বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, গণভোট আগে না জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে? এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্কের কেন্দ্রে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের সুপারিশে বলেছে, সংসদ নির্বাচনের দিন অথবা তার আগে গণভোট করা যেতে পারে। তবে দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার দায়িত্ব সরকারের হাতে।
এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কমিশন কার্যত জানিয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদের বৈধতা ও জনসমর্থন যাচাইয়ের একমাত্র উপায় এখন গণভোট। গণভোট এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পূর্বশর্তও বটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) কমিশনের এই সুপারিশ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশ অতীত থেকে মুক্তি পাবে।’ এই মন্তব্যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, সরকার সনদটিকে কেবল প্রশাসনিক রূপরেখা হিসেবে নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়।
বিভিন্ন দলের অবস্থান: আস্থার সংকট নাকি নতুন সুযোগ?
এই মুহূর্তে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান এক নয়। বিএনপি চায় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট। তাদের যুক্তি, একই দিনে ভোটগ্রহণ হলে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে, প্রশাসনিক ব্যয় কমবে এবং ফলাফল নিয়ে কোনো পক্ষের সন্দেহ থাকবে না। বিএনপির নেতারা মনে করেন, গণভোটকে আলাদা দিনে করলে সেটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করতে হবে, যাতে জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের মতামত জানা যায়। তাদের মতে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যদি জুলাই সনদকে সমর্থন দেয়, তবে সেটিই হবে আসন্ন নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি।
অন্য কয়েকটি দল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য গণভোটকে স্বাগত জানালেও সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে তারা সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হলে প্রশাসনিক সমন্বয় জটিল হয়ে পড়বে। আবার আলাদা দিনে হলে তা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা কঠিন হবে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা সরকারের আন্তরিকতা ও দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নিরসন সম্ভব। তাই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হলে তা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন হবে; অন্যদিকে সর্বোচ্চ ভোটারের অংশগ্রহণও নিশ্চিত হবে।
গণভোট আগে না সঙ্গে: দুটি পথ, দুটি ঝুঁকি
যদি গণভোট সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অল্প সময়ে দুটি বড় আয়োজন সামলাতে হবে। এতে প্রশাসনিক চাপে অনিয়মের ঝুঁকি থাকবে। নির্বাচনের আগে গণভোট হলে তা প্রচারণায় প্রভাব ফেলতে পারে; একই দিনে হলে প্রশাসনিক জটিলতা ও ভোটকেন্দ্রিক চাপ বাড়বে। আবার গণভোটের ফল যদি বড় কোনো পক্ষের প্রত্যাশার বিপরীতে যায়, তবে সেটি নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা করতে পারে। এছাড়া ভোট গণনায় সময় ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, যদি গণভোট নির্বাচনের দিনই হয়, তাহলে ভোটারদের জন্য এটি হবে এক অভূতপূর্ব আয়োজন। দুটি ব্যালট, দুটি সিদ্ধান্ত; একদিনে। এক্ষেত্রে ভোটারদের সচেতনতা তৈরি করতে ব্যাপক প্রচারণা জরুরি হয়ে পড়বে। দলীয় প্রতীকে ভোট চাইবে প্রার্থীরা আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গঠনের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। যেমন ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের দুটি ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের সময় জনমত গড়তে সরকারের ব্যাপক প্রচারণা দেখা গিয়েছিল।
জুলাই সনদের মূল চ্যালেঞ্জ: বাস্তবায়নের পথ কোথায়?
জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি হলো, দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, স্বচ্ছ নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা। এর বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পরও বাস্তব পরিবর্তন হয়নি। এখন যদি গণভোটের মাধ্যমে জনগণ এই সনদে মত দেয়, তাহলে তা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে।
পরিবর্তন কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে হবে। তবেই তা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
ঐকমত্যের বাস্তব পরীক্ষা
অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশ অতীত থেকে মুক্তি পাবে।’ এই বক্তব্যে সনদ বাস্তবায়নকে তিনি কেবল রাজনৈতিক সংস্কার নয়, এক ধরনের ঐতিহাসিক দায় হিসেবেও দেখছেন। কিন্তু এই দায়মুক্তি কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করছে গণভোট ও নির্বাচনের ব্যবস্থাপনার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট হয়েছে মাত্র দুটি– ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালে। দুটিই বিতর্কিত ছিল। এবার যদি এই গণভোট বিশ্বাসযোগ্য হয়, তবে সেটি হবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মোড় ঘোরানো ঘটনা।
ঐকমত্য কমিশনের নামের সঙ্গে ‘ঐকমত্য’ শব্দটি যুক্ত আছে, কিন্তু বাস্তবে তা অর্জন করা এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিএনপি, জামায়াতসহ প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আস্থা না ফিরলে কোনো সনদই কার্যকর হবে না। জাতীয় নির্বাচনের আগে বা সঙ্গে যখনই হোক, গণভোট সেই আস্থার প্রথম পরীক্ষা, জাতীয় নির্বাচন দ্বিতীয়।
সুতরাং, গণভোটের সময় নির্ধারণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থারও পরীক্ষা। এখানে সরকারের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে দলগুলো ফলাফল মেনে নেয়, তবে সেটি হবে সত্যিকার অর্থে ‘ঐকমত্যের বাস্তব রূপ’।
জনগণ যদি বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট সত্যিই নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে, তবেই জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তব হতে পারে। কিন্তু যদি এই প্রক্রিয়া নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে আবারও ‘ঐকমত্য’ শব্দটি কেবল আকাঙ্ক্ষাতেই থাকবে, বাস্তবে নয়। তাই গণভোট আগে হোক বা নির্বাচনের সঙ্গে, জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে জুলাই সনদের স্বপ্ন কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে তাই এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব গণভোটের আয়োজন ও তা বিশ্বাসযোগ্য করা। আর সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। এটাই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সত্যিকার অর্থে ‘ঐকমত্যের নতুন পরীক্ষা।’
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]