আর পাঁচটা দিনের অপেক্ষা। ৩৬ জুলাইয়ের, গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের বর্ষপূর্তি।
একটা বছর। বাংলাদেশকে ‘সিঙ্গাপুর বা ইউরোপ’ হতে দেখার স্বপ্নের হিসাবে চিন্তা করলে কোনো সময়ই নয়। কিন্তু মুক্তির যে গণচাহিদা রূপ নিয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে, সে পথে চলতে শুরু করার হিসাবে? এক বছর কম সময় তো নয়!
এই একটা বছরে কী কী চাহিদা ছিল সাধারণ মানুষের? কী ধরনের সংবাদ মানুষ শিরোনামে বেশি দেখতে চেয়েছিল? প্রয়োজনীয় সংস্কার দৃশ্যমান হবে, বিচারব্যবস্থা-আইনের শাসন দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হবে, মানুষের মতের স্বাধীনতার-নিঃশঙ্ক চলার পথটা মসৃণ হতে শুরু করবে…এই তো?
কিন্তু এক বছরে কী দেখা গেল? সংবাদের শিরোনাম খুঁজুন। সংস্কার কমিশন গঠন ও সংস্কারের ধরন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর টানাটানি। একদিকে এখনই নির্বাচন হওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আর অন্যদিকে কেন সব সংস্কার শেষ হওয়ার আগে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা নেই বিষয়ক তত্ত্ব, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ নিয়ে মাথাব্যথা…একেক সময়ে একেক ইস্যু এসেছে শিরোনাম হয়ে। এর বাইরে এক বছরে একটা ধরনের শিরোনাম একেবারে ‘ধ্রুবকে’র জায়গা নিয়ে নিয়েছে–মব।
কখনো স্বৈরাচারের দোসরদের শাস্তি দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে; কখনো দাপট দেখাতে; কখনো ধর্মকে পুঁজি করে প্রৌঢ় নাপিত কেন তাঁর প্রাপ্য ১০ টাকা বুঝে নিতে চাইলেন, সেটার মোক্ষম জবাব হিসেবে; কখনো-বা বিএনপি কর্মীর কাছে অফিসের ভাড়ার ১০ হাজার টাকা চাওয়ার ‘অপরাধে’, কখনো শুধুই কোনো চোর বা ছিনতাইকারীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার বদলে নিজেদের ক্ষোভের প্রকাশ গায়ের জোরে করার ইচ্ছা থেকে; কখনো সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি বা জায়গা দখলের ছুতা হিসেবে; কখনো-বা তোফাজ্জল হোসেনের মতো এক ভবঘুরের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অকারণ বর্বরতার নিদর্শন হিসেবে… গত এক বছরে মব হাজির হয়েছে নানা বেশ নিয়ে। স্থান-কাল কিছুটা এদিক-সেদিক হয়েছে মাত্র। কখনো রাস্তা, কখনো কারও বাড়ি, কখনো-বা বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্থান…। ‘মবের মুলুক’ কথাটা এমনি এমনি আসেনি!
সেটার সরল স্বীকারোক্তি অবশ্য ছিল। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গতকাল বৃহস্পতিবারই সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করে নিলেন, ‘আমাদের সরকারের আমলে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, একটা হচ্ছে মিথ্যা মামলা। মামলা হতে পারে, কিন্তু মিথ্যাভাবে লোককে ফাঁসানো, মানে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা; আরেকটা হচ্ছে মব জাস্টিস। মব সন্ত্রাস আমি বলি। এই দুইটা আমাদের খুবই পীড়িত করে।’
উৎপীড়নের বিপরীতে মবকে একেবারে উৎখাতের ফাঁপা বুলিও তো কম আসেনি। কি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, কি সেনাপ্রধান, কি আইন উপদেষ্টা…মবকে কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না বলে বারেবারে সতর্ক করেছেন, হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু সেসব হয়ে থাকল কাজীর গরু, শুধু কেতাবী কথাবার্তায় সীমিত!
পরিসংখ্যান বলছে, মবের দাপট থামেনি। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন জুলাই মাসে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র আজ তুলে ধরেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, এই সদ্য শেষ হওয়া মাসেও গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে। একটু অনুসন্ধিৎসু হয়ে এই মাস ছাপিয়ে এই বছরের শুরু থেকেই চিত্রটা খুঁজতে গেলে একটা ‘ট্রেন্ড’ই চোখে পড়বে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনেরই প্রতি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এ বছরে ৭ মাসের মধ্যে জুলাইসহ পাঁচ মাসেই গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা দুই অঙ্কে উঠেছে। এক অঙ্কে থেকেছে শুধু ফেব্রুয়ারি (৮) আর মে (৯) মাসে। আহতের সংখ্যা প্রথম দুই মাসেই শুধু ২০-এর নিচে ছিল (১৮ ও ১৯), পরের পাঁচ মাসের মধ্যে হাফ-সেঞ্চুরি পার করেছে দুবার (মার্চে ৫৬, জুলাইয়ে ৫৩), বাকি তিন মাসে সর্বনিম্ন এপ্রিলে ২৮!
মব কেন হচ্ছে, সে নিয়ে বিশ্লেষণ গত এক বছরে হয়েছে মবের সংখ্যার সমান্তরালে। বাংলা সিনেমায় শেষ দৃশ্যে পুলিশ এসে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, গত এক বছরে বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীই অনেকাংশে অকার্যকর! এমনই অবস্থা যে, পুলিশের বিরুদ্ধেই মব তৈরি করে পুলিশের কাছ থেকে আসামী ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিংবা পুলিশ হচ্ছে আক্রমণের শিকার! গত মে মাসে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে-তে এক প্রতিবেদনে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেছেন, ‘অভ্যুত্থানের ৯ মাস পরও পুলিশের বিরুদ্ধেই প্রতিদিন গড়ে একটার বেশি মব হচ্ছে। সর্বশেষ এপ্রিলে পুলিশের বিরুদ্ধেই ৩৭টি মব হয়েছে এবং মার্চে ৩৫টি। এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুলিশ কোনো আসামী গ্রেপ্তারের পর একদল মানুষ সংগঠিত হয়েছে আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বা পুলিশের ওপর হামলা করে আসামী ছিনিয়ে নিতে চাইছে।’
পুলিশ কেন অকার্যকর? তাদের অকার্যকর করে রাখা হয়েছে বলে চাপা গুঞ্জন আছে কিছু অংশে। কেউ বলছেন অভ্যুত্থানের সময়ে পুলিশ বাহিনীর যে সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচার না পাওয়া পর্যন্ত পুলিশ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারের আজ্ঞাবহ বাহিনী হয়ে ওঠায় পুলিশে সংস্কারের দাবি উঠেছে, সেটা পুলিশের ভেতর থেকেও উঠছে।
আর এই ফাঁকতালে সুযোগ খোঁজে মব-বাহিনী। কারা করে এসব? আঙুল ওঠে নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি তৈরি করা অভ্যুত্থানের পর রাজপথে পুরোনো রাজনীতিই করে বেড়ানো নতুন ও পুরোনো দলগুলোর দিকে। কেন করে? কোথাও সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে, কোথাও রাজনৈতিক দলের নামে দাপট দেখাতে, কোথাও-বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচয়ে তৌহিদী জনতা নামে।
সেসব ঠেকাতে সতর্কতা তৈরি করতে গিয়েও এমন সব বয়ান আসছে, যা পাল্টা প্রশ্ন তোলার মতো। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বরিশালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, দুদকের সামনে একটা বড় সংকট হয়ে হাজির হয়েছে ‘ভুয়া সমন্বয়ক’রা। যাদের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি উদাহরণ টানলেন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর হাজির হওয়া একটি বাহিনীর। ‘আমরা সেটাকে বলতাম সিক্সটিন ডিভিশন’– বলেছেন তিনি। কিন্তু এই আপাত-নিরীহ কথাটাই ভয়ংকর মনে হয়, যখন প্রশ্ন জাগে–শুধু ‘ভুয়া’ সমন্বয়কই কেন? সমন্বয়ক ভুয়া না হলে তিনি দুদকে প্রভাব খাটাতে পারবেন? দুদক সেখানে আর সংকট দেখবে না?
মজার ব্যাপার কী, এই একই ধরনের প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারকেই বিব্রত করার মতো। কোনো পক্ষের প্রতি নির্দয়, অন্যপক্ষের প্রতি প্রবল প্রশ্রয়ের উদাহরণ কম তো দেখা যায়নি গত এক বছরে। কারও ১০-১৫ জনের মব যমুনার সামনে বসে সহজেই দাবি আদায় করেছে, তাদের জন্য প্রচণ্ড গরমে সিটি করপোরেশন ঠান্ডা পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করছে। আবার প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনে দাগা হয়েছে জলকামান! কোনো মবের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কোনো ক্ষেত্রে প্রচণ্ড বকে দেওয়া হয়েছে–‘এরপর থেকে আর মব মানিয়া লওয়া হইবে না’ হুঁশিয়ারিতে।
এক বছর পূর্তি হওয়ার ক্ষণে এই হুঁশিয়ারিগুলোই প্রশ্ন জাগায়, আর কত মব হলে, আর কত প্রতিবেদনে মবের পরিস্থিতি তুলে ধরা হলে সব ধরনের-সব দলের মবের ক্ষেত্রেই আসলেই মেনে নেওয়া হবে না?
দুই.
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জুলাই মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে আরেকটা চিত্র চোখে পড়ে, যা মনে প্রশ্ন জাগানোর মতো। মবের ঘটনার পাশাপাশি জুলাই মাসে বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যাও। এ মাসে সংখ্যাটা ৫১, যার মধ্যে ৮ জন শিশু, ১ জন কিশোর, ১৩ জন নারী ও ২৯ জন পুরুষ।
অজ্ঞাতনামা লাশের ব্যাপারটাই এমন যে, এটা বিচ্ছিন্নভাবে যখন আসে, শুধুই একটা সংখ্যা হয়ে মানুষের মনে থেকে যায়। ঠিক মনে ধাক্কা দেয় না। সংবাদের ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ বোঝার একটা বড় ইন্ডিকেটর সংবাদমাধ্যমের ‘সর্বাধিক পঠিত’ তালিকা। নেপথ্যে কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা না থাকলে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের খবরগুলোকে কখনোই সেই ‘পঠিত’ তালিকায় ওপরের দিকে পাবেন না। হিসেব সহজ, নাম-পরিচয় না জানা লাশগুলোর ব্যাপারে এসবের সঙ্গে সংশ্লেষহীন মানুষের আগ্রহ থাকে না। হয়তো থাকার কথাও নয়।
কিন্তু এই অজ্ঞাতনামা লাশের বিচ্ছিন্ন সংখ্যাগুলোর মধ্যে যদি কোনো ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়? তাহলে প্রশ্ন জাগে কি না মনে!
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনেরই এই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রতি মাসের প্রতিবেদন খুঁজলে দেখা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত সাত মাসের কোনোটিতেই দেশে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা ৪৫-এর নিচে নয়। জানুয়ারিতে ৪৯, ফেব্রুয়ারিতে ৪৬, মার্চে ৪৯, এপ্রিলে ৪৬, মে মাসে সর্বোচ্চ ৫৫, জুনে ৪৯, এ মাসে আবার পঞ্চাশের ঘরে–৫১!
প্রায় কাছাকাছি সংখ্যা, প্রতি মাসেই! সংখ্যাটা একেবারে কমও নয়। এতগুলো প্রাণ শুধুই অজ্ঞাতনামা লাশ বনে যাওয়ার পেছনে কারণ কী? শুধুই বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা, নাকি আছে অন্য কারণ?
এমএসএফের প্রতিবেদন যা লিখেছে, সেটা ভাবার মতোই-অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের নেতিবাচক প্রভাব জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জোরালোভাবে সকলের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় উদ্ধারে অপারগতায় আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করছে।
একই কথা খাটে তো মবের বিষয়েও। জেনে‑বুঝে মবের রূপ নিয়ে চালানো হামলা যেমন রাষ্ট্রের আইনি ও নিরাপত্তা কাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের কম্ম সাধন করছে, তেমনি নিরাপত্তা নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ফলই হলো অজ্ঞাতনামা লাশ। দুটি বিষয়ই একটি দিকেই তির ছোড়ে। আর তা হলো–রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটিতে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা না থাকা।
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:


সামনে আর একটি সংকট ‘ভুয়া সমন্বয়ক’, কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান
বাড়ছে গণপিটুনি, বাড়ছে অজ্ঞাতনামা লাশ: এমএসএফ
দেশে বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, বাড়ছে গণপিটুনিও
‘বিরতিহীন’ গণপিটুনি কীসের ইঙ্গিত দেয়?
