বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আসনভিত্তিক ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি)’ পদ্ধতির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনি আসনটি জেতেন। আর যে দল বা জোট বেশি (এক-তৃতীয়াংশ) আসন পায়, তারা সরকার গঠনের সুযোগ পায়। তবে, সম্প্রতি প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে রাজপথে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৩টি রাজনৈতিক দল। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি দলের মোট ভোটের অনুপাতে সংসদীয় আসন বণ্টন করা হয়।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক অনেক। তবে, তত্ত্বে যত সুন্দর, বাস্তবে এটি অনেক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের শতাধিক দেশে এই পদ্ধতি চালু থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা বাস্তবায়ন আরও চ্যালেঞ্জিং ও সময়সাপেক্ষ।
সম্প্রতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ৪ হাজার ৭২১ জনের ওপর চালানো জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪১.৩০ শতাংশ উত্তরদাতার পছন্দের দল বিএনপি। জামায়াতের পক্ষে ৩০.৩০ উত্তরদাতা। আর জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) পছন্দ করেন ৪.১০ শতাংশ উত্তরদাতা। বাকিরা অন্যান্য দল ও অনির্ধারিত প্রার্থীর পক্ষে। এ জরিপের ফলকে যদি ভোটের ফলাফল ধরা হয়, তবে ৩০০ আসনের সংসদে সম্ভাব্য বণ্টন দাঁড়ায় নিম্নরূপ:
- রাজনৈতিক দল ভোটের হার সম্ভাব্য আসন সংখ্যা
বিএনপি ৪১.৩০% ১২৪টি আসন
জামায়াত ৩০.৩০% ৯১টি আসন
এনসিপি ৪.১০% ১২টি আসন
অন্যান্য দল ও অনির্ধারিত ২৪.৩০% ৭৩টি আসন
ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের জরিপকে ভোটের ফল ধরলে দেখা যায়, পিআর পদ্ধতিতে আসন কমবে বিএনপির। বাড়বে জামায়াতসহ অন্যান্য দলের। যাদের এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই বিএনপির পিআর পদ্ধতির বিরোধিতা করা খুবই স্বাভাবিক। তেমনি জামায়াতের পিআরের পক্ষে থাকাটাও স্বাভাবিক। কেননা, এ পর্যন্ত জামায়াত শুধু ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছে। কিন্তু অতীতের নির্বাচনগুলোতেও যদি পিআর থাকত তাহলে জামায়াত আরও বেশি আসন পেত।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী বলা যায়, পিআর পদ্ধতি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার সম্ভাবনাময় দলের জন্য মোটেই লাভজনক নয়। কিন্তু যে দল বা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ের সম্ভাবনা নেই, তাদের জন্য লাভজনক। বিশেষ করে কম জনসমর্থনের ছোট দলগুলো, যাদের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় কোনো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারাও কিছু আসন পেয়ে যাবে।
এছাড়া, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট পায় ৪৮ শতাংশ ভোট, বিএনপি জোট ৩২ শতাংশ। বেশ কিছু আসনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়ে বিএনপি আসান পায় মাত্র ৩০টি আর আওয়ামী লীগ ২৩০টি। যদি তখন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা চালু থাকত, তবে আওয়ামী লীগ পেত ১৪৪টি আসন, বিএনপি ৯৭টি।
বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যায়, আসনভিত্তিক ভোটের ব্যবধানে যাদের সর্বাধিক আসন পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদের জন্য পিআর পদ্ধতি লাভজনক নয়। যে দল বা জোটের আসনভিত্তিক ভোটের ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনা কম, তারা মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে বেশি আসন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে তাদের জন্য পিআর লাভজনক।
পিআর নিঃসন্দেহে একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য পদ্ধতি। তবে, সব গণতন্ত্রের জন্য নয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দলীয় গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া এ পদ্ধতি সহজেই অরাজকতায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশে এখন দরকার নির্বাচন পদ্ধতি নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চার সংস্কার, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতি। বহির্বিশ্বের ফর্মুলা অন্ধভাবে আমদানি না করে, আমাদের বাস্তবতায় উপযোগী রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি চালুর আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনিক কাঠামো ও নির্বাচনী সংস্কৃতি। নির্বাচনে যদি ভোট গণনা ও ফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা ও আস্থার সংকট থেকে যায়, তাহলে পিআর পদ্ধতি আরও বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। কারণ এই ব্যবস্থায় কেবল প্রার্থী নয়, দলের সামগ্রিক ভোটই নির্ধারক হয়। যা তথ্য বিকৃতি বা ফল পালটানোর ঝুঁকি বাড়ায়। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী তালিকা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে ক্ষমতাবান ও ধনী শ্রেণি আরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফলে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও একটি বাস্তব বিষয় হলো, পিআর পদ্ধতিতে সরকার গঠনে জোট নির্ভরতা বেড়ে যায়। এতে, সরকার হয়ত বেশি অংশগ্রহণমূলক হয়, কিন্তু একই সঙ্গে স্থিতিশীলতাও হ্রাস পায়। একাধিক ছোট দল সরকারে আসন পাওয়ার সুযোগ পেলেও নীতিনির্ধারণে দ্বন্দ্ব ও সমঝোতার রাজনীতি বেড়ে যেতে পারে, যা কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা তৈরি করবে। তাই পিআর পদ্ধতি চালুর আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা। যা বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



