টেলিভিশন নিয়ে যাদু ভাবনার শুরু আমার সেই কবে থেকেই!
এটাকে একধরনের দম বন্ধ করা বিস্ময়কর ভালোলাগা বলা যায়। কিছুতেই এড়াতে পারিনি, আজও পারি না।
আগের কোনো এক লেখায় বলেছিলাম, আমাদের শহুরে শৈশবে আমি ভাবতাম, আর্থিক সঙ্গতি একটি পরিবারে আছে কি নেই- বিষয়টি দুটি জিনিসের উপর নির্ভর করে। মানে, কোন পরিবারটি সচ্ছল (বড়লোক) কিম্বা অসচ্ছল (গরীব), তা নির্ণয়ের আমার নিজস্ব একটা মাপকাঠি ছিল। সে দুটি বস্তু হলো– বাসায় ফ্রিজ এবং সাদাকালো টেলিভিশন থাকা। যে পরিবারে এই দুটিই থাকতো, তারাই বড়লোক। আর যাদের নেই, তারা হতদরিদ্র, মানে আমরা। সে আমার আব্বা যত বড় সম্মানের চাকরিই করেন না কেন। অজস্র বইপত্র সারা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, আমার মনের নির্ণায়ক সেই একই জায়গায় স্থির। কিছুতেই বদলায় না।
সে অর্থে আমরা বরাবরই গরীব। অথচ, সবসময়ই বড়লোকের (!) প্রতিবেশী ছিলাম। কারণ, তাদের বাসায় টেলিভিশন এবং ফ্রিজ দুটোই ছিল। সেই পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরা আমাদের সমবয়সী বন্ধুবান্ধব হলেও, ওদেরকে সবসময় আলাদা জগতের মানুষই মনে হতো। খেলায় ওদেরকে বিশেষ জায়গা দেওয়া হতো। আর তাতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকতো না। বিকেলে ওদের বাসায় গিয়ে টারজান দেখতে হবে যে।
আজ সেই যাদুর বাক্স নিয়েই বলবো।
তখন রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছুটির দিন বেলা করে ঘুম থেকে উঠবো, সেটাই স্বাভাবিক। তবুও অনেক ভোরে ঘুম ভেঙে যেতো আমার। উঠে না গিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতাম। সন্ধ্যা ৭টায় টারজান হবে। জানি না সেটা কল্পনা কিনা- নিজেকে আফ্রিকার গহীন অরণ্যে আবিষ্কার করতাম। জঙ্গলে বেড়ে ওঠা অর্ধনগ্ন একটি মানুষের সাথে আমিও যেন বৃক্ষলতায় ঘুরে বেড়াতাম। জেইন নামক আধুনিকার প্রতি ধীরে ধীরে এক সুপ্ত চাওয়া বেড়ে ওঠার সেই বুঝি শুরু। সে এক অপূর্ব আত্ম-নিমগ্নতা। সারাদিন, খেলার সময়, শিবলীকে বাড়তি খাতির করতাম। অহেতুক প্রশংসা করতাম। সন্ধ্যায় ওদের বাসায় গিয়ে সেই টিভি সিরিজটি দেখা যেন নির্বিঘ্ন হয়। ইউএনডিপি-তে কাজ করা শিবলীর রাশভারি বাবা যেন কোনো বাধার কারণ না হন, তাই উনাকে দেখলেই বিনয়ের অবতার হয়ে যেতাম। কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে সালাম দিতাম। বাসায় অতিশয় ভদ্র আচরণ করতাম, এবং মনে মনে প্রার্থনা করতাম, আব্বা যেন সন্ধ্যায় তাঁর কোনো বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যান। তাহলে তো শিবলীদের বাসায় যাবার আর কোনো অর্গল থাকবে না। কিন্তু, তেমনটি কি সবসময় হতো?
তেমনি এক রোববার সন্ধ্যায় আব্বা কোথাও গেলেন না। বিকেল থেকে তাঁর মেজাজ খারাপ। সাধারণত মাসের শেষ সপ্তাহে তাঁর এমন অবস্থা হয়। আম্মা জানিয়ে দিয়েছেন ঘরে আর টাকা নেই। মাসের আরও কিছুদিন বাকি তখনো! তখন বাসায় থেকে নাকমুখ গুঁজে প্রুফ-রিডিং করতেন। তাঁর সামনে গিয়ে যে শিবলীদের বাসায় যাবার অনুমতি চাইবো, সাহসে ঠিক কুলালো না। কিন্তু একটু পরেই যে টারজান শুরু হয়ে যাবে! কি করি? ভাইবোন মিলে তাই একটা ফন্দি আঁটলাম।
আমাদের বাসায়, যে ঘরটিতে আমরা পড়াশোনা করি, একটা জানালা ছিল। ঠিক জানালা না। অনেক উঁচুতে, সিলিংয়ের কাছাকাছি একটা বড় জানালা ধরনের খিড়কি। অনেকটা ঘুলঘুট্টির মতো। অনেক উঁচুতে হওয়াতে, কিম্বা আমরা নিজেরাই অনেক পিচ্চি ছিলাম বলে, ওটার নাগাল পাওয়াই কঠিন ছিল। সেই জানালা দিয়ে তাকালে শিবলীদের বসার ঘর দেখা যায়। আর যদি পর্দা টেনে না দেওয়া হয়, তবে হয়তো দেখা যাবে সেই যাদুর অরণ্য। যেই ভাবা সেই কাজ। ভাইবোন মিলে পড়ার টেবিলটা টেনে আনলাম জানালার নিচে। কিন্তু তিনজনই একসাথে উঠলে সেটি নির্ঘাত ভেঙে পড়বে। তখন হবে আরেক বিপত্তি। ছোট হলেও এটা ঠিকই বুঝতাম। তাই ঠিক করলাম, একজন একজন করে দেখবো। প্রথমে সর্বকনিষ্ঠ ভাই, পরে বোন। একদম শেষে আমি। অপর দুইজন খেয়াল রাখবে আব্বার গতিবিধি। পরে, নিজেদের মধ্যে পর্দায় দেখা গল্প ভাগাভাগি করে জুড়ে নিলেই তো পুরো গল্পটি জানা হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন :
তো একে একে ভাইবোনের পর্ব শেষে এল আমার পালা। শিহরিত হৃদয় আর উন্মুখ চোখ নিয়ে তাকাই। ততক্ষণে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আমার চোখ দূর থেকে টেলিভিশনের পর্দায় নিবদ্ধ। কথা বা আওয়াজ বোঝার কোনো উপায় নেই। অত দূর থেকে কি আর শব্দ শোনা যায়? আর শোনা গেলেও, ইংরেজি কথা তখনো কিছুই বুঝতাম না। তাই, কল্পনার আশ্রয় নিতাম। ফলে একেকজনের গল্পের সংস্করণ হতো আলাদা।
যাই হোক, আসল গল্পে ফিরে যাই। ইংরেজি বুঝতে না পারার কারণে, এই দূর থেকে টেলিভিশন দেখায় কোনো ঝামেলা নেই। আমি তাকিয়ে আছি। কোনো দৃশ্য মিস করা যাবে না। ক্লাইম্যাক্সের চূড়ান্ত। ঠিক এমন সময় একটা অঘটন ঘটলো।
ঢাকায় তখন খুব কম বাসাতেই টেলিভিশন ছিল। আর বেশিরভাগ বাসায়ই একতলার হতো। সে কারণেই অনেক মানুষ এসে সেই বাসার জানালায় ভিড় জমাতো। গৃহকর্তাও সে জ্বালাতন অনেকটা সয়েই যেতেন। জানালা খোলাই রাখতেন। কেউ কেউ হয়তো বসার ঘরে ঢুকে মেঝেতে বা সোফায় বসে তা দেখার সুযোগও পেতো। মনে আছে, সেই সন্ধ্যায়, জানালার সামনের জটলা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তা হট্টগোলে পরিণত হয়েছিল। একসময় শিবলীর রাশভারি বাবা, যিনি ইউএনডিপি-তে কাজ করতেন, বিরক্ত হয়ে জানালা বন্ধ করে দিলেন। আমাকে পুরোপুরি ক্লাইম্যাক্সে রেখে যাদুর পর্দা অন্ধকারে ঢেকে গেল। সেই ছোট্ট বুকে আমার অভিমান নামক আঁধার নেমে আসে। কিন্তু আমি চট করে নেমে এলাম না। চুপচাপ টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে থেকে এক দৃষ্টিতে সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া অন্ধকার জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
সিরিজ গল্প বলার সময় আমি কি বলবো? আমি যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শূন্য অন্ধকার জানালাই কেবল দেখেছি, আর কিছুই যে দেখিনি, ভাইবোনদের বললাম না। আমার পালা যখন এল, বানিয়ে বানিয়ে আমি একটা বিষাদ সর্বস্ব গল্প বলে দিলাম। আমার স্বকপোলকল্পিত সে গল্পে ছড়িয়ে দিলাম নিজস্ব চিন্তা। বানিয়ে গল্প বলার শুরু আমার সেই থেকেই।
সপ্তাহের পরের ছয়দিন কাটিয়ে দিলাম সংশয় ভরা এক অপরাধবোধ নিয়ে। রোববার সকালে আবার নিমগ্ন হয়ে পড়লাম- কি করে সে সন্ধ্যায় নির্ভেজালে টারজান দেখা যায়, এই নিয়ে। শিবলীকে দলনেতা বানাতে আমার নিঃসংকোচ সমর্থন দিলাম। ওর রাশভারি বাবা, যিনি নাকি ইউএনডিপি-তে কাজ করতেন, তাঁকে অতিরিক্ত সমীহ করলাম। বাসার গেইটে সাপ্তাহিক বাজার (অনেক পরিমাণ) নিয়ে এলে, দৌড়ে গেলাম তাঁকে সাহায্য করতে। এগিয়ে গেলাম সেসব বিশাল ব্যাগ বাসায় পৌঁছে দেবার জন্য। পরে গম্ভীর গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় থাকো যেন? কি নাম তোমার?
তার মানে তিনি আমাকে কোনোদিন লক্ষ্যই করেননি। জানেনই না যে আমি তাঁর নিকটতম প্রতিবেশী, এবং তাঁর ছেলে শিবলীর সকল আনাড়ি কাজের অকুণ্ঠ সমর্থক। মনটাই দমে গেল। কিন্তু তেমন গা করলাম না। বড়লোক মানুষের কি আর অত কিছু খেয়াল করলে চলে? আমি সে বিষয়ে আর বেশি সময় না নষ্ট করে নিজের মনে দোয়া করতে লাগলাম, আব্বা যেন আজ সন্ধ্যায় কোথাও বেড়াতে যান।