মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষকের লেখা

আমি এমন ভয়াবহ কিছু আগে কখনো দেখিনি

আমি আমার ডেস্কে বসে একটি ফাইল নিয়ে কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল। এত তীব্র যে, আমি কখনো এর আগে এত জোরে কিছু শুনিনি...। আমার প্রাথমিক ধারণা হলো যে, নিকটস্থ মেট্রোরেলের কোনো ট্রান্সফরমার বা আমাদের সাব-স্টেশনের জেনারেটর হয়তো বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু বিস্ফোরণের দুই-তিন সেকেন্ড পরই আমি চিৎকার ও কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে ভবনের বাইরে গেলাম। কিছু শিক্ষার্থী এবং আরও কয়েকজন মানুষ চোখেমুখে অবিশ্বাস নিয়ে চিৎকার করছিল, বলছিল, ‘প্লেন ক্র্যাশ!’

ভাবলাম, যদি প্লেন ক্র্যাশই হয়ে থাকে, তাহলে আমার ভবনও উড়ে গেছে। কারণ, আমার রুম ছিল মাত্র ১৫/২০ বা ৩০ মিটার দূরে। তাই আমি ঘটনাস্থলে দৌড়ে গেলাম। প্রথম নজরে যা দেখলাম, তা ছিল ভয়াবহ।

একজন মা এবং ৮/১০ বছর বয়সী একটি ছেলের শরীর কেটে দুভাগ হয়ে পড়ে আছে। তারা শুধু মাংসের স্তূপের মতো নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে ছিল। ছেলে শিশুটির লিভার, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের কিছু অংশ চারপাশে ছড়িয়ে ছিল। রক্ত তখনও প্রবলভাবে ঝরছিল।

তাদের ঠিক পেছনেই ছিল স্কুলের মূল গেট। আর ফাইটার জেটটি ঘন কালো কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া ছড়িয়ে জ্বলছিল। সেই মুহূর্তটি ছিল হতবিহ্বলকর।

দেখলাম আমাদের কিছু শিক্ষার্থী জেটের ঠিক উপরে আটকে আছে। কোনো সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়ার ফুরসৎ ছিল না। শুধু মনে হলো আমাদের কিছু করতে হবে। তাই আমি দৌড়ে নিজ ভবনে ফিরে গেলাম। মজুত থাকা সব অগ্নিনির্বাপক ও মইগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে নেওয়ার নির্দেশ দিলাম। ভবনের প্রতিটি ফ্লোরেই ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল। আমি অন্য ভবন থেকেও বাকি ফায়ার এক্সটিংগুইশারগুলো আনতে বললাম। মিনিটখানেকের মধ্যেই সেগুলো আনা হলো, আলহামদুলিল্লাহ।

এই অগ্নিনির্বাপকগুলোর মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস আসার আগ পর্যন্ত আমরা আগুন, ধোঁয়া ও লেলিহান শিখাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলাম। আমার শিক্ষার্থীরা স্পাইডারম্যান ও ব্যাটম্যানের মতো হয়ে গিয়েছিল। তারা মই বেয়ে উঠে গ্রিল কেটে আটকে পড়াদের উদ্ধার করল।

অন্যদিকে, আরেক দল পেছন থেকে দেয়াল ভেঙে বিপদে পড়া শিক্ষার্থীদের বের করে আনল। একজন ১০ বছর বয়সী ছাত্রকে উদ্ধার করা হলো। অনেক পুড়ে গিয়েছিল সে। দেখলাম, তার শরীরের অর্ধেক অংশের চামড়া নেই। ও আল্লাহ...তাদের সবাইকে রক্ষা করুন...।

আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ফায়ার এক্সটিংগুইশারগুলো পুরোপুরি কাজে লেগেছে। এর মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস এসে দায়িত্ব নিল। এবার আমি ভাবলাম বাড়িতে আমার নিরাপদ থাকার বিষয়টি জানানো দরকার। আমি আমার ফোন খুঁজছিলাম। কিন্তু পেলাম না। ভাবলাম, সম্ভবত হারিয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর অফিসে ফিরে দেখি, আমার ফোন মাটিতে পড়ে আছে। ডিসপ্লে ভাঙা। অনেক কষ্টে একটি কল রিসিভ করতে পারলাম। ডিসপ্লে সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার আগে আমি ফেসবুকে সবার জন্য একটি বার্তা পোস্ট করলাম–প্রিয় বন্ধুরা, আজ যারা মারা গেছে তাদের জন্য এবং যারা পুড়ে বা আহত হয়েছে তাদের জন্য দোয়া করবেন...আমি কখনও এমন ভয়াবহ কিছু দেখিনি।

লেখক: ইংরেজি শিক্ষক, মাইলস্টোন কলেজ