই বাইরে, যেটুকু আছে সে সুযোগ গ্রহণও তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সীমিত। বাংলাদেশে একজন চিকিৎসকের দর্শনী ৫/৬ শত টাকা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে একজন নার্স রয়েছে; আর স্বাস্থ্যসহকারীদের কোনো অনুপাতই নেই। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্তিতে আমাদের অর্জন, সরকারের শত কড়াকড়ির পরও গ্রামে ডাক্তাররা থাকতে চায় না। এই ব্যবস্থা কি একটা স্বাধীন দেশের জনগণের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে? ব্যবস্থাপনা কোনো দায় না নিয়ে চিকিৎসকের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ কী? মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাবে এমন পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর অনেক শিক্ষার্থী আর এগিয়ে যেতে পারে না এবং মাধ্যমিকের পরও অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়। এসব শিক্ষার্থীর মানবসম্পদ পরিকল্পনার মধ্যে আনা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বৃহৎ অংশের জন্য দেশ ও জাতির প্রয়োজন বিবেচনায় জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনা চাই। উচ্চশিক্ষার দ্বার মেধা ও দেশের প্রয়োজন বিবেচনায় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শিক্ষানীতিতে আছে “চার বছরের সম্মান স্মাতক ডিগ্রিকে সমাপনী ডিগ্রি হিসেবে এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষকতা ব্যাতীত অন্য সকল কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।” কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের আগে থামতে চান না। আমাদের মর্যাদাভিত্তিক সমাজও এই দায় এড়াতে পারবে না। ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স করে ব্যাংকে চাকরি করছে, অফিস সহকারীর দায়িত্ব পালন করছে, চাকরির সাথে কর্মের যোগসূত্র নেই–কিন্তু সে বিবেচনা করার সময় কারও নেই। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কৃষিবিদরা প্রশাসনে কাজ করছেন। দেশের অনক্ষর অনাহারী মানুষদের কষ্টের করের টাকায় এসব পেশাজীবী তৈরি হয়, কিন্তু তারা তা বিশ্বাসই করেন না। নিজেদের মেধা ও অভিভাবকের সামর্থ্যকেই পেশাজীবী হবার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালনকারী উপাদান মনে করে স্ব-স্বার্থে নিবেদিত থাকে। রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ যে প্রকারান্তে দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায় সম্ভবপর হয়, সে সামান্য বিবেচনাবোধটুকুও বোধকরি তারা হারিয়েছে।
বাংলাদেশ এমন দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আরও বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত। নিয়মিত বিরতিতে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চলছে। সরকার সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভুলে গিয়েছে। সরকারের কাছে সব পেশাজীবীর সাথে সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আছে। শিল্প বিশ্ববিদ্যালয়, আইন বিশ্ববিদ্যালয়, চামড়া বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি দাবির সাথে আবার শিক্ষানীতিতে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, তথ্য-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষায় বাংলাদেশকে বিশ্বের রোল মডেল করতে বোধ করি এমন শিক্ষার বিস্তারের ব্যবস্থা চলমান। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তো বলতেই চাই না। দেশে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে বাধ্যবাধকতা আছে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তাও নেই। সরকার যদি তাদের গৃহীত শিক্ষানীতির প্রতি ন্যূতম আন্তরিক হতো, তাহলে দেশে এত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা চলত না। প্রশাসনসহ সর্বত্র স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী যারা আছেন, তাদের শিক্ষায় ও গবেষণায় পদায়ন করা হোক।
জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে দেশে এখনই মানবসম্পদ পরিকল্পনা শুরু করা প্রয়োজন। যেই পরিকল্পনায় সাধারণ মানুষ থাকবে। দেশ-বিদেশ বিবেচনায় কোন পেশার কতজন পেশাজীবী প্রয়োজন তার একটা হিসেব হবে। সে মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। সেখানে যা পড়ানো হবে, তার সাথে বাজার চাহিদার সমন্বয় করা হবে। বাজার চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন বিষয় খোলার ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষা অনুযায়ী কর্মের ব্যবস্থা হবে। মেধা ও চাহিদার ভিত্তিতে সবার উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। সবার জন্য বাধ্যতামূলক মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। সরকারের সামর্থ্য বিবেচনায় দেশে সবার বেতন ও পদোন্নতির সমান সুযোগ থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল দেশ ও জাতির কল্যাণে এমন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা । কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বপ্নে পাওয়া উন্নয়নের মধ্যে নিবেদিত আছে। কয়েকদিন আগে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক জানালেন চাকরির প্রথম পদোন্নতি পেতে তার ১৮ বছর এবং দ্বিতীয়টা পেতেও ১৮ বছর মোট ৩৬ বছর পার হয়ে গেল। এ বছরই চাকরি শেষ, তাই পরের পদোন্নতির সুযোগ আর নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান নিয়ামক শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতার লক্ষণ এমনটাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখছে সরকার তার প্রশাসনে পদের তিনগুণ লোককে পদোন্নতি দিচ্ছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষকদের প্রাপ্ত ন্যূনতম পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে না পারলে কী হবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের পুষ্টি পূরণে অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে জানানোর কাজে নিজেদের শ্রম ও মেধা ব্যয় করছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]