১৭ অক্টোবর, শুক্রবার, যখন রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতির হুমকির নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সনদে সইয়ের একদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আইনি ভিত্তি ছাড়া জুলাই সনদে সই করা মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করা। আদেশের নিশ্চয়তা ছাড়া এই সনদ মূল্যহীন হবে।”
যে ছাত্রনেতারা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের তৈরি দলের এই অবস্থান শুধু আনুষ্ঠানিক অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি জুলাই সনদের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
এনসিপির বক্তব্য শুধু তাদের অবস্থানেরই প্রকাশ নয়, বরং পুরো ঐকমত্য প্রক্রিয়ার নৈতিক স্বচ্ছতা নিয়েও সন্দেহ উত্থাপন করেছে।
নাহিদ ইসলামের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো শুধু আলোচনায় ঐকমত্যে পৌঁছালেই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রীয় আদেশ বা আইনি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই ঐকমত্যকে বৈধতা দিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, জুলাই ঘোষণাপত্রের সময়ও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
“ঘোষণাপত্রের টেক্সট শেষ মুহূর্তে বদলে দেওয়া হয়, আমাদের দেখানো হয়নি,” বলেছেন এনসিপি আহ্বায়ক, যিনি একসময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
এনসিপি তিনটি স্পষ্ট শর্ত দিয়েছে–
১. জুলাই সনদের বৈধতা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকেই আসতে হবে; রাষ্ট্রপতি নয়, বরং সরকার প্রধান হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি করতে হবে।
২. সনদের ৮৪টি প্রস্তাব একত্রে গণভোটে যাবে, যেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর আলাদা কোনো আইনি মর্যাদা থাকবে না।
৩. গণভোটে জনগণ অনুমোদন দিলে পরবর্তী সংসদ সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে।
এই তিন শর্তের মধ্যেই এনসিপির বক্তব্যের মূল দর্শন নিহিত। আর তা হচ্ছে, জনগণের সার্বভৌম সম্মতি ছাড়া কোনো ঐকমত্য টেকসই নয়।
এনসিপির অবস্থানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিকেলে এক ধরনের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে পুরানা পল্টনে। সেখানে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও জাসদ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সংশোধিত খসড়া না পেলে তারা জুলাই সনদে সই করবে না।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “চূড়ান্ত কপিতে আমাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের কারণও লিপিবদ্ধ করা হয়নি। সনদে এমন প্রস্তাব যুক্ত হয়েছে, যেগুলোতে সর্বসম্মতি ছিল না।” তাদের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, সংবিধানের ১৫০(২) ও ১০৬ অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মূলত রাষ্ট্রের জন্মগত নৈতিক ভিত্তিকে আঘাত করে।
যেসব দল অভ্যুত্থানোত্তর রাজনীতিতে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিল, তারা যদি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের বাইরে থাকে, তাহলে জনগণের চোখে সনদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা থাকবে? জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক, তা মূলত বৈধতা বনাম আনুষ্ঠানিকতার লড়াই।
একদিকে সরকারের ইচ্ছা—রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রতীক হিসেবে সনদকে দ্রুত বৈধতা দেওয়া; অন্যদিকে এনসিপি ও বাম দলগুলোর আশঙ্কা, আইনি নিশ্চয়তা ছাড়া ঐকমত্য কেবল একটি প্রতীকী ডকুমেন্ট হয়ে থাকবে।
জুলাই অভ্যুত্থান যে গণ-আন্দোলনের ফল, সেটিই এখন জুলাই সনদের বৈধতার দাবি হিসেবে ফিরে এসেছে। রাজনীতির ভাষায় বলতে গেলে, এনসিপি তাদের অবস্থানের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছে। তাই শুক্রবারের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যদি এনসিপি অনুপস্থিত থাকে, তা নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক বার্তা রেখে যাবে। ঐক্য গঠনের সনদে যখন ঐকমত্য অনুপস্থিত, তখন প্রশ্নটা সনদের নয়, বিশ্বাসের।
লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


‘নোট অব ডিসেন্ট’ লিপিবদ্ধ থাকলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর: মির্জা ফখরুল
জুলাই সনদ সই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেন খালেদা জিয়া–তারেক রহমান
