আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কী করা উচিৎ

আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশ বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি এবং সাধারণ নাগরিক–সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, বলৎকার, চোর সন্দেহে হত্যা, মব জাস্টিস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।

গাজীপুরে রামিসার ধর্ষণ ও হত্যা, রংপুরে চার হত্যা, মহেশখালীতে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা কিংবা সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার দ্বাদশ বর্ষীয় সন্তান অপ্রতীমের নিখোঁজ হওয়ার পর মৃতদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনার অপরাধীদের গ্রেপ্তারে সচেষ্ট থাকে, তবুও জনগণের মনে বড় প্রশ্ন থেকে যায়–“ঘটনার পর অপরাধীকে তো গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু ঘটনার আগে কিছু করা যায় না কেন?” সরকারের প্রধান ও মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত আইনের শাসনের ভয়ে অপরাধপ্রবণতা রোধ করা এবং অপরাধের পর দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও সূচক
সামগ্রিক অপরাধ ও মামলার চিত্র: পুলিশ-তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি–জুলাই সময়ে সাতটি প্রধান অপরাধ শ্রেণিতে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে; এর আগের ছয় মাসে যা ছিল ২১,২২৮টি (প্রায় ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি)। একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং পুলিশের ওপর হামলা বৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে।

হত্যা ও ধর্ষণ মামলা: ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী ৪৬৪টি হত্যা মামলা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানানো হয়। একই সময়ে হত্যা মামলায় ৬০৪ এবং ধর্ষণ মামলায় ৫৩০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শিশু নির্যাতন ও নিখোঁজ: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (এএসকে) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজারের উপরে পৌঁছানোর উদ্বেগজনক চিত্রও সামনে এসেছে। ৮৭ শতাংশ শিশু উদ্ধার হলেও ২ হাজারের মতো শিশি্ু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। 

শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব
প্রতিদিন এত বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রোধে প্রশাসন ও অভিভাবকদের যৌথ ও সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে:

সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব:
প্রতিটি থানায় শিশু নিখোঁজ বা অপহরণের অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে তাৎক্ষণিকভাবে ‘রেড অ্যালার্ট’ বা বিশেষ ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দ্রুত বিশেষায়িত সেল গঠন করতে হবে। সন্দেহভাজন মানবপাচারকারী ও অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

লেখক সাইদুর রহমান সাঈদ। ছবি: সংগৃহীতঅভিভাবকদের দায়িত্ব:
সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধু-বান্ধব এবং দৈনিক রুটিনের প্রতি গভীর নজরদারি রাখতে হবে। অপরিচিত কারো প্রলোভনে না পড়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি শিশুদের শিখিয়ে দিতে হবে। অনলাইনে শিশুদের কার্যক্রম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে, যেন তারা সাইবার অপরাধ বা কোনো প্রলোভনের শিকার না হয়।

নৈতিক অবক্ষয়
দিন দিন মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও রীতিনীতি উঠে যাচ্ছে। পরিবার ও সমাজ থেকেই কিশোর বয়স থেকেই নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী, ইভটিজার ও সমস্যা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং আধুনিকায়ন
সরকারের উচিত আইনের শাসন কঠোরভাবে নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশকে আরও প্রো-অ্যাক্টিভ করতে হবে। থানাকে সাধারণ, নিরাপদ ও ভুক্তভোগীর জন্য আস্থার আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং অপরাধীদের জন্য আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করতে হবে। এটিকে কার্যকর করতে কয়েকটি স্তরে জোর দিতে হবে:

ইন্টেলিজেন্স-লিড পুলিশিং ও ক্রাইম ম্যাপিং: কোন এলাকায় কিশোর গ্যাং, ছিনতাই বা চাঁদাবাজি বেশি–তা চিহ্নিত করে ঝুঁকিভিত্তিক টহল বাড়াতে হবে।

দৃশ্যমান ও জনবান্ধব পুলিশিং: থানাগুলো যেন সাধারণ মানুষের জন্য আস্থার আশ্রয়স্থল হয়। প্রতিটি থানায় অনলাইনভিত্তিক ‘কমপ্লেইন্ট ট্র্যাকিং নম্বর’ চালু করা যেতে পারে।

বিশেষায়িত ইউনিট: তদন্ত, সাইবার অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ফরেনসিকের জন্য আলাদা দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।

শিশু ও নারী সুরক্ষা সেল: প্রতিটি থানায় শিশু-বান্ধব অভিযোগ কক্ষ এবং প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির জন্য অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা। প্রতিটি থানায় ক্রাইম ম্যাপিং ও চাঁদাবাজি-দখলবাজির হটস্পট তালিকা তৈরি করা। চিলড্রেন প্রটেকশন ডেস্ক চালু ও অ্যানোনিমাস ক্রাইম রিপোটিং সিস্টেম গঠন। বিট পুলিশিং সক্রিয়করণ, সিসিটিভি/আলোর ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং মামলার তদন্ত অডিট। প্রকাশ্য ল অ্যান্ড অর্ডার পারর্ফম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ করা।

কমিউনিটি পুলিশিং: সম্ভাবনা, বর্তমান বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণের সমন্বয়ে গঠিত কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে কমিউনিটি পুলিশিং চালু হলেও নগ্ন দলীয়করণ, অবহেলা ও দক্ষতার অভাবে তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে কমিটি গঠিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মব জাস্টিস ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ দমনে এই ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো জরুরি।

কমিউনিটি পুলিশিং কার্যকরে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা:
নিরপেক্ষ ও কার্যকর কমিটি গঠন: পুরোনো নিষ্ক্রিয় কমিটি ভেঙে দিয়ে শিক্ষক, তরুণ, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সচেতন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের সদস্যদের নিয়ে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিতে মাত্রাতিরিক্ত দলীয়করণ বর্জন করতে হবে এবং কোনো সদস্য যেন কোনো মাদকসেবী বা অপরাধীর পক্ষে প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করার সুযোগ না পায়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

নির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান: সংশ্লিষ্ট থানার একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব দিয়ে কমিটির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

নিয়মিত সচেতনতা সভা: পাক্ষিক বা মাসিক ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক মুক্তালোচনা, সেমিনার এবং স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা:
বিশ্বের অনেক দেশ কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ দমনে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে:
যুক্তরাষ্ট্র: Neighborhood Community Officer ব্যবস্থা.
যুক্তরাজ্য: Community Policing Teams ইউনিট.
অস্ট্রেলিয়া: Problem-Oriented Policing ও Neighbourhood Policing Teams.
ভারত: তামিলনাড়ু, কেরালা ও মহারাষ্ট্র রাজ্য। উল্লেখিত প্রত্যেক দেশ ও রাজ্যে কমিউনিটি পুলিশিং সফলতার সঙ্গে কাজ করছে। সুতরাং আমাদের দেশেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও উন্নত করার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে জনবান্ধন ও আধুনিকায়ন করতে হবে।

বিচার বিভাগের ভূমিকা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার
আইন ও শাস্তির প্রতি মানুষের আস্থা ও ভয় কমে যাওয়ায় নিখোঁজ, ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মানুষ ন্যায়বিচারের দাবিতে বারবার রাজপথে নামছে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক সময় অপরাধী দ্রুত ছাড়া পেয়ে যায় কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত ‘মব জাস্টিস’-এর জন্ম দেয়। প্রখ্যাত অপরাধবিজ্ঞানী গ্ল্যান্ডস্টেইন বলেছেন—
“Justice delayed is Justice denied” (বিলম্বে বিচার মানেই ন্যায়বিচার অস্বীকার করা) এবং
“Justice hurried is Justice buried” (তাড়াহুড়ো করে বিচার করা মানে ন্যায়বিচারকে কবর দেওয়া)।

এই সংকট উত্তরণে বিচার বিভাগের ভূমিকা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে:
দ্রুত বিচার ও সাক্ষীর সুরক্ষা: গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষায় ‘উইটনেস প্রোটেকশন সিস্টেম’ চালু করতে হবে।

ন্যাশনাল ক্রাইম ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম: থানা, আদালত, কারাগার, ফরেনসিক ও পুলিশকে সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ ও ক্রাইম ম্যাপিং সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।

নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্ব
সমস্যার অন্যতম শেকড় নিহিত রয়েছে নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীনতার মধ্যে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনলেও নাগরিকদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে:
অপরাধ দেখে নীরব না থেকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়া।
গণপিটুনি ও মব জাস্টিসের মতো বেআইনি সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবে কান না দিয়ে সত্যতা যাচাই করা।

হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, গুম, নিখোঁজ, বলৎকার, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু পুলিশি অভিযান বা কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন—শক্তিশালী পুলিশ + নিরপেক্ষ তদন্ত + দ্রুত বিচার + স্বাধীন জবাবদিহি + সক্রিয় কমিউনিটি পুলিশিং + সচেতন নাগরিক এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান। পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রো-অ্যাক্টিভ বা অগ্রণী প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সমাজে দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও দৃশ্যমান উন্নতি আনা সম্ভব, যেখানে অপরাধী পালানোর সুযোগ পাবে না এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ থাকবে। 

লেখক: সাইদুর রহমান সাঈদ
শিক্ষার্থী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিএ (অনার্স) 

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]