ঠিক ২ মাস ৬ দিন আগের কথা।
দিনের নিখুঁত হিসাব করলে, ৬৭ দিন আগে। ঘণ্টা ও মিনিটের হিসাবে আর না যাই। বড্ড ক্লান্ত লাগে যে! শুধু ক্লান্তিই বা বলছি কেন? সেই সঙ্গে এই শেষ জ্যৈষ্ঠের আকাশে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির মতো হাজির হওয়া কালো মেঘগুলোর মতোই একরাশ বিষণ্ণতা জমা হয় মনজুড়ে। মাসের হিসাব করলে যেহেতু সংখ্যার পরিমাণগত আকার কম হয়, তাই কালো মেঘের ঘনত্বও হয়তো কিছুটা কমে। দিন পার করে ঘণ্টা, মিনিটে, সেকেন্ডে গেলে তা এমন আকার নেয় যে, মাঝে মাঝে এভারেস্টের উচ্চতাকেও বড্ড খাটো বোধ হয়!
কী ভাবছেন? রোমান্টিক কিছুর গন্ধ শুঁকছেন? না, না। মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট বা সেকেন্ডের এই হিসাবের সঙ্গে কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলা, বা কোনো সুখকর মুহূর্তের স্মৃতি রোমন্থন জড়িত নয়। সংশ্লিষ্ট আছে বরং হাজার হাজার অসুখী মুখ। সেইসব মুখেদের দেখে তাদের পরিবারগুলোর আরও হাজার হাজার মুখ ঈদের দিনেও হাসি ছাড়া থাকে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় ভিজতে ভিজতে হয়তো কিছুটা কেঁদেও নেয় অনুচ্চারে। হাজার হোক, প্রকৃতি একটু আড়াল, আবডাল তো তৈরি করে দেয়! অন্তত এই দেশের কিছু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত, কথা দিয়ে কথা না রাখা প্রতারক বা প্রবঞ্চকদের মতো অবিনশ্বর নির্লজ্জতা উপহারের ডালিতে সাজিয়ে প্রদর্শন করে না।
যাক গে। এখন চলুন, টাইম মেশিন ছাড়াই ৬৭ দিন আগে ফেরত যাওয়া যাক। এ দেশে কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে পেছনের দিকে যেতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে বর্ণিত টাইম মেশিন লাগে না। কিছু বিষয় আমাদের এই বাংলাদেশে চিরায়ত সত্যের মতো হয়ে থাকে। সেগুলোর কোনো অতীত নেই। সবই বর্তমান।
সেদিনটাও ছিল ঈদের দিন, ঈদুল ফিতর। ৩১ মার্চ ২০২৫‑এ একটা লেখা লিখতে হয়েছিল। শিরোনাম ছিল–‘যে দেশে ঈদের দিনে শ্রমিক কাঁদে’। হ্যাঁ, এ দেশের অনেক দুর্ভাগা শ্রমিক সেদিন কান্নাস্নাত মনেই ঈদের দিনটি অতিবাহিত করেছিলেন। ঈদের আগের রোজার দিনগুলোতেও এই মানুষগুলো শান্ত মনে ইবাদতের বদলে, ন্যায্য পাওনার দাবিতে রাজধানীর পথে নেমেছিলেন। ঈদের আগের ৭ দিন ধরেই টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা বেতন‑বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা পুরো বেতন‑বোনাস পাননি। শ্রম ভবনের সামনেই তাঁরা দিনের পর দিন ইফতার করেছিলেন, সেহরি করেছেন। টানা আন্দোলনের পরও মালিক পক্ষ তাদের পূর্ণ বেতন‑বোনাস দেয়নি সেবার। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারও পারেনি। শেষে একটি কারখানার শ্রমিকদের পাওনার একটি অংশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, ঈদুল ফিতরে এসব কারখানার শ্রমিকদের অবস্থা ছিল প্রায় রিক্ত। চোখে ছিল জলও।
ঈদুল ফিতরে টিএনজেড গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করতে অনেকটাই বাধ্য হয়েছিলেন। সেবার সরকারের পক্ষ থেকে আবারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় দৈনিক প্রথম আলো’তে প্রকাশিত এ‑সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল–‘টিএনজেড গ্রুপ: সচিবের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত শ্রমিকদের’। সচিব আশ্বাস দিয়েছিলেন, ঈদের পর বেতন‑ভাতা পুরোপুরি পরিশোধের ব্যবস্থা করার।
হা হতোস্মি। এক ঈদ গিয়ে আরেক ঈদের দিনেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে আবার পাওয়া গেল সেই ঠুনকো আশ্বাসই। এবারও ঈদুল আজহার আগ থেকেই আন্দোলনে ছিলেন টিএনজেড গ্রুপের কারখানার বঞ্চিত শ্রমিকেরা। বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে টিএনজেড গ্রুপের ডিরেক্টর শাহীনের বাসার সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা। ফলাফল কী, জানেন? ঈদের আগের দিন রাতে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামই এক্ষেত্রে যথেষ্ট। ‘প্রশাসনের আশ্বাসে উত্তরায় মালিকপক্ষের বাসার সামনে থেকে সরলেন টিএনজেড শ্রমিকরা’!
অর্থাৎ, আবারও সেই আগের অভিজ্ঞতা। ঈদুল ফিতরের আগে যেভাবে আন্দোলন স্থগিত করতে বাধ্য হয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই এবারও সরে যেতে হলো শ্রমিকদের নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের অবস্থান থেকে। আরে, মালিকপক্ষের বাসা বলে কথা! এতটুকু সুবিধা পকেটে পুরে না দিতে পারলে সরকারের কি মান থাকে?
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, বৃহস্পতিবার (৫ জুন) বিকেল ৫টা থেকে শ্রমিকরা অবস্থান শুরু করেন। টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচির পর শুক্রবার (৬ জুন) বিকেল ৪টায় ঈদের কথা বিবেচনা করে ও জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে তাঁরা কর্মসূচি স্থগিত করেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত শ্রমিকদের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্চ মাস থেকে বকেয়া বেতনের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছেন তাঁরা। গত ২০ মে ‘মার্চ টু যমুনা’ কর্মসূচির পর টিএনজেড কর্তৃপক্ষ ২৯ মে’র মধ্যে ৫ হাজার শ্রমিককে ৫৪ কোটি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই তারিখে মাত্র ২২ কোটি টাকা পরিশোধ করে এবং পরে মাত্র ২৫০ জন শ্রমিক ও স্টাফকে সম্পূর্ণ বেতন দেওয়া হয়। বাকি প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক এখনও বকেয়া মজুরি থেকে বঞ্চিত।
একবার ভেবে দেখুন। বেতন‑ভাতা বঞ্চিত শ্রমিকদের সংখ্যাটা প্রায় ৫ হাজার। ৫‑এর পর আরও তিনটা ০ বসাতে হবে। একবার ৫ হাজার মানুষের একটা জমায়েতের কথা কল্পনা করুন। এর সঙ্গে পরিবারের সদস্যসংখ্যার হিসাব করলে নিদেনপক্ষে আরও ১০ হাজার মানুষ যুক্ত হবে সেই জমায়েতে। তাতে দুধের শিশু থাকবে, কারও বৃদ্ধ বাবা‑মা থাকবে, থাকবে এবারের ঈদে লাল রঙের শাড়ি‑ফিতা কিনতে চাওয়া বধূ, হয়তো থাকবে স্ত্রীর উপার্জনের টাকা দিয়ে আরেকটু ভালোভাবে বাজার করার স্বপ্ন দেখা কোনো স্বামীও। বঞ্চিত ও মনোকষ্টে ভোগা হাজার হাজার মানুষের সেই জমায়েতের করুণ মুখগুলো সইতে পারা যাবে কতক্ষণ?
শুধু টিএনজেডের শ্রমিকেরা নন। বাংলাদেশের সব ধরনের শ্রমিকদের অবস্থাই তথৈবচ। প্রত্যেকবার ঈদের সময় এলেই শোনা যায় বেতন‑বোনাসের আহাজারি। পোশাকশ্রমিকদের ক্ষেত্রে এর মাত্রা আরও বেশিই হয়। এবারের ঈদুল আজহার আগেও এমনটাই শোনা গেছে। সব সময়ই এ নিয়ে থাকে আশঙ্কার প্রবল উপস্থিতি। আবার মালিকপক্ষের দাবির সঙ্গে অন্যদের দাবি মেলেও না। যেমন: এবার প্রায় শতভাগ তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক মে মাসের বেতন ও ঈদের বোনাস পেয়েছে বলে দাবি করেছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটি বলছে, মাত্র কয়েকটি কারখানায় বেতন-বোনাস দিতে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শিল্প পুলিশ বলছে, ৪৩ শতাংশ কারখানার শ্রমিক মে মাসের বেতন পায়নি।
এখন পরিস্থিতির সঠিক চিত্রটি আঁকবে কে? করা উচিত সরকারের পক্ষ থেকেই। কিন্তু এক টিএনজেডের শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই সরকারের যা পারফরম্যান্স, তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো উপলক্ষ নেই। গত ঈদুল ফিতরের আগ থেকে সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক আশ্বাসই কেবল দেওয়া হচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে সেসব আশ্বাসের বরখেলাপ করা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও এই একটি ক্ষেত্রে কোনো হায়া‑শরমের বালাই আছে বলে মনে হয় না। ওই বস্তুটি ন্যূনতম পরিমাণে থাকলেও অন্তত বারংবার আশ্বাস দেওয়া নিয়ে তাঁরা হয়তো কিছুটা হলেও লজ্জিত বোধ করতেন।
ফলতঃ সরকারের দেওয়া আশ্বাসে আর বিশ্বাস রাখা খুবই কঠিন। উল্টো বেশ কিছু প্রশ্ন ওঠে সজোরে। যেমন: এ দেশের সরকারের চেয়েও কি শক্তিশালী এই টিএনজেড গ্রুপ? একটা কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে না পারা ‘সবকিছু করার’ ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার আরও বড় পরিসরের রাষ্ট্রীয় সংস্কার করবে কীভাবে? রাজনৈতিক সরকারের না হয় নানা ধরনের স্বার্থ থাকে, স্বার্থের সংঘাত থাকে, সেসবের বলি সাধারণ শ্রমিকেরা হয় বলে প্রচলিত। তা, বর্তমানের অরাজনৈতিক সরকারের ‘স্বার্থ’টা আসলে কোথায়? কথায় কথায় পুরোনো বন্দোবস্তকে উপড়ে ফেলা সরকার কেন প্রতিশ্রুত নতুন বন্দোবস্ত আনয়নের কথা শুনিয়েও কয়েক হাজার শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায় করে দিতে পারল না? তাহলে কি সেই পুরোনো ব্যবস্থাই চলছে নতুন ব্যবস্থাপনায়? তবে কি এই দেশে শ্রমিক কাঁদানোর সরকারই চিরন্তন বাস্তবতা? এটিই কি সব সময় ‘দরকার’?
একটি বিষয় স্পষ্ট যে, গত দুই ঈদেও টিএনজেড কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা না পাওয়ার পেছনে অনেকগুলো পক্ষ দায়ী। মালিকপক্ষ, সরকার, আমলা শ্রেণি, বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা রাজনৈতিক শক্তি–সবাইকেই এর দায় নিতে হবে। কারণ তারা সবাই মিলেই ব্যর্থ। কী জানি, এটি হয়তো তাদের কাছে ব্যর্থতাই নয়। এই পুঁজির দুনিয়ায় কারও লোকসান মানেই তো কারও না কারও পেট ফোলানো লাভ!
হয়তো এভাবেই হাজার হাজার শ্রমিকের শুকনো মুখগুলোকে উপেক্ষায় পাশ কাটিয়ে বড় বড় কোরবানির পশু কিনেছে কেউ। কোরবানির অবশ্য পালনীয় নিয়ম হলো–সেটি সৎ উপায়ে উপার্জিত অর্থে হতে হয়। কিন্তু আমাদের এই দেশে সততা ও অসততার মধ্যকার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হওয়া সীমানা কে আর মানে!
শুধু একটা কথা মনে রাখা জরুরি। আজ নাহয় কারও চোখের জলে থুতু ছিটিয়ে নিজের আয়েশ বাগিয়ে নিলেন। কাল বা পরশু, কিংবা তরশু, ওই হাজার হাজার মানুষের থুতু নিজের মুখকে ভাসিয়ে দিলে ঠিকঠাক বিশুদ্ধ অক্সিজেন টানতে পারবেন তো নাকে‑মুখে? হাজার হাজার টিস্যু পেপারেও ওই ঘেন্না কিন্তু মুছবে না!
শেষটায় চলুন এক নতুন কাউন্টডাউন শুরু করা যাক, সামনের বছরের ঈদুল ফিতরের আগে ‘আশ্বাস’ শোনার অপেক্ষায়। ওই সময়ও নিশ্চয়ই সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের নিউজফিড ভরে উঠবে নতুন কোনো কারখানার অন্য কোনো হাজারো শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ের আন্দোলনের সংবাদে। যে সরকারই থাকুক, যে প্রশাসনই থাকুক, তারা তখনও নিশ্চয়ই আশ্বাস দেবে। সেই আশ্বাস শোনা পর্যন্তই চলবে এই কাউন্টডাউন। মন খারাপ করবেন না। তাদের আর কী‑ইবা দেওয়ার আছে, আশ্বাস ছাড়া!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



