১৩ জুন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরু করে তেল আবিব এক চরম ভুলের পথে পা বাড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্তে কেউই লাভবান হবে না — এমনকি ইসরায়েল সরকারও নয় — বরং অনেকেই কষ্ট পাবে। ইতোমধ্যে হামলা পাল্টা হামলার ফলে ইরানে অন্তত ৮০ জন (বর্তমানে ২৪০) এবং ইসরায়েলে ১০ (বর্তমানে ২৪ জন) নিহত হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, অতীতের ব্যর্থ সামরিক অভিযানের করুণ শিক্ষা ইসরায়েল একেবারে উপেক্ষা করেছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে ‘প্রত্যাঘাতমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যার উদ্দেশ্য নাকি তেহরানকে নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। এই দাবি তুলে তিনি আবারও সেই কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করলেন, যা একসময় করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যখন তাঁরা তথাকথিত ‘প্রি-এম্পটিভ’ হামলার নামে ইরাক আক্রমণ করেন।
নেতানিয়াহুর দাবি অনুযায়ী, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করা। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। যদিও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে এই হামলাগুলোর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো সম্ভব না — এমনটি নিজেও জানেন নেতানিয়াহু।
কারণ, নাতাঞ্জ স্থাপনাটি ভূগর্ভে এত গভীরে অবস্থিত, যা কেবলমাত্র সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-ধ্বংসকারী বোমার মাধ্যমেই ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনেট্রেটর (এমওপি) বা ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নেই, যেগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন করে।
এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্র ইসরায়েলকে সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যদিও এই প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিল এবং গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকেও ইসরায়েলকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে।
এই হামলা সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু চুক্তির আলোচনাকে থামিয়ে দিয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে নেতানিয়াহুর জন্য একটি কূটনৈতিক জয় হলেও, দীর্ঘমেয়াদে বড় ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলার ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এটা এক বিশাল জুয়ার মতো, কারণ ট্রাম্পের অনেক উপদেষ্টাই মার্কিন হস্তক্ষেপবিরোধী। ট্রাম্প নিজেও আমেরিকার বিদেশি যুদ্ধ থেকে সরে আসাকে নিজের নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এদিকে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছে — বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায়।
যদি ইসরায়েল যুদ্ধে এগিয়ে থাকে, তবে ট্রাম্প সেটিকে নিজের সাফল্য হিসেবে দাবি করবেন। কিন্তু যদি নেতানিয়াহু আমেরিকাকে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দিকে টেনে নিতে থাকেন, তাহলে ট্রাম্পের সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, যদি ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করে, তাহলে ইরানে কৌশলগত কোনও সাফল্য অর্জন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন হবে।
নেতানিয়াহুর আরেক ঘোষিত লক্ষ্য — ইরানি সরকারকে উৎখাত করা — তাও বাস্তবসম্মত নয়। হামলায় বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হলেও, তেহরানের জনগণ বরং ইসরায়েলের একতরফা আগ্রাসনে ক্ষুব্ধ হবে এবং নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধাচরণ নয়, বরং আরও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
ইরানি সরকার বরাবরই বলছে, পারমাণবিক অস্ত্র তাদের জন্য একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এবার তা আরও গ্রহণযোগ্য মনে হবে অনেক দেশবাসীর কাছেই।
তাহলে প্রশ্ন হলো, যদি ইসরায়েল ইরানকে অস্থিতিশীল করতেও সক্ষম হয়, তাও কি তা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনবে? ইতিহাস বলছে না। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন পতনের পরই দেখা যায় কীভাবে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আইএসআইএস-এর মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।
ইরানে একটি অনুগত সরকার গঠন বা স্থানান্তর ঘটানোও ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নেই। মার্কিন সমর্থন ছাড়াও এটি কল্পনাতীত।
সারসংক্ষেপে, নেতানিয়াহুর এই হামলা ইসরায়েলের জন্য হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু কৌশলগত সুবিধা আনবে — যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সাময়িক বিলম্বিত করা বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ছেদ টানা। তবে এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
লেখক: ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো
(লেখাটি আল জাজিরায় প্রকাশিত এবং ইংরেজি থেকে অনুদিত।)