নারী নির্যাতন ও নির্যাতনের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৫, ১২:৪৮ পিএম

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে নারী নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন যেভাবে বাড়ছে, তা শুধু সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং একটি ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যৌন নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন এবং সেই সঙ্গে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ইতোমধ্যে উঠে আসছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেমন সুবিধা এনে দিয়েছে, তেমনই এটি অপরাধের নতুন নতুন দিকও উন্মোচন করেছে। এইসব অপরাধ একদিকে নারীর মর্যাদার ওপর আঘাত করে, অন্যদিকে পুরো সমাজের মনস্তত্ত্বকেই আহত করে।

নারী নির্যাতনের ধরণ যতটা বহুমাত্রিক, ততটাই নিষ্ঠুর। শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, প্রতারণামূলক সম্পর্ক, ব্ল্যাকমেইলিং এবং সর্বশেষ ডিজিটাল নির্যাতন সব মিলিয়ে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ধর্ষণ মামলা: বিচার ও প্রতিকার

১. মাগুরা শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

২০২৫ সালে মার্চ মাসে মাগুরায় ৮ বছর বয়সের একটি কন্যাশিশুকে বোনের শ্বশুড় হিটু শেখ ও পরিবারের সদস্যরা ধর্ষণ ও হত্যা করে। পরবর্তীতে মাগুরায় শিশু ধর্ষণ হত্যা মামলার রায় দিয়েছে আদালত। প্রধান আসামী শিশুটির বোনের শ্বশুড় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকীদের বেকসুর খালাস। মাত্র ২৪ দিনের মধ্যেই ট্রায়াল শেষে আদালতে দণ্ড কার্যকর হওয়ায় এটি দ্রুত বিচার প্রতিষ্ঠার মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

২. কেরানীগঞ্জে ৭ বছরের কন্যাশিশু ধর্ষণ

কেরানীগঞ্জের ২০১৪ সালের ঘটনা ২০২৫ সালে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ফয়সালা হয়। অভিযুক্ত আরশাদকে যাবজ্জীবন সাজা ও ১ লাখ টাকা জরিমানা দেওয়া হয়।

৩. চট্টগ্রামে ১৬ বছরের কন্যাকে ধর্ষণ

ফটিকছড়িতে ২০২৩ সালে সংঘটিত ঘটনায় অভিযুক্ত খোকন উদ্দিনকে ২০২৫ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

প্রতীকী ছবি৪. কুমিল্লার হিন্দু নারী ধর্ষণ

২০২৫ সালের জুন মাসে কুমিল্লায় এক হিন্দু নারীর ভিডিও ধারণ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর আইন থাকলেও অপরাধীরা নানা উপায়ে আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে প্রচলিত আইনগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী, যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা:

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ও ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা আজীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।

ধারা ৩৫৪ অনুযায়ী নারীর মর্যাদার প্রতি আঘাত বা শ্লীলতাহানির জন্য ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

পারিবারিক সহিংসতা/শারীরিক নির্যাতন:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) অনুযায়ী স্বামী বা পরিবারের সদস্য কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের শাস্তি ৫–১০ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা।

যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ক্ষেত্রেও এই আইন প্রয়োগযোগ্য এবং শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

ভিডিও ধারণ ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া:

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী কারও অনুমতি ছাড়া যৌন কার্যকলাপ ভিডিও ধারণ বা তা প্রচার করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।

যদি ভুক্তভোগী শিশু বা কিশোরী হয়, তবে শাস্তি আরো কঠোর (ধারা ৮ অনুসারে)।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত) এর অধীনে ইন্টারনেটে অশ্লীল ভিডিও আপলোড, সংরক্ষণ বা প্রচার করলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।

প্রতীকী ছবিআইনজীবীদের মতামত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এই ধরণের অপরাধ শুধু ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর জন্য হুমকি। মামলা গ্রহণ, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে না পারলে অপরাধীরা সাহস পায়।’

অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারমিন আক্তার বলেন, ‘আজকাল যেভাবে তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভিডিও করে রাখা হয়, তা সম্পর্ক ভাঙার পর ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হয়ে ওঠে। এই বিষয়ে আইনি প্রতিরোধ ও ডিজিটাল শিক্ষার অভাব রয়েছে।’

বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনি সহায়তা

১. মামলা রুজু (FIR): নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার সরাসরি থানায় গিয়ে প্রথম তথ্য প্রতিবেদন দায়ের করতে পারেন।

২. নারী সহায়তা কেন্দ্র: বাংলাদেশ পুলিশের ‘৯৯৯’ হেল্পলাইন বা জেলা ও থানা পর্যায়ে নারী সহায়তা ডেস্কে গোপনীয়ভাবে অভিযোগ জানানো যায়।

৩. ডিজিটাল আলামত সংরক্ষণ: ভিডিও, অডিও, স্ক্রিনশট, বার্তা—সবকিছু প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপনযোগ্য।

৪. ফরেনসিক তদন্ত: সিআইডি, ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিটের সহায়তায় আলামত বিশ্লেষণ করা হয়।

৫. রিট মামলা: হাইকোর্টে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রিট করা যায়।

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

প্রচলিত আইন থাকলেও সঠিক প্রয়োগে রয়েছে দুর্বলতা। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষী সংকট, সামাজিক চাপ ও ভিকটিম ব্লেমিং সবকিছুই বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে পুলিশি হয়রানির মুখেও পড়তে হয়। আবার অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে মামলা কার্যকর হতে বিলম্ব হয়।

প্রতীকী ছবিনির্যাতনের শিকার নারীদের সম্মান রক্ষায় গণমাধ্যমে সচেতনতা জরুরি

নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতনের ঘটনা যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন ভুক্তভোগী নারীর সম্মান রক্ষা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নাম, ছবি বা ব্যক্তিগত কোনো তথ্য প্রকাশ পেয়ে থাকে। এতে তারা আবারও মানসিক ও সামাজিক  যন্ত্রণার শিকার হন। এজন্য গণমাধ্যমকর্মীদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া আবশ্যক।

নারীর প্রতি যৌন ও শারীরিক সহিংসতা একটি মানবতা বিরোধী অপরাধ। এই অপরাধের শিকার একজন নারী হলেও কষ্টটা পুরো সমাজকে স্পর্শ করে। আইনের আশ্রয় পাওয়া প্রতিটি নারীর অধিকার এবং সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়ে। এই অপরাধগুলো প্রতিরোধে শুধু আইন নয় সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার, ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জরুরি।

লেখক: এলএলবি, শিক্ষানবিশ আইনজীবী

হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটির বেশি, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি নারী। যা এখন মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে অবদান বাড়লেও মজুরি আর মর্যাদায় এখনো পিছিয়ে নারীরা। কমেনি বৈষম্য। খাত...
গণিত অনেকের কাছেই কঠিন একটি বিষয়। সমীকরণ আর জটিল তত্ত্বে ভরা এই জগৎ অনেক সময় ভয়ও জাগায়। কিন্তু এই কঠিন বিষয়কেই নিজের ভালোবাসা আর মেধা দিয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন মরিয়ম মির্জাখানি। তাঁর...
নারীর প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা নিপীড়নের মধ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যুদ্ধ, মানব পাচার আর সাইবার জগতে নারীর সুরক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
সংবাদ সম্মেলনে মেজর ফারহান মাহমুদ মোক্তাদা জানান, চক্রটি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকে ১টি মাইক্রোবাস, ৭টি মোবাইল...
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার অন্যতম কুশিলব মেজর মোজাফফর। এরপর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গোপনে দাফনের মূল পরিকল্পনাও তার;...
রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্রুতগামী অজ্ঞাত এক গাড়ির ধাক্কায় সেকান্দার আলী নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর