নারী নির্যাতন কেন বাড়ছে নির্দলীয় সরকারের আমলেও?

এক সময় আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে একটি সাধারণ যুক্তি দেওয়া হতো—রাজনৈতিক সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা নাকি পার পেয়ে যায়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রভাবশালীদের তদবির—এসবই নাকি অপরাধীদের সাহস জোগায় এবং বিচারের পথ রুদ্ধ করে। এই ধারণা থেকে অনেকেই হয়তো আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পাল্টাবে। তাদের তো কোনো রাজনৈতিক দলীয় সম্পর্ক নেই, কোনো তদবির বা সুপারিশের প্রশ্নই আসে না। অপরাধীদের ওপর লাগাম টানা যাবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক উপাত্ত সে আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে। বরং নির্দলীয় সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের সংখ্যা, বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা, উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এই চিত্র আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে, কেন এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা?

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত তথ্যে যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। গত বছর অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫১৬টি। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১-তে। অর্থাৎ, গত এক বছরের তুলনায় চলতি বছরের অর্ধেক সময়েই ধর্ষণের ঘটনা মাত্র ৩৫টি কম। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে বছরের শেষে ধর্ষণের সংখ্যা গত বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে, যা নিঃসন্দেহে একটি অশনি সংকেত। শুধু ধর্ষণ নয়, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, যৌতুকের কারণে হত্যা, যৌন নিপীড়ন, উত্ত্যক্তকরণ—সব ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনাই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ছয় মাসে ১ হাজার ৫৫৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩২০ জন।

প্রতীকী ছবিএই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, নির্দলীয় সরকার কি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে? যদি রাজনৈতিক সংযোগই অপরাধীদের বাড়বাড়ন্তের কারণ হয়ে থাকে, তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কেন এই ধারা অব্যাহত? এর পেছনের কারণগুলো বেশ জটিল এবং বহুমাত্রিক।

প্রথমত, আমাদের বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বহু পুরোনো। রাজনৈতিক সরকারের আমলে হয়তো রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় কারণ ছিল, কিন্তু বর্তমানে যে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতি সম্পন্ন, অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এবং প্রমাণ সংগ্রহে যে ঘাটতি, তা এখনও বিদ্যমান। অপরাধীরা জানে যে, দ্রুত বিচার হবে না এবং হলেও হয়তো তারা পার পেয়ে যাবে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তাদের প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরেছে—‘সমাজকে নারীবিদ্বেষী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ সমাজে নারীবিদ্বেষ নতুন কিছু নয়, কিন্তু বর্তমানে এটিকে আরও উসকে দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে কি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শক্তি কাজ করছে? এমন একটি ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, নারীর প্রতি সহিংসতা এক প্রকার স্বাভাবিক বিষয় এবং এর জন্য অনেকাংশে নারী নিজেই দায়ী। 'মব ভায়োলেন্স' বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ সহিংসতার মাধ্যমে আইনকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন বিচার জনতার হাতে চলে যায়, তখন নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে পড়ে।

আইনগত সহায়তা প্রদানেও বাধা তৈরি করা হচ্ছে। আইনগত সহায়তা প্রদান আইন সংশোধনের ফলে যৌতুকের কারণে সাধারণ জখমের শিকার নারীদের লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতায় যেতে হবে। এটি নিঃসন্দেহে নারীর বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে এবং বিচারহীনতার দিকে ঠেলে দেবে। এমন একটি সময়ে যখন নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তখন আইনগত সহায়তা প্রক্রিয়া সহজ করার বদলে জটিল করে তোলা মোটেও কাম্য নয়।

সংবাদমাধ্যমে নারী নির্যাতনের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অনেক সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে স্থান পায় না, প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টি দিয়ে দেখা হচ্ছে, যার ফলে নির্যাতনের আসল ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এছাড়া নারী সাংবাদিকদের চাকরির ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, সংবাদমাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অনুপস্থিতি এবং নারী নির্যাতনের খবর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার প্রবণতাও একটি উদ্বেগের কারণ। সংবাদমাধ্যম যদি সমাজের এই ভয়াবহ দিকটি সঠিক ও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে না পারে, তবে জনসচেতনতা এবং প্রতিকারের দাবিও দুর্বল হয়ে যায়।

বর্তমানে নারী নির্যাতনের ধরন ও মাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। সাইবার ক্রাইম, অনলাইনে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলিং—এগুলো নারী নির্যাতনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে অপরাধীরাও নিত্যনতুন উপায়ে নারীকে হয়রানি ও নির্যাতন করছে। এই নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার প্রস্তুতি কতটা, তা একটি বড় প্রশ্ন।

প্রতীকী ছবিসবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নির্দলীয় সরকার ক্ষমতায় এলেও নারী নির্যাতন বন্ধ না হয়ে বরং বাড়ছে। এর কারণ সম্ভবত কেবল রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সমাজের গভীরে প্রোথিত নারীবিদ্বেষ, আইনগত জটিলতা, এবং সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই মিলেমিশে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই ভয়াবহ চিত্র পরিবর্তনের জন্য শুধু আইনের প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি সামগ্রিক সামাজিক পরিবর্তন। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা, নারীর কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া, গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং সর্বোপরি সম্মিলিতভাবে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো—এগুলোই পারে এই দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে। প্রতিটি নাগরিকের, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এই সহিংসতা প্রতিরোধে যার যার অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়া। অন্যথায়, এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার পথ আমাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

নির্দলীয় সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—তারা যেন কোনোভাবেই এই অপরাধগুলোকে ‘রাজনৈতিক নয়’ ভেবে এড়িয়ে না যায়। বরং এটিই সময়, প্রমাণ করার যে রাষ্ট্র চাইলে অপরাধ দমন করতে পারে, দল-মত নির্বিশেষে বিচার নিশ্চিত করতে পারে।

যতদিন না নারীকে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার জায়গায় স্থাপন করা যাবে, ততদিন সরকার কোনো দলের হোক বা না হোক, সমাজ থাকবে অনিরাপদ, বিশেষত নারীর জন্য।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]