জাতি হিসেবে এমন কিছু সময় আসে, যখন চুপ থাকাটা হয় বিশ্বাসঘাতকতা। যখন ক্রমাগত বাধ্য থাকাটা আত্মহত্যারই শামিল, আর যে হাত আপনাকে গলা টিপে ধরছে, সেই হাতের কাছে মাথা নত করাটা আর কূটনীতি থাকে না, তা হয় স্রেফ আত্মসমর্পণ। আমার নাম ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। পেশাদার কূটনীতিকদের মতো আমার কথায় তেমন মসৃণতা নেই। আমার গায়ে মাখা নেই বহুজাতিক কোম্পানির উঁচু মহলের সুগন্ধি। আমি ওয়াশিংটনে প্রশিক্ষণ নিইনি, জেনেভাতেও গড়ে উঠিনি। আমি কথা বলছি সেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে, যেখানে আমার মানুষের রক্ত ঝরেছে এবং এই মাটি তার সাক্ষী। আমি কথা বলছি এমন এক জাতির পক্ষে, যাদের দীর্ঘকাল ধরে দাদন ব্যবসায়ীর জালে বন্দীর মতো ব্যবহার করা হয়েছে।
আজ আমি সরাসরি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর সঙ্গে কথা বলছি–কম্পিত হাতে নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফ্রিকার যন্ত্রণা এবং এখন আফ্রিকার জাগরণের গভীরে প্রোথিত এক কণ্ঠস্বরে। দীর্ঘকাল ধরে আইএমএফ নিজেদেরকে অসুস্থ জাতিগুলোর জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপত্রদানকারী এক দয়ালু চিকিৎসক হিসেবে জাহির করে এসেছে। কিন্তু আমরা যা শিখেছি, যা ভোগ করেছি, তা হলো–আপনার ওষুধ প্রায়শই রোগীকে মেরে ফেলে। আপনাদের ঋণ হাসিমুখ নিয়ে আসে, কিন্তু সেগুলো চুক্তিতে মোড়ানো বিষাক্ত তীর। আপনারা স্থিতিশীলতার কথা বলেন, কিন্তু উপহার দেন শ্বাসরোধ। আপনারা সংস্কারের কথা বলেন, কিন্তু যা আপনারা প্রকৃতই বোঝান, তা হলো–বিদেশি গবেষণাগারে তৈরি মডেলের প্রতি আনুগত্য–যা আফ্রিকার মাটির জন্য কখনোই তৈরি হয়নি।
কিন্তু আমরা আপনার পরীক্ষাগার নই। আমরা আপনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ নই। আমরা আপনার অর্থনৈতিক দাবা খেলার ঘুঁটি নই। বুরকিনা ফাসো ও গোটা আফ্রিকা জেগে উঠছে। আর যখন আমরা জেগে উঠি, তখন শ্বাস নেওয়ার জন্য অনুমতি চাই না। আপনারা জানেন, আমি ঋণ বাতিলের কারণে কাকুতি-মিনতি করতে আসিনি। আমি ত্রাণ ভিক্ষা করতেও আসিনি। আমি আপনাদের বলতে এসেছি তা‑ই, যা কোনো আফ্রিকান নেতা যথেষ্ট উচ্চস্বরে বলার সাহস করেননি। আমরা আর এমন অর্থনৈতিক নীতি মেনে নিই না, যা আমাদের জনগণকে ভিখারীতে পরিণত করে। যখন আমাদের সোনা পশ্চিমা দেশগুলোর ভল্টে বন্দী থাকে, তখন আমরা আর এমন শর্তাবলীর তালে নাচি না, যা আমাদের সরকারি পরিষেবা, আমাদের কৃষকদের শেষ করে দেয় এবং আমাদের যুবকদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। আমরা আর এটা মেনে নিই না যে, সুশাসন মানে হাসি-হাসি মুখের পরামর্শকদের সাথে আমাদের জাতীয় সম্পদ বিদেশি সংস্থাগুলোর হাতে তুলে দেওয়া। তাই আজ আমরা একটি নতুন আলাপ শুরু করছি। ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে নয়, বরং সমকক্ষদের মধ্যে, জাতিগুলোর মধ্যে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে। আর এটা কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি নয়। এটা হিসাব চুকানোর সময়। এবং এটা এখনই শুরু হচ্ছে।
এক, এই ঋণের শেকল হলো আধুনিক দাসত্বের এক রূপ। আসুন আমরা স্পষ্টভাবে কথা বলি–কোনো সুভাষণ ছাড়া, কূটনীতির ভদ্র মিথ্যাচার ছাড়া। যে ঋণ আপনারা আফ্রিকাকে দিচ্ছেন, তা উন্নয়নের কোনো হাতিয়ার নয়। এটি সমৃদ্ধির কোনো সেতু নয়। এটি একটি শেকল। এটি আধুনিক দাসত্ব, যা স্যুট ও স্প্রেডশিটের আড়ালে ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। আপনারা এটাকে কাঠামোগত সমন্বয় বলেন। আমরা বলি, কাঠামোগত শাস্তি। আপনারা এটাকে আর্থিক শৃঙ্খলা বলেন। আমরা এটাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হতাশা হিসেবে অনুভব করি। আপনারা এটাকে অংশীদারত্ব হিসেবে প্রস্তাব করেন। কিন্তু যখন একজন অংশীদার লাভবান হয় আর অন্যজন রক্ত ঝরায়, তখন তা অংশীদারত্ব থাকে না। তা হয় লুণ্ঠন।
আমাকে জিজ্ঞেস করতে দিন, সোনা, ইউরেনিয়াম, কোবাল্ট ও উর্বর জমিতে সমৃদ্ধ একটি জাতি কীভাবে দরিদ্র হতে পারে? যে মহাদেশ বিশ্বের শিল্পকে সচল রাখে, সে কীভাবে তার নিজের সন্তানদের খাওয়াতে পারে না? আমাদের বলা হয়, এটা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অদক্ষতা। হ্যাঁ, আফ্রিকার ক্ষত আছে, কিন্তু সেই ক্ষতগুলোর অধিকাংশই তৈরি করেছে তারাই, যাদের হাত ছিল সুদের ব্যান্ডেডে মোড়ানো। আমি আপনাদের বলি এই ঋণ বাস্তব জীবনে কেমন দেখায়, তা বোঝা যায়–আপনাদের পাওয়ারপয়েন্ট স্লাইডে নয়, বরং আমাদের রাস্তায়।
এটি এমন যে, শিশুরা মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করছে, কারণ জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল এবং তা অচল হয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক কিছু বিক্রি করা হয়েছিল। তারা এখন এমন দাম চাইছে, যা আমাদের জনগণ দিতে পারে না। এটি এমন হাসপাতালের মতো দেখায়, যেখানকার বেড সব ভাঙা, অ্যান্টিবায়োটিক নেই এবং মায়েরা সন্তান প্রসবের সময় মারা যাচ্ছেন। কারণ আপনাদেরই শর্ত ছিল, আপনাদের সাহায্যের জন্য আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে। এটি হাতে ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ আফ্রিকান স্নাতকের ভবিষ্যৎহীনতার মতো দেখায়। কারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতগুলো আউটসোর্স করা হয়েছে, বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে অথবা উদারীকরণ নীতির অধীনে ধসে পড়েছে। সবচেয়ে খারাপ হলো, এটি ভেঙে পড়া মর্যাদার মতো দেখায়।
আপনারা দেখেন, আপনারা যে ঋণ বা পাওনা পরিশোধের পরিকল্পনা তৈরি করেন, তা কোনো অর্থনৈতিক সূত্র নয়। সেগুলো মৃত্যুর পরোয়ানা। আপনারা আমাদের ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেন এবং কয়েক দশক ধরে সুদ নির্ধারণের ফি, মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারিকরণ ধারার মাধ্যমে ২০০ কোটি ডলার ফেরত চান, যা আমাদের জাতীয় সম্পদ কেড়ে নেয়। আমাকে বলুন, এর নৈতিক যৌক্তিকতা কী? আপনারা বলেন, চুক্তিগুলো স্বেচ্ছায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু আমাকে জিজ্ঞাসা করতে দিন, যখন রোগীর রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং ওষুধ নিয়ে কেবল আপনিই মূল্যতালিকা ও শর্তসহ দাঁড়িয়ে আছেন, তখন কি তা সম্মতি হয়? যখন বন্দুক আপনার মাথার দিকে নয়, বরং আপনার পেছনে থাকা অনাহারী শিশুর দিকে তাক করা থাকে, তখন কি তা পছন্দ হয়? কী বলবেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মহোদয়গণ?
এটা সম্মতি নয়। এটা অর্থনৈতিক জবরদস্তি। এটা উন্নয়ন নয়, আধিপত্য। এটা বিশ্বায়ন নয়। এটা আর্থিক দড়িতে বাঁধা নব্য-ঔপনিবেশিকতা। এবং আমরা, আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব আর অন্ধ নই। আমাদের শ্রমের তৈরি টেবিল থেকে ঝরে পড়া টুকরো রুটির জন্য আমরা আর কৃতজ্ঞ নই। দক্ষতার নামে আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নীতিগুলোর জন্য হাততালি দেওয়া আমাদের শেষ। আমরা আর আমাদের সার্বভৌমত্বকে এমন ঋণের বিনিময়ে বিক্রি করব না, যা শুধু পরামর্শকদের হাতে হারিয়ে যায় এবং পরে আমাদের নাতি-নাতনিদের জন্য ঋণ হয়ে ফিরে আসে।
আমাকে আরও স্পষ্ট করে বলতে দিন। আফ্রিকা আপনার কাছে ঋণী নয়। আপনি আফ্রিকার কাছে ঋণী। ঔপনিবেশিক বুটের চাপে পিষ্ট করে নিয়ে যাওয়া সোনার জন্য আপনি আমাদের কাছে ঋণী। আপনার স্মার্টফোনগুলোকে শক্তি জোগানো খনিজ পদার্থের জন্য আপনি আমাদের কাছে ঋণী, অথচ আমাদের গ্রামগুলো অন্ধকারে ডুবে থাকে। আমাদের নীরব রক্তক্ষরণের সময় আপনার প্রাসাদগুলোকে ঝলমলে করে তোলা হীরার জন্য আপনি আমাদের কাছে ঋণী। তবুও, এতকিছুর পরও, আমরা করুণা চাইছি না। আমরা ন্যায়বিচার চাইছি।
প্রকৃত ন্যায়বিচার শুরু হয় শোষণমূলক ঋণ কাঠামোর অবসানের মধ্য দিয়ে। ন্যায়বিচার মানে আফ্রিকান জাতিগুলোকে নিরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া যে, আমরা ঋণ কত, তা কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী, তা যাচাই করতে পারব। ন্যায়বিচার মানে আমাদের নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎ তৈরির মর্যাদা দেওয়া, গ্রাহক হিসেবে নয়, বরং সমকক্ষ হিসেবে। আর যদি এই বার্তা অস্বস্তিকর মনে হয়, তবে ভালো। কারণ আরামদায়ক পরিস্থিতিতে থাকা মানুষদের সংঘাতে নামার সময় এসেছে। পুতুল নাচের সাজানো বুলি বুঝিয়ে দেয়, কীভাবে আইএমএফ আফ্রিকার সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে। আজ আফ্রিকায় সার্বভৌমত্বের কথা বলা মানে একটি স্থগিত স্বপ্নের কথা বলা, যা পতাকা আর জাতীয় সংগীতের এক মহাদেশ।
কিন্তু যখন প্রত্যাখ্যানের মূল্য নিশ্চিত ক্ষুধার্ত থাকা, তখন সুপারিশগুলো কীসের? যখন পরবর্তী ঋণ এবং পরবর্তী শ্বাস-প্রশ্বাস আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে, তখন প্রস্তাবগুলো কীসের? আসুন আমরা এমন ভান না করি যে, আপনারা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সব বুঝে গেছেন। আমাদের বলা হয়েছিল যে, কাঠামোগত সমন্বয় দক্ষতা তৈরি করবে। পরিবর্তে, এটি নির্ভরতা তৈরি করেছে। আমাদের বলা হয়েছিল যে কৃচ্ছ্রতা দুর্নীতি দূর করবে। পরিবর্তে, এটি আশাকে দূর ঠেলেছে। আমাদের বলা হয়েছিল যে, মুক্তবাজার আমাদের ওপরে ওঠাবে। পরিবর্তে, এটি আমাদের সম্পদ ওপরে তুলে বিদেশে পাচার করেছে। এবং যখন আমাদের জনগণ প্রতিবাদ করে, যখন তারা ক্রোধে, ক্ষুধায় এবং অপূর্ণ চাহিদার যন্ত্রণায় জেগে ওঠে, তখন আপনারা দায়িত্ব নেন না।
আপনারা পিছিয়ে যান। দাবি করেন, আপনারা কেবল দর্শক। কিন্তু ইতিহাস দেখছে। আপনারা ধোয়া তুলসি পাতা নন। ঘানা থেকে জাম্বিয়া, সেনেগাল থেকে কেনিয়া–আমরা একই ঘটনা ঘটতে দেখছি। পানি পর্যন্ত বেসরকারিকরণ করতে নেতাদের বাধ্য করা হয় শুধুমাত্র বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য। তারা যাতে দাম বাড়িয়ে পানিকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। সস্তা আমদানির মাধ্যমে কৃষকদের দুর্বল করা হয়, যা স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংস করে। মন্ত্রীদের বাজেট ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্কুলের খরচ কমাতে বলা হয়, যেখানে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাড়তে থাকে। যদি আমরা প্রতিরোধ করার সাহস করি, যদি আমরা আপনাদের মডেলগুলোকে প্রশ্ন করি বা আপনাদের প্রেসক্রিপশন প্রত্যাখ্যান করি, তাহলে আমরা কালো তালিকাভুক্ত হই। আমাদের ক্রেডিট রেটিং কমানো হয়, আমাদের মুদ্রার ওপর আক্রমণ করা হয়, আমাদের নেতাদের আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে উগ্রবাদী, অস্থির বা জনতোষণবাদী হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়।
কিন্তু একটি দেশকে তার জনগণকে খাওয়ানো এবং যে ঋণ থেকে সে কখনোই উপকৃত হয়নি, সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করার চেয়ে বেশি উগ্রবাদী কী হতে পারে? এমন একটি সমাজ, যেখানে তরুণদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কোনো চাকরি নেই এবং রাজনীতির ওপর কোনো আস্থা নেই, তার চেয়ে আর কী বেশি অস্থির হতে পারে? কারণ, জাতি তার জনগণের জবাবদিহি করার আগে ব্যাংকগুলোর কাছে জবাবদিহি করে। আসুন আমরা সৎ হই। আপনাদের প্রভাব প্রায়শই আমাদের স্বপ্নের ওপর একটি ভেটো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনারা আফ্রিকার নীতির অলিখিত গভর্নর হয়ে গেছেন। তবুও আমরা জেগে উঠছি।
এই মহাদেশজুড়ে এক নতুন বাতাস বইছে। আমরা নিজেদের শাসন করার অধিকার এবং নিজস্ব মূল্যবোধ দ্বারা জনগণের জন্য আমাদের ভাষাকে পুনরুদ্ধার করছি। আমরা আর এমন ঋণ মেনে নেব না, যা ধনীদের কর দিতে বলার আগে আমাদের অপরিহার্য পরিষেবাগুলো কাটছাঁট করতে বাধ্য করে। আমরা আর এমন পরামর্শকদের সহ্য করব না, যারা আমাদের জাতীয় কৌশলগুলো তৈরি করে, অথচ আমাদের অধ্যাপকেরা বেতন পান না। আমরা আর এমন প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা নত করব না, যারা নাগরিকদের কাছে নয়, বরং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করে।
আইএমএফ-এর প্রতি আমি স্পষ্ট ও শান্তভাবে বলছি: আমরা সার্বভৌম থাকব, এমনকি যদি এর অর্থ হয় আপনাদের ঋণ প্রত্যাখ্যান করা, তারপরও। এমনকি যদি এর অর্থ হয় ধীর প্রবৃদ্ধি, কিন্তু তা আমাদের নিজস্ব। এমনকি যদি এর অর্থ হয় আপাতত কষ্ট, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীনতা। আফ্রিকার আর পণ্ডিতের প্রয়োজন নেই। তার অংশীদার প্রয়োজন। আর যদি আপনারা আমাদের সাথে সমানভাবে চলতে না পারেন, তাহলে সরে দাঁড়ান। কারণ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এবং এবার এগোনোর সুতোটা কেটে দেওয়া হচ্ছে।
আমরা এমন একটি ব্যবস্থায় জন্ম নিয়েছি, যা আমরা তৈরি করিনি। সাম্রাজ্যবাদিতার আগুনে তৈরি একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা, যা সম্পদ লুণ্ঠিনের জন্য চুক্তি, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিকতা দান করে, যা আজও আমাদের শাসন করে চলেছে। যখন উপনিবেশবাদীরা চলে গিয়েছিল, তখন তারা ন্যায্যতা রেখে যায়নি। তারা এমন কাঠামো রেখে গিয়েছিল, যা ক্ষমতাকে নয়, বরং শোষণকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৈরি হয়েছিল।
আপনারা দেখুন, সমস্যা শুধু আইএমএফ নয়। এটি পুরো কাঠামো–বাণিজ্য, অর্থ, ঋণ ও বৈশ্বিক ক্ষমতার সেই সমস্ত নিয়ম, যা আফ্রিকাকে নিচে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ঈশ্বর দ্বারা নয়, প্রকৃতি দ্বারা নয়, বরং মানুষ দ্বারা তৈরি। শক্তিশালী মানুষেরা, যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, মূল্যের অর্থ কী ঠিক করার এবং কে এর যোগ্য তা নির্ধরণের। আমাকে একটি সহজ প্রশ্ন করতে দিন: কেন আমরা, বিশ্বের ৬০% আবাদযোগ্য ভূমির মহাদেশ হয়েও, এখনও খাদ্য আমদানি করি? কেন আমরা, যারা সোনা, হীরা, তেল ও লিথিয়ামের ওপর বসে আছি, আমাদের বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন হয়? কারণ, আপনাদের খেলাটা কখনোই ন্যায্য ছিল না। আমাদের কাঁচামালের রপ্তানিকারক বানানো হয়েছিল, শিল্পের নির্মাতা নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আমাদের পাঠ দেওয়া হয়েছিল একটি বিয়োগান্তক নাটকের অভিনেতাদের মতো। আপনারা উৎপাদন করেন, তারা প্রক্রিয়াজাত করে। আপনারা আহরণ করেন, তারা উৎপাদন করে। আপনারা ঋণ নেন, তারা ঋণ দেয়। প্রতিবার যখন আমরা চিত্রনাট্য বদলের চেষ্টা করি, তখনই শাস্তি নেমে আসে।
ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি, বহুজাতিক লবিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়। প্রযুক্তি জায়ান্টরা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়। তাদের মিডিয়া আমাদের অস্থির বলে আখ্যায়িত করে। কিন্তু একটি মহাদেশ, যেখানে ১৪০ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে কম অবদান রাখে, অথচ সবচেয়ে বেশি ভোগে, সেই বিশ্বের চেয়ে আর কী বেশি অস্থির হতে পারে? কোকো চাষী এবং কৃষকেরা, যারা বিশ্বের মিষ্টি চাহিদা পূরণ করে, তারা চকোলেট কিনতে পারে না–এর চেয়ে বেশি আর কী অযৌক্তিক হতে পারে? যেসব দেশ একসময় উপনিবেশ স্থাপনকারী ছিল, তারা এখন আমাদের সুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছে। অথচ আফ্রিকার অভিজাতদের চুরি করা সম্পদ তাদের ব্যাংকগুলোতে নিশ্চিত আশ্রয় পাচ্ছে–এর চেয়ে বড় আর কী অন্যায় হতে পারে?
তবুও তারা এই ব্যবস্থাকে মেধাভিত্তিক শাসন বলে। তারা বলে আরও কঠোর পরিশ্রম কর। তারা বলে আরও স্বচ্ছ হও। তারা বলে বিনিয়োগ আকর্ষণ কর। কিন্তু তারা যা বলে না, তা হলো: স্কোরবোর্ডে শুরু থেকেই কারচুপি করা ছিল। নিয়মগুলো কখনোই নিরপেক্ষ ছিল না। এবং রেফারিরা: ডব্লিউটিও, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ–সেই একই দলের সেবা করে, যারা সবসময় জিতেছে। আমাকে একটি উদাহরণ দিতে দিন। যখন আমরা ভর্তুকি দিয়ে স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা করার চেষ্টা করি, তখন আমাদের বলা হয় এটি বাজারকে নষ্ট করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ প্রতি বছর তাদের নিজেদের কৃষকদের জন্য শত শত বিলিয়ন খরচ করে এবং এটাকে সুরক্ষা বলে। যখন আমরা কর্মসংস্থান তৈরির জন্য রাষ্ট্রীয় শিল্প গড়তে চেষ্টা করি, তখন আমাদের বলা হয় এটি অদক্ষ ব্যবস্থা।
অথচ তাদের সবচেয়ে ধনী করপোরেশনগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত উদ্ভাবন–নাসা থেকে, যুদ্ধের চুক্তি থেকে, সরকারি গবেষণা থেকে জন্ম নিয়েছে। যখন আমরা শোষণমূলক খনিজ চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানাই, তখন তারা বলে আমরা ব্যবসার প্রতি বিরূপ। কিন্তু ১০০ ডলার মূল্যের সম্পদ আহরণ করে মাত্র তিন ডলার মূল্যের স্কুল রেখে যাওয়া কি আরও বেশি বিরূপতা নয়? আফ্রিকা সহানুভূতি চাইছে না। আমরা ন্যায্যতা দাবি করছি, করুণা নয়; ন্যায়বিচার, ভিক্ষা নয়; সমান অবস্থান। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে নবীন মহাদেশ। তবুও বৈশ্বিক অর্থনীতি আমাদের এমনভাবে দেখে, যেন আমাদের কাছে শ্রম আর ভূমি ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই। কিন্তু আমাদের মূল্য আমাদের মাটির নিচে যা আছে, তাতে নয়। তা আছে আমাদের মানুষের মধ্যে।
আমি সবার মনের কথাই এখানে বলব। তারা বলেছিল, ‘সিস্টেম কাজ করে।’ আমরা বলি, কার জন্য? এখন সময় হয়েছে আমাদের বাদ দিয়ে লেখা নিয়মগুলো মেনে চলা বন্ধ করার এবং সেগুলোকে আমাদের নিজেদের মতো করে নতুন করে লেখার। আমরা সেতু পোড়াতে চাই না, তবে আমরা এমন সেতু দিয়ে হাঁটব না, যা কেবল আরও কঠিন শেকলের দিকে নিয়ে যায়। তাই পরিষ্কারভাবে শুনুন: আমরা ভাঙা নই। এই ব্যবস্থাটিই ভাঙা। এবং যদি এটি স্বেচ্ছায় পরিবর্তিত না হয়, তাহলে আমরা সানকারা, নক্রুমা, লুমুম্বা এবং আমাদের সন্তানেরা তা করব। কারণ, আমরা এত দূর কেবল টিকে থাকার জন্য আসিনি। আমরা এসেছি সমৃদ্ধির জন্য এবং আমরা তা করার জন্য আর অনুমতির অপেক্ষা করব না। আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে নতুন সার্বভৌমত্ব অর্জন করব। এখন যেহেতু আমরা অন্যায়ের কথা বলছি, আসুন পুনর্জন্মের কথা বলি। আফ্রিকাকে অন্তর্ভুক্তির জন্য ভিক্ষা করতে হবে না। আফ্রিকার কোনো ত্রাণকর্তা, কোনো বক্তৃতা, কোনো শর্তের প্রয়োজন নেই।
আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন পথ, যা আমাদের নিজেদের হাতে তৈরি হবে, আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হবে এবং আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধে প্রোথিত থাকবে। আত্মনির্ভরশীলতা বিচ্ছিন্নতা নয়। এটি অহংকার নয়। এটি মর্যাদার পুনরুদ্ধার–নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত, এমনকি যখন আমাদের পায়ের নিচে মাটি কাঁপে তখনো। আমাকে স্পষ্ট করে বলতে দিন–আমরা অংশীদারত্ব প্রত্যাখ্যান করছি না। তবে আমরা এর শর্তাবলী নতুন করে লিখতে চাই।
দীর্ঘদিন ধরে, অংশীদারত্ব মানে ছিল নির্ভরতা। এর অর্থ ছিল অনুমোদন, অনুদান এবং ঋণের জন্য অপেক্ষা করা। যখন আমাদের জনগণ অনাহারে ভুগছিল এবং আমাদের তরুণেরা সাগর পাড়ি দিচ্ছিল, তখনকার কথা। এটা অংশীদারিত্ব নয়। এটা বন্ধুত্বপূর্ণ হাসিতে মোড়ানো দাসত্ব। তাই আমাদের ভিন্নভাবে গড়ে তুলতে হবে।
আর এটা শুরু হচ্ছে পাঁচটি নীতি দিয়ে। প্রথমত, আগে খাওয়ার ব্যবস্থা করা। কোনো জাতিই প্রকৃত সার্বভৌম নয়, যদি সে তার জনগণকে খাওয়াতে না পারে। যখন অন্য দেশের খরা আমাদের রুটির দাম নির্ধারণ করে, তখন আমরা স্বাধীনতার কথা কীভাবে বলতে পারি? আমাদের কৃষিতে বিনিয়োগ করতে হবে। এটা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং শক্তির স্তম্ভ হিসেবে। কৃষি বীজের সার্বভৌমত্ব থেকে শুরু করে সেচ পর্যন্ত, সমবায় কৃষি থেকে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত। আফ্রিকাকে টিকে থাকার অবস্থা থেকে প্রাচুর্যের দিকে উঠতে হবে। প্রতিটি গ্রামকে খাদ্য সুরক্ষার দুর্গ হতে দিন। আর জাতিকে শিক্ষিত ও মুক্ত করার নির্মাতা হতে দিন প্রতিটি কৃষককে।
উপনিবেশবাদ সবচেয়ে বিপজ্জনক যে অস্ত্রটি রেখে গিয়েছিল, তা বন্দুক ছিল না। সেটি ছিল সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম। এটি এমন একটি পাঠ্যক্রম, যা আমাদের বিদেশি রাজাদের সম্পর্কে শেখায়, কিন্তু আমাদের নিজেদের বীরদের সম্পর্কে কিছু বলে না; যা বিদেশি দার্শনিকদের প্রশংসা করে, কিন্তু আফ্রিকার বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও জ্ঞানকে উপেক্ষা করে।
আমাদের অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে গড়তে হবে। এমন শিশুদের গড়ে তোলার জন্য কাজ করতে হবে, যারা তাদের মূল্য জানে। যারা উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু তৈরি করে, যারা গর্বের সাথে উদ্ভাবন করে। আসুন আমরা ফসলের পাশাপাশি কোডিং শেখাই। আমাদের স্কুলগুলো স্বাধীনতার পরীক্ষাগার হোক। আমাদের শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য শিক্ষা দিতে হবে।
কাঁচামাল আফ্রিকা থেকে চলে যায়। আর তৈরি পণ্য হয়ে ১০ গুণ বেশি দামে ফিরে আসে। এভাবেই এই দস্যুতা বাণিজ্যের মুখোশ পরে আসে। আমাদের স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে, উৎপাদন করতে হবে এবং উদ্ভাবন করতে হবে। শুধু খনির মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়। আমাদের শোধন, প্যাকেজিং এবং মুনাফা অর্জনের উপায়গুলোরও মালিক হতে হবে।
আমাদের আফ্রিকান ব্যবসাগুলোকে সমর্থন করতে হবে। আমাদের নবীন শিল্পগুলোকে রক্ষা করতে হবে এবং আমদানির প্রতি আসক্তি বন্ধ করতে হবে। এভাবেই আমরা কর্মসংস্থান তৈরি করব। এভাবেই আমরা আমাদের সীমান্তের মধ্যে সম্পদ ধরে রাখব।
পৃথিবী আফ্রিকায় আসুক, শুধু নেওয়ার জন্য নয়, বরং কেনার জন্য। একটি খণ্ড-বিখণ্ড আফ্রিকা হলো একটি দুর্বল আফ্রিকা। আমরা ৫৪টি বিচ্ছিন্ন কণ্ঠস্বর নিয়ে বিশ্বের সাথে আলোচনা করতে পারি না। আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে একীভূত হতে হবে।
আসুন আমরা এমন রেলপথ তৈরি করি, যা লেগোসকে ডার-এর সাথে সংযুক্ত করে। ডেটা সেন্টার তৈরি করি, যা আমাদের জ্ঞানকে রক্ষা করে এবং প্রতিরক্ষা জোট গঠন করি, যা আমাদের শান্তি রক্ষা করে। ইকোয়াস (ECOWAS), সাডেক (SADC), আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU)–তাদেরকে কূটনীতির ক্লাব থেকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে পরিণত হতে হবে। কোনো একক আফ্রিকান জাতি নিজে দাঁড়াতে পারে না, কিন্তু যূথবদ্ধ হলে আমরা আসলেই এক দৈত্য।
পঞ্চমত, আমাদের জনগণের ওপর আস্থা রাখুন। প্রায়শই আমাদের নেতারা স্থানীয় জ্ঞানের চেয়ে বিদেশি পরামর্শের ওপর বেশি ভরসা করেন। তারা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এমন প্রশ্ন করতে যান, যার উত্তর তাদের নিজস্ব জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই দিয়েছে। সমাধান এখানেই আছে–আমাদের তরুণদের হাতে, আমাদের নারীদের হাতে, আমাদের প্রবীণদের হাতে।
আসুন আমরা স্থানীয় উদ্ভাবনে অর্থায়ন করি। আসুন আমরা গ্রামের কণ্ঠস্বরকে প্রশস্ত করি। আসুন আমরা বিশ্বাস করি যে, উয়াগাদুগুর মেকানিক এবং কিগালির কোডার প্যারিসের যেকোনো পরামর্শকের মতোই প্রতিভাবান। আমাদের নিজস্ব জনগণকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আস্থা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা স্বাধীন হব না।
আমার ভাই ও বোনেরা, আমরা পশ্চিমের কোনো প্রতিরূপ তৈরি করছি না। আমরা আফ্রিকা তৈরি করছি, আমাদের আফ্রিকা। আমরা অন্যদের পুরনো স্বপ্নের পেছনে ছুটছি না। আমরা একটি নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস করছি। আত্মনির্ভরশীলতার অর্থ হতে পারে, আমরা হোঁচট খাব। এর অর্থ, আমরা ভুল করব। কিন্তু সেই ভুলগুলো হবে আমাদেরই এবং সেগুলোর মধ্য দিয়েই আমরা উঠে দাঁড়াতে শিখব।
কোনো ত্রাণকর্তা আসছে না। ত্রাণকর্তা ইতিমধ্যেই এখানে, আমাদের হাতে, আমাদের হৃদয়ে, আমাদের ঐক্যে। আসুন আমরা অপেক্ষা করা বন্ধ করি। আসুন আমরা দোষারোপ করা বন্ধ করি। আসুন আমরা শুরু করি। কাল নয়। পরবর্তী সম্মেলনের পরও নয়।
তবে শুধু বক্তৃতা দিয়ে আফ্রিকা জেগে উঠবে না। এটি জেগে উঠবে মাটি-লাগা হাতে, কালি-লাগা বইয়ে এবং ইস্পাত-লেগে থাকা কারখানায়। আসুন আমরা যা সবসময় আমাদের ছিল, তা ফিরিয়ে নিই। যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে; ঘৃণার মাধ্যমে নয়, আরোগ্যের মাধ্যমে; ভিক্ষা করে নয়, বরং নির্মাণের মাধ্যমে। এটি আত্মনির্ভরশীলতার ভোর। এবং আমরা কখনোই শেকলের দিকে ফিরে যাব না। কারণ, আমার কাছে জনগণের ম্যান্ডেট আছে। আপনারা ক্ষমতাহীন নন।
আমার প্রিয় জনগণ, তরুণ ও বৃদ্ধ, শহর ও গ্রামের, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সবাই, আপনারা ক্ষমতাহীন নন। আপনাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যে, ক্ষমতা কেবল স্যুট পরা মানুষদের হাতে, মাইক্রোফোনের পেছনে থাকে। বিশ্বাস করানো হয়েছে যে, ভবিষ্যৎ তাদের দ্বারা নির্ধারিত হয়, যারা বহু দূরে উঁচু দালানে বসে থাকে। অথচ আপনাদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত এমন বদ্ধ কক্ষে নেওয়া হয় যেখানে আপনাদের কষ্টের কোনো জানালা নেই।
কিন্তু আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রকৃত ক্ষমতা ওপর থেকে শুরু হয় না। এটা নিচ থেকে শুরু হয়। এটা আপনাদের কাছ থেকে শুরু হয়।
যে কৃষক ভোরের আগে ওঠে, যে মা নিজের আগে সন্তানদের খাওয়ায়, যে সৎ মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলেও চুরি করতে অস্বীকার করে, যে মেয়েটি প্রতিদিন পাঁচ মাইল হেঁটে পড়তে যায়, রাস্তার বিক্রেতা, মেকানিক, নার্স, দর্জি, শিক্ষক, জলবাহক–আপনারাই ভিত্তি। আপনারাই আফ্রিকার প্রাণ স্পন্দন। কিন্তু এখানে একটি ট্র্যাজেডি আছে।
আপনাদের শেখানো হয়েছে অপেক্ষা করতে। অপেক্ষা করতে এই আশায় যে, পরিবর্তন অন্য কারও কাছ থেকে আসবে। যখন আপনাদের পায়ের কাছে রুটির টুকরো ছোঁড়া হয়, তখন হাততালি দিতে হয়। কর্তৃপক্ষের ওপর প্রশ্ন করতে ভয় পেতে হয়, এমনকি সেই কর্তৃপক্ষ আপনাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেও।
এই মানসিকতার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের এই অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে। যে দেয়াল নেতাদের থেকে জনগণকে, যারা খবর রাখে তাদের থেকে যাদের কথা শোনা হয় না, অভিজাতদের থেকে প্রতিদিনের নায়কদের আলাদা করে রাখে।
কারণ, প্রকৃত নেতৃত্ব শাসন করে না, সেবা করে। আর জবাবদিহি ছাড়া সেবা ছদ্মবেশী স্বৈরাচার। কেন এই ব্যবস্থা আপনাদের ক্ষমতাহীন দেখতে পছন্দ করে?
আমরা আজ যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছি–আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, তারা শুধু সরকারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তারা আপনার নীরবতার ওপর নির্ভর করে। যখন আপনি প্রতিরোধে খুব ক্লান্ত, যখন বেঁচে থাকার চিন্তায় আপনি এতই বিক্ষিপ্ত থাকেন যে, সংগঠিত হতে পারেন না, যখন আপনাকে শেখানো হয় যে, রাজনীতি নোংরা এবং আপনার উদ্বেগের বিষয় নয়–তখনই তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কিন্তু এটা বুঝুন: প্রতিটি মূল্য বৃদ্ধি, প্রতিটি ব্যর্থ হাসপাতাল, প্রতিটি ভূমি দখল–এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এবং যুক্ত না হয়ে, প্রশ্ন না করে, আমরা নিজেরাই নিজেদের নিপীড়নে জড়িত হয়ে পড়ি।
তবে, একবার জনগণ জেগে উঠলে, পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তরুণেরা একবার নীরব থাকতে অস্বীকার করলে, একবার মায়েরা ক্ষমতার কাছে সত্য কথা বললে, একবার প্রবীণরা তাদের কণ্ঠের শক্তি মনে করালে–শুধু আইএমএফ নয়, কোনো স্বৈরশাসক নয়, কোনো পাপেট শাসকও টিকতে পারবে না। এটা হতে পারে, প্রতিবাদ থেকে অংশগ্রহণের দিকে। বিপ্লব সবসময় জ্বলন্ত বিস্ফোরণ নয়। কখনও কখনও এটি শান্তও হয়।
এটি ঘটে যখন একজন তরুণ ভোটার হিসেবে নাম নিবন্ধন করে। যখন একজন নারী ঘুষ দিতে অস্বীকার করে। যখন প্রতিবেশীরা সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে একটি ভাঙা রাস্তা ঠিক করার জন্য একত্রিত হয়। এটি কেবল প্রতিরোধ করার জন্য নয়, পুনর্নির্মাণের জন্যও আপনাদের ম্যান্ডেট।
এবং এটি করার জন্য আমাদের পাঁচটি পবিত্র অধিকার পুনরুদ্ধার করতে হবে:
⦁ প্রশ্ন করার অধিকার। জিজ্ঞাসা করুন–কেন। জিজ্ঞাসা করুন–কীভাবে। স্পষ্টতা দাবি করুন। গ্রামের প্রধানই হোক বা প্রেসিডেন্ট–কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আপনাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
⦁ সংগঠিত হওয়ার অধিকার। হাতে হাত মেলান। ইউনিয়ন তৈরি করুন। সমবায় গঠন করুন। ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়ান।
⦁ তথ্য জানার অধিকার। জানুন কে আপনার জমি দখল করে আছে এবং আপনার কর কোথায় যায়।
জ্ঞানই শক্তি, এবং এটি আপনাদের অধিকার। প্রত্যাখ্যান করার অধিকার। অন্যায় প্রত্যাখ্যান করুন। কারসাজি প্রত্যাখ্যান করুন। ঘুঁটি হতে অস্বীকার করুন। প্রতিরোধই আপনাদের পবিত্র উত্তরাধিকার।
স্বপ্ন দেখার অধিকার। শুধু পালানোর নয়, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখুন। আপনার সন্তানেরা যে আফ্রিকার যোগ্য, সেই আফ্রিকার ছবি আঁকুন এবং আজ থেকেই তা তৈরি করা শুরু করুন।
এটি কেবল সরকারের জন্য একটি লড়াই নয়। হ্যাঁ, নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। হ্যাঁ, দুর্নীতি অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। হ্যাঁ, পুতুল শাসনের অবশ্যই পতন হতে হবে। কিন্তু একটি ন্যায়পরায়ণ আফ্রিকা কেবল রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে না।
এর জন্য প্রয়োজন একটি জাগ্রত জনগোষ্ঠী। এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা আপস করতে রাজি নয়। এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা আর ভয় দ্বারা শাসিত হবে না, বরং দৃঢ় বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হবে।
আপনারা দর্শক নন। আপনারা নতুন আফ্রিকার সহ-স্থপতি। প্রতিটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি কণ্ঠস্বর মূল্যবান। প্রতিটি ঢেউ এক‑একটি তরঙ্গে পরিণত হয়।
আফ্রিকার তরুণদের বলছি, আপনারা ভবিষ্যতের নেতা নন। আপনারা আজকের আগুন। অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবেন না। তহবিলের জন্য অপেক্ষা করবেন না। আরও বৃদ্ধ, জ্ঞানী বা ধনী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। এখনই শুরু করুন। এখনই কথা বলুন। এখনই সংগঠিত হন। এখনই তৈরি করুন। কারণ, যদি আপনারা নিজেদের নিয়তি গড়ে না তোলেন, তাহলে অন্যরা তা বিক্রি করে দেবে।
প্রবীণদের বলছি, আমাদের আপনাদের প্রজ্ঞা প্রয়োজন, আপনাদের নীরবতা নয়। আপনারা শাসন ব্যবস্থার উত্থান-পতন দেখেছেন। আপনারা কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা এবং আশার মুখোমুখি হয়েছেন। এখন সময় এসেছে তরুণদের পথ দেখানোর–নৈরাশ্য দিয়ে নয়, সাহসের সাথে।
মায়েরা আমার, আপনারাই প্রতিটি বিপ্লবের মেরুদণ্ড। আপনাদের বাহুতেই জাতি গড়ে ওঠে। বিশ্বকে আপনাদের দুর্বল বলতে দেবেন না। আপনারাই ন্যায়বিচারের প্রহরী।
আফ্রিকার প্রতিটি শ্রোতার প্রতি বলছি, এটা কেবল ইব্রাহিম চাকারের একার লড়াই নয়। এটা আমাদের সম্মিলিত ম্যান্ডেট–সত্য দাবি করার, ভয়কে প্রত্যাখ্যান করার, এবং এমন একটি মহাদেশ গড়ে তোলার, যা অবশেষে তার জনগণের মর্যাদাকে সম্মান জানায়।ক্ষমতা এমন কিছু নয়, যা দেওয়া হয়। এটা এমন কিছু, যা অনুভব করতে হয়। আর আজ আপনাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, আপনারা ক্ষমতাহীন নন। এমন একটি হিসাব চুকানো চাই, যা আপনাদের ভয় পায়।
আমার প্রিয় আফ্রিকার পুত্র ও কন্যারা, এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝেছেন যে, আমরা বন্দুকের যুদ্ধে নেই। আমরা আছি আখ্যানের, নিয়ন্ত্রণের ও ভয়ের যুদ্ধে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের শেকলবদ্ধ করে রেখেছে, যাদের আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বলা হয়, অথবা সেই নীরব অভিজাত শ্রেণি, যারা কখনো মুখ দেখায় না–তারা আমাদের সেনাবাহিনীকে ভয় পায় না। তারা ভয় পায় আমাদের জাগরণকে। কারণ একটি জাগ্রত আফ্রিকা এক বিপজ্জনক জিনিস।
যে খেলা তারা কয়েক দশক ধরে এত ভালোভাবে খেলে এসেছে, তারা বিশ্বকে বলেছিল যে, আফ্রিকাই সমস্যা। আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত, আমরা শাসন করতে অক্ষম, আমরা নির্ভরশীল, আদিম এবং সর্বদা সাহায্যের প্রয়োজন হয় আমাদের। তারা আমাদের এতবার এই মিথ্যাগুলো বলেছিল যে, আমরা নিজেরাই সেগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। তাই আমরা ভিক্ষা করি, আমরা ঋণ নিই, আমরা মাথা নত করি।
কিন্তু এমনটা করতে গিয়ে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, আমরা কারা। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আফ্রিকা সভ্যতার আঁতুড়ঘর। এখানেই আমাদের আকাশের নিচে, প্রথম তারাদের পাঠ করা হয়েছিল। ভুলে গিয়েছিলাম যে, আমাদের পূর্বপুরুষরাই বিশ্বকে শিখিয়েছিলেন ওষুধ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কৃষি ও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে।
আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আইএমএফ আসার আগে টিমবুকতু ছিল। উপনিবেশিক সাহায্য আসার আগে এমন দেশ ছিল যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, সেনাবাহিনী, বাণিজ্য পথ এবং শাসন ব্যবস্থা ছিল, যা ছিল মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত।
আমরা দরিদ্র ছিলাম না। আমাদের দরিদ্র করা হয়েছিল।
তারা সবচেয়ে বেশি কী ভয় পায়–আপনাদের একটি সত্য বলি। এমন সত্য, যা তারা কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে কখনোই প্রকাশ করবে না।
তাদের ক্ষমতা নির্ভর করে আপনাদের অজ্ঞতার ওপর। তাদের আরাম নির্ভর করে আপনাদের নীরবতার ওপর। তাদের সম্পদ নির্ভর করে আপনাদের শোষণের ওপর। তাই যখন আপনারা পড়তে শুরু করেন, তখন তারা আতঙ্কিত হয়। যখন আপনারা সংগঠিত হন, তখন তারা কাঁপে। যখন আপনারা সীমান্ত পেরিয়ে একীভূত হন, তখন তারা ষড়যন্ত্র করে।
কেন? কারণ, আমরা এমন এক প্রজন্মের আফ্রিকান, যারা খেলাটা বোঝে, যারা ‘সাহায্য প্যাকেজ’ ও ‘মৃত্যু ফাঁদ’-এর বাইরে দেখতে পায়, যারা স্বল্পমেয়াদী বিভ্রমের জন্য নিজেদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করতে অস্বীকার করে–এমন এক প্রজন্মকে থামানো অসম্ভব। তারা আপনাদের ক্রোধকে ভয় পায় না, ভয় পায় আপনাদের স্পষ্টতাকে। তারা আপনাদের অস্ত্রকে ভয় পায় না, ভয় পায় আপনাদের প্রজ্ঞাকে। তারা আপনাদের প্রতিবাদকে ভয় পায় না, ভয় পায় আপনাদের উদ্দেশ্যকে।
বছরের পর বছর ধরে তারা নির্লজ্জভাবে আমাদের কাছ থেকে লুট করে নিয়ে গেছে–সোনা, তেল, হীরা, কোকো, ইউরেনিয়াম। তবুও আমরা বিশ্বের দরিদ্রতম মহাদেশ রয়ে গেছি। না, এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা নকশা করে করা হয়েছে।
তবে, তারা যা আশা করেনি, তা হলো: আমরা জেগে উঠব, আমাদের জনগণ বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করবে। আমরা মিথ্যাগুলো উন্মোচন করব। আমরা তাদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস করব: ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং সত্য দিয়ে। আর সত্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র। এই হিসাব চুকানো প্রতিশোধের জন্য নয়। এটা ন্যায়বিচারের জন্য। এটা পুনরুদ্ধারের জন্য, মর্যাদার জন্য।
এটাই বিশ্বকে বলার সময়, ‘আমরাই আপনাদের পাওনাদার’। এবং এখন হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার সময়। এই পরিবর্তনকে উল্টানো যাবে না। কারণ, একবার মানুষ তাদের খাঁচার লোহার শিকগুলো দেখতে পেলে, তারা সেটিকে আর স্বাধীনতা বলে ভুল করে না। একবার মানুষ সার্বভৌমত্বের স্বাদ পেলে, তারা আর উচ্ছিষ্টের জন্য ভিক্ষা করে না। আর একবার মানুষ মনে করতে পারলে তারা কারা, তখন তারা আর মিথ্যার অপশাসনে থাকে না।
সুতরাং হ্যাঁ, প্রতিরোধের প্রত্যাশা করুন, প্রচারণার প্রত্যাশা করুন, অনুপ্রবেশের প্রত্যাশা করুন, হুমকির প্রত্যাশা করুন। কারণ যখন একটি সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে, তখন বিভ্রম ধরে রাখার জন্য এরা সবকিছু করবে।
তবে তাদের ভয় আপনাদের পিছু হটার সংকেত নয়। এটিই আপনাদের নিশ্চিত করবে যে, আপনারা সঠিক কিছু করছেন। এটাই আপনাদের সময়। আফ্রিকা, এটা আপনাদের মুহূর্ত। আগামী বছর নয়, বা পরবর্তী নির্বাচনের পরও নয়। এখন!
আপনাদের কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই। আপনাদের উদ্দেশ্য প্রয়োজন। আপনাদের ত্রাণকর্তার প্রয়োজন নেই। আপনাদের কৌশল প্রয়োজন। আপনাদের করুণার প্রয়োজন নেই। আপনাদের ক্ষমতা প্রয়োজন। এমন ক্ষমতা, যা ঐক্য, ইতিহাস ও অটল সত্যে প্রোথিত।
প্রতিটি আফ্রিকান নেতাকে জানতে দিন, যদি তারা জনগণের সেবা না করে, তবে জনগণ জেগে উঠবে। প্রতিটি বিদেশি বিনিয়োগকারীকে জানতে দিন, যদি তারা শোষণ করতে আসে, তবে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে।
আর আফ্রিকার প্রতিটি তরুণকে জানতে দিন, আপনাদের সময় এসে গেছে। আপনারা তাদের দুঃস্বপ্ন, যারা আমাদের নীরবতার ওপর ভর করে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। আপনারা আপনাদের পূর্বপুরুষদের সেই স্বপ্ন, যা অবশেষে জেগে উঠেছে।
শেকল ভাঙছে। মালিকদের পতন হচ্ছে। হিসাব চুকানোর সময় এসে গেছে। তাদের ভয় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, এটাই আপনাদের জাগরণ। আমরা আফ্রিকান হিসাব চুকানোর যুগে প্রবেশ করেছি। আমার কণ্ঠস্বর শুনছে এমন প্রতিটি তরুণ আফ্রিকানকে বলছি।
প্রত্যেক প্রবীণ, যারা সত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং ফিসফিস করে গল্প শুনিয়েছেন; প্রত্যেক মা, যারা খালি প্লেট সামনে নিয়ে অটল আশায় প্রার্থনা করেন; প্রত্যেক শিশু, যারা ধুলোমাখা পথে খালি পায়ে হেঁটে আরও বড় কিছুর স্বপ্ন দেখে–এখন আমার কথা স্পষ্ট করে শুনুন।
আফ্রিকান হিসাব চুকানোর যুগ শুরু হয়েছে। সহিংসতা দিয়ে নয়, ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং সত্য দিয়ে, স্পষ্টতা দিয়ে, শতাব্দীর পর শতাব্দীর অন্যায়ের আগুনে পোড়ানো দৃঢ় সংকল্প দিয়ে।
আমরা আর ভিক্ষা করছি না। আমরা ঔপনিবেশিক টেবিলের উচ্ছিষ্ট নিয়ে দর কষাকষি করছি না। আমরা আফ্রিকান প্রজন্মের জন্য আফ্রিকান কাঠ দিয়ে, আফ্রিকান হাতে খোদাই করে আমাদের নিজেদের টেবিল তৈরি করছি।
নীরবতা থেকে বজ্রনাদে–সর্বত্র আমরা। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের কান্নাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। আমাদের ব্যথাকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। আমাদের কষ্টকে পুঁজি করা হয়েছে, আমাদের নীরবতাকে আমাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা কথা বলছি–তিক্ততা দিয়ে নয়, সাহসিকতার সাথে। করুণা চাওয়ার জন্য নয়, ন্যায়বিচার দাবি করার জন্য।
তারা ভেবেছিল আমরা মাটির নিচে চাপা পড়েছি, কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে, আমরা বীজ। বিশ্বকে এটা শুনতে দিন: আফ্রিকা উদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করছে না। আফ্রিকা নিজেকে রক্ষা করতে জেগে উঠছে। আমরা বিদেশি হাতে তৈরি করা সীমান্ত পেরিয়ে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি। আমরা এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি, যা জনগণকে সেবা করে, কাঠপুতুলদের নয়।
আমরা আমাদের আখ্যান, আমাদের মুদ্রা, আমাদের ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার করছি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের আটকে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর মধ্য দিয়ে এই ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হোক: আমরা জেগে উঠেছি এবং যা কিছু চুরি হয়েছে, তার সবকিছু ফিরিয়ে নিতে আমরা আসছি।
তরুণদের বলছি, আপনারাই স্থপতি। আফ্রিকার তরুণেরা, আপনারা পথহারা নন। আপনারা দেরিতে আসেননি। আপনাদের কেউ ভুলে যায়নি। আপনারা পুনর্জন্ম নেওয়া এক মহাদেশের স্থপতি। আপনারা শুধু আগামীকালের নেতা নন। আপনারা আজকের মুক্তিদাতা।
আপনাদের অস্ত্র আপনাদের মন। আপনাদের ঢাল আপনাদের ইতিহাস। আপনাদের কম্পাস আপনাদের বিবেক এবং আপনাদের লক্ষ্য।
আফ্রিকান আত্মাকে পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। জনগণের সাথে একটি নতুন চুক্তি। আজ থেকে, কোনো নেতা যেন আফ্রিকার নামে কথা না বলেন, যদি তিনি বিদেশি প্রভুদের কাছে মাথা নত করেন, এমন কোনো চুক্তি যেন সই না হয়, যা বিদেশি ঋণের জন্য ভবিষ্যৎ বিক্রি করে। কোনো পতাকা যেন উদ্যাপনে উড্ডীন না হয়, যদি তার নিচে জনগণ অনাহারে থাকে। আমরা ভূমি ও জনগণের মধ্যে, অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সবকিছুর মধ্যে একটি নতুন চুক্তি ঘোষণা করছি।
আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্মান জানাব, তাদের বন্দীদশার পুনরাবৃত্তি না করে। আমরা আমাদের উত্তরসূরিদের আশীর্বাদ করব এই নিশ্চয়তা দিয়ে যে, তারা মর্যাদায় জন্মাবে, ঋণে নয়। এটাই আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।
এই মুহূর্ত, এই হিসাব চুকানো আমার সম্পর্কে নয়। এটি কোনো একক সরকার, কোনো একক বক্তৃতা বা কোনো একক প্রতিবাদ সম্পর্কেও নয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক জাগরণ, একটি পূর্বপুরুষদের বিদ্রোহ, একটি প্রজন্মের আগুন, যা ভয় বা বিদেশি হাতের দ্বারা নিভিয়ে ফেলা যাবে না।
সুতরাং, সমস্ত আফ্রিকানদের হৃদয়ে এটি লিখিত থাকুক: আমরা শিকার হিসেবে নয়, বরং স্বপ্নদর্শী হিসেবে জেগে উঠব। আমরা ক্ষমা করব, কিন্তু আমরা কখনোই ভুলব না।
আমরা শান্তির জন্য আমাদের হাত বাড়িয়ে দেব, কিন্তু আনুগত্যে মাথা নত করব না।
আফ্রিকা, মনে রেখো–তুমি কে। তুমি পৃথিবীর হৃদস্পন্দন। তুমি সময়েরও আগে থাকা সূর্য। তুমি মানবতার জরায়ু। তুমি পূর্বপুরুষদের ফিসফিসানি। তুমিই আগামীকালের প্রভু।
আফ্রিকা, মনে রেখো–তুমি কে।
সিংহরা জেগে উঠুক। নদী গান করুক। মাটি আনন্দিত হোক। কারণ, আমরা আর পথভ্রষ্ট নই। আর আমরা কিনতে প্রস্তুত নই। আমরা আর ঘুমিয়ে নেই।
এবং তাই আমি ঘোষণা করছি মাটির সন্তান হিসেবে, জনগণের সেবক হিসেবে, কোটি কোটি কণ্ঠস্বরের মধ্যে একটি কণ্ঠস্বর হিসেবে; আমি ঈশ্বর ও ইতিহাসের সামনে ঘোষণা করছি: আফ্রিকা জেগে উঠবে। আফ্রিকা সুস্থ হবে। আফ্রিকা রাজত্ব করবে–বিজয়ের মাধ্যমে নয়, বিবেকের মাধ্যমে। প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়, পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে। জোর করে নয়, বরং নিজেদের নাম মনে রাখা এক জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির দ্বারা।
পূর্বপুরুষরা গর্বের সাথে দেখুক। শিশুরা আশা নিয়ে হাঁটুক। এবং বিশ্ব এক মহাদেশের পুনর্জন্মের সাক্ষী হোক।
ঈশ্বর আমাদের সহায় হোন।
ইব্রাহিম ত্রাউরে: আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট
(লেখাটি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম তাউরের ভাষণের ভিডিও থেকে নেওয়া এবং ঈষৎ সংক্ষেপিত)