কলেজে উঠেই নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম।
মানে, মাগরিবের আজানের সাথে সাথেই ঘরে ফেরার যে নিয়ম এতদিন চালু ছিল, তার বিরুদ্ধে। এখন আমি বেশ রাত করে বাসায় ফিরতে পারি। চাইলেই কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে হুটহাট বেরোতেও পারি। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অনায়েশে দু’চার ঠোঙা বাদাম কিম্বা ঝালমুড়ি খেতে পারি। রিকশায় দুলতে দুলতে চলে যাওয়া কোনো তরুণীর বিনুনী দেখতে দেখতে ডুবে যেতে পারি কল্পনার দীঘিতে- এমনই একটা সময় ছিল তখন।
দীপ্র (প্রকৃত নামটি এখানে চেপে গেলাম) সম্পর্কে আমার সমবয়সী ভাগ্নে, দূর সম্পর্কের যদিও। দুজনই একসাথে ঢাকা কলেজে যাই। আমি যদিও স্বাধীনতা ভোগ করছিলাম, দীপ্র তখনো পারিবারিক অনুশাসনের গণ্ডিতে আবদ্ধ। সন্ধ্যা হলেই সুড়সুড় করে বাসায় ফেরে। অনেকটা খোঁয়াড়ে ফেরা গবাদির মতো-এ কথা বলে অনেক খেপাতাম ওকে। কিন্তু কলেজে গেলেই তার অন্য চেহারা। ক্লাস করে না, সে কমবেশি আমরা কেউই করতাম না যদিও। কিন্তু তারটা বাড়াবাড়ির অন্য পর্যায়ে। ক্যান্টিনে সারাদিন কাটায়, মিছিলের অগ্র সেনা, বেঞ্চ জুড়ে দিয়ে তার উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়, ভ্যাস ভ্যাস করে সিগারেট ফুঁকে, উস্কো খুস্কো চুল। আবার বিকেল হবার আগে আগেই সিগারেটের গন্ধ দূর করার জন্য মাউথ স্প্রে দিতে থাকে। গালে ক্রিম ঘষে, যেন সারাদিনের রুক্ষতা-মালিন্য কেটে যায়। সন্ধ্যে হবার আগেই মাথার সিঁথি ঠিক করে নিপাট সুবোধ বালকের মতো সে যখন বাড়ি ফেরে, আমাদের হয়তো তখন সবে সান্ধ্যকালীন পথের আড্ডা শুরু হতো।
মাঝে মাঝে সপ্তাহান্তের সুযোগে দীপ্রর বাসায় যাই। গল্পগুজব করি। ওর বাসায় বাবুর্চি ছিল, দারুণ সব রান্না হতো। পেট পুড়ে খাই, গলা উজাড় করে বিকট শব্দে ঢেঁকুর তুলি। ওদের আড়াই তলা বাসার ছাদে বসে সেই সব রাতে অনেকক্ষণ আড্ডা দিই। জিগাতলার সে জায়গাটিতে তখনো পাঁচ তলার চেয়ে উঁচু বাড়ি ছিল না।
একদিন সন্ধ্যায় দেখি ওর মুখ অন্ধকার। ব্যাপার কি জানার জন্য জিজ্ঞেস করি, চোখে মুখে লোডশেডিং কেন রে দীপ্র?
সে কোনো উত্তর দেয় না। ছাদের দরজা লাগিয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকে। ওর সাহস দেখে আমি স্তম্ভিত। যদি কেউ দেখে ফেলে! চোখে মুখে গুরুদত্তের মতো ব্যর্থ মনোরথের একটা প্রচ্ছায়া। খুব একটা চাপাচাপি করতে হয় না। বরফ গলতে শুরু করে। রাস্তার পাশের ছাদের রেলিংয়ের দিকে টেনে নিয়ে এসে আমাকে বলে, ঐ যে একতলা বাড়িটি দেখছিস, ওখানেই থাকে?
- কে থাকে?
- ঝুমু।
- মানে কি?
- ক্লাস টেন –এ পড়ে। কি যে একটা অপূর্ব মেয়ে রে দোস্তো বলে বোঝাতে পারবো না। ডানাকাটা পরী। দেখলে মনে হয় যেন, গোসল করার আগে এই মাত্র ডানা দুটো খুলে এসেছে। ঘুমাতে পারি না এক ফোঁটা। সারাক্ষণ ওর মুখটা চোখে ভাসে। গলায় দম আটকে থাকে। কি করি?
- তুই কি প্রেমে পড়েছিস নাকি?
- কি জানি, জানি না। নিচে চল। তোকে একটা গান শোনাবো। কালই কিনেছি ক্যাসেটটা। সারারাত বাজিয়ে শুনি।
ওর ঘরে একটা মনোসিস্টেমের ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। যেটাতে কিনা আবার রেকর্ডও করা যেতো। আমাকে ঘরে নিয়ে ছেড়ে দিলো কিশোর কুমারের সদ্য বের হওয়া ক্যাসেট, ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে, আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে, তুমি বারান্দাতে দাঁড়িয়ে থেকো, শেষ দেখাটা দেখতে পাবে...’ ১৯৮৮ সাল, কদিন আগেই কিশোর বাবু মরে গেছেন। অ্যালবামটা সুপার হিট।
বুঝলাম দীপ্রর অবস্থা কাহিল। কিছুতেই মন ভালো হচ্ছে না তার। রাস্তার আড্ডা বাদ দিয়ে আমি নিয়মিত ওর বাসায় যেতে লাগলাম। ওকে সময় দিতে লাগলাম। হাজার হলেও ওর বাসায় এতো বিরিয়ানি খেয়েছি। এতোটা অকৃতজ্ঞ হই কি করে? কিছুতেই কিছু হল না। অবস্থা আরও খারাপের দিকে যেতে লাগলো। ভ্যাস ভ্যাস করে সিগারেট ফুঁকে। এখন নিজের ঘরেই শুরু করেছে! ব্যাক গ্রাউন্ডে কিশোর কুমার গেয়ে চলেন, ‘চিতাতেই সব শেষ, হায়, চিতাতেই সব শেষ ...’।
ওর অবস্থা দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। কি করে ওকে সাহায্য করা যায় ভাবতে শুরু করলাম। বলি, কথা বল ঝুমার সাথে। ঝুমাই তো নাম নাকি?
অবশ্যই পড়ুন:
- এমন হেয়ালি করে কথা বলছিস। তুই আমার বন্ধু নাকি রে। নামটাও মনে রাখতে পারসি না। ঝুমা না, ঝুমু। কথা বলেছি। দেখা করতে চেয়েছি, রাজি হয় না। একবার বাইরে কোথাও দেখা হলেই ম্যাজিকের মতো পটিয়ে ফেলবো। কিন্তু কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। কিছু একটা কর দোস্তো।
কিশোর বাবু তখন নেপথ্যে গাইছেন, ‘এ জীবন প্রেমেরই এক পাতা বাহার কবিতা’।
বললাম, তোর সাথে দেখা করিয়ে দিতে পারলেই হবে? বাকিটা তুই সামলে নিতে পারবি?
- পারব মানে, আমার যাদু তো তুই জানিসই না।
- আচ্ছা ঠিক আছে। তোর বাসায় আমাকে দুইদিন থাকার ব্যবস্থা করে দে’।
- কেন, কি করবি?
- এখনো জানি না কি করবো। কিন্তু আপাতত নজর রাখবো ঝুমা সরি ঝুমুর উপরে।
পরের দু’দিন-দু’রাত ওর ঘর থেকে বের হলাম না। জানালার পাশে বসে একদৃষ্টিতে ঝুমুদের বাসার দিকে তাকিয়ে থাকি। দীপ্রর বায়নোকুলার অনেক কাজে এলো। দেখি একটি নয় দুটি মেয়ে। জিজ্ঞেস করি, আরেকটি মেয়ে কে রে?
- ওটা রুমু, ওর ছোটো বোন। মানে, মাই সিস্টার ইন ল’, বুঝলি না গাধা।
মনে মনে ভাবি কে যে বড় গাধা। তবে ওদেরকে নিবিষ্ট মনে আমি পর্যবেক্ষণ করছি দেখে, দীপ্র কিছুটা শান্ত এখন। গুণগুনিয়ে গানও গায়। ‘অ্যায় মেরে হাম সাফার, এক যারা ইন্তেজার’। আমির খানের ‘কায়ামাত সে কায়ামাত তাক’ বাজারে কেয়ামত নাজিল করে দিয়েছে। আমাকে জিজ্ঞেস করে, কি করবি তুই যে সে আমার সাথে দেখা করতে রাজি হবে? আমার তো আর সহ্য হচ্ছে না দোস্তো।
- ধৈর্য ধর। ইন্নাল্লাহ মাস সাবেরিন। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। আমি আসলে একটা চিঠি লিখবো। প্রেমপত্র বলতে পারিস। মেয়ে তোর সাথে দেখা করতে বাধ্য। আমি আজ বাসায় চলে যাবো। তোর ক্যাসেট প্লেয়ারটা আমাকে দেয়, আর সাথে কিশোর কুমারের ক্যাসেটটাও। তুই কাল সকালে আমার বাসায় আসিস।
সে রাতে আমি সত্যি সত্যিই ঘুমালাম না। চোখ বন্ধ করে কিশোর বাবুর গান শুনতে লাগলাম, আর ভাবতে লাগলাম। নিজের সামনে একটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করলাম। বড় মুখ করে তো বললাম। এখন যদি কাজ না হয়। প্রেমপত্র তো জীবনেও লিখিনি আমি, তবে? শেষ রাতের দিকে কাগজ কলম নিয়ে টেবিলে বসে পড়লাম। নিজেকে ভেতরে ভেতরে দীপ্র ভাবতে শুরু করলাম। কি লিখেছিলাম সেই প্রত্যূষে, আজ আর মনে নেই।
খুব সকালে দীপ্র হাজির। সেও মনে হয় ঘুমায়নি সারারাত। ওর হাতে চিঠি দিয়ে বললাম, দেবার আগে তুই নিজে রি-রাইট করে নিস।
‘আচ্ছা’ বলেই দীপ্র হাওয়া। আমি পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পরি। ঘুম থেকে জেগে টিউশনিতে চলে যাই। সেদিন আর ওর সাথে দেখা হয়নি আমার।
পরদিন যখন ওর সাথে দেখা হলো, দেখি ওর চোখে মুখে কালবৈশাখীর পূর্ব রূপ।
জিজ্ঞেস করলাম, দিয়েছিলি চিঠিটা?
- হুম।
- তোদের বাইরে কোথাও দেখা হয়েছে?
- হুম হয়েছে।
- পেরেছিস বোঝাতে ওকে? তাহলে চোখ মুখ অমন করে আছিস কেন? ঝুমু কি বলল শুনি?
- একটা ভেজাল হয়ে গেছে রে।
- কি রকম ভেজাল?
অবশ্যই পড়ুন:
- দেখা হবার পর ঝুমু আমাকে বলল, আমার মনে হয় এই চিঠিটা আসলে আমাকে না, আমার ছোটো বোন রুমুকে নিয়ে লেখা। এর বর্ণনার সাথে ওরই মিলে-আমার সাথে না। আমি চুল বেণী করি না, সে করে। আমি জিন্স পরি, রুমু সবসময় সালোয়ার কামিজ। আমি তবুও আজ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি দুটি কারণে। এক, আমার আসলে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। এসএসসির পরই আমার বিয়ে। তাই মিছেমিছি আপনি আশায় থাকবেন না। দুই, এটা জানাতে যে আপনার লেখার হাত খুব ভালো। লেখাটা সিরিয়াসলি করে দেখতে পারেন। বলা যায় না, কোনো একদিন লেখক হয়েই যেতে পারেন। তখন হয়তো আমারই আপনার কাছে যেতে হবে অটোগ্রাফ নিতে। হি হি হি।
ওর কথা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেলো। আমি কি তবে রুমুকেই এই কদিন দেখেছি? দীপ্রর কাছে একবারও জানতে চাইনি কোনটি রুমু আর কোনটি ঝুমু। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, রি-রাইট করার সময় তো তুই বুঝতে পেরেছিলি, তাহলে?
- ইয়ে দোস্তো, আমি আসলে তোর চিঠিটা খুলেও দেখিনি। তোর বাসা থেকে ফেরার পথেই ওকে দেখে আগপিছ কিছু না ভেবেই খামটা গছিয়ে দিয়েই আমি চম্পট। দুপুরের পরেই ফোন, ঝুমু দেখা করতে চায় আমার সাথে, পরদিন সকালে। আমি তো তখন উড়ছি, হাওয়ায় হাওয়ায়।
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। বন্ধুর হঠকারিতা এবং নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য বেশ খারাপ লাগা শুরু হলো। কিন্তু, মনের গভীরে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম শ্লাঘা অনুভবও করছিলাম। পত্রলেখক হিসেবে আমি তাহলে ব্যর্থ নই। আমি সেই ভাবনার পাশ কাটিয়ে দীপ্রর কথা ভাবতে লাগলাম। বেচারা কি লজ্জাতেই না পড়ে গেলো। দু–তিনদিন আর ওর সাথে দেখাই করি নি।
একদিন সেই এলো আমার বাসায়। আমাকে জোর করে ওর বাসায় ধরে নিয়ে গেলো। ওর চোখে মুখে সেই ব্যর্থ প্রেমিকে ভাবটি আর নেই। বলল, চল, তোকে একটা নতুন গান শোনাবো। ব্যান্ডের গান।
প্লেয়ারে ক্যাসেট ঢুকানোর সময় বলল, দোস্তো, তুই আসলে অনেক বিচক্ষণ। আমি যা দেখতে পারিনি, তুই ঠিকই দেখেছিস।
- কি রকম?
- আসলে আই অ্যাম মেইড ফর রুমু, নট ফর ঝুমু। সেটা আমি না বুঝলেও তুই ঠিকই বুঝেছিস। তাই চিঠিটা ওকে নিয়েই লিখেছিস। আই অ্যাম ইন লাভ উইথ হার, দোস্তো। থ্যাংকস। এখন গানটা শোন।
ক্যাসেটে তখন বাজছে ফিডব্যাক, ‘কেন খুলেছো তোমার ঐ জানালা, কেন তাকিয়ে রয়েছো জানি না তো, মনেতে কি আছে বল না...’। দেখি জানালার পর্দা সরিয়ে দীপ্র তাকিয়ে আছে। আমার কানকে বিস্মিত করে শুনি সে বলছে, এবসলিউটলি অ্যা ফেইরি। একদম ডানা কাটা পরি। চোখ ফেরানো যায় না। দোস্তো, আরেকটা চিঠি লিখে দে’ না, প্লিজ।