সুব্রত কুমার দাসের সাক্ষাৎকার 

বাংলাদেশি নভেলস ওয়েবসাইটের প্রারম্ভ এবং দীর্ঘ পথপরিক্রমা–০১ 

["মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে
আমি মানব
একাকী ভ্রমি
বিস্ময়ে... ভ্রমি বিস্ময়ে"! (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) 

জীবনের মনোরথ অবিরাম ছুটে চলার। তাতে সওয়ার হয়ে পাড়ি দিতে হয় বহুক্রোশ দূরের পথ। যাওয়ার পথে কতকিছুই নিমিষেই চোখের আড়ালে চলে গিয়ে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় আর কিছু চিরকালীনতায় রয়ে যায় হৃদয়ের মণিকোঠায়। যখন আমরা এসব পরিক্রমা অতিক্রম করছি তখন ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাই না সবই আমাদের ঋদ্ধতার ফল।

মাতৃভূমি থেকে প্রবাসে, স্বদেশ থেকে পরবাসে, ফরিদপুর থেকে টরেন্টোতে। এ বছর তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ "উৎস থেকে পরবাস" প্রকাশিত হয়েছে। এতে রয়েছে নানান অজানা অধ্যায়।  শৈশব স্মৃতি রোমন্থন করা থেকে শুরু করে কর্মজীবন, সাহিত্যের জগতে প্রবেশ, কানাডায় আগমণ, কিছু হৃদয়গ্রাহী মানুষের সংস্পর্শ, কানাডার সাহিত্য জগতে প্রবেশ, বিচরণ, ধীরে ধীরে কাজের প্রসার বৃদ্ধি। দুই দেশকে একটি বিষয় সংযুক্ত করেছে তা হচ্ছে তাঁর সাহিত্য প্রীতি। আরও স্পষ্ট করে বললে তিনি সংযুক্ত করেছেন নিজ মাতৃভূমি এবং কানাডাকে এক সূত্রে। আর এ কাজটি তিনি করেছেন নিজের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন ওয়েবসাইটের (Bangladeshi Novels-  bdnovels.org) এর মাধ্যমে।

এই দীর্ঘ সফরের বিভিন্ন সময়ের টুকরো স্মৃতি কথা আজ আমাদের শোনাচ্ছেন শিক্ষক, লেখক, গবেষক, সমালোচক, উপস্থাপক এবং বিশিষ্ট সংগঠক সুব্রত কুমার দাস। ঊনষাট বছরের পথচলায় যা কিছু পাথেয় রয়েছে তা জানতে আমরা প্রচেষ্টা করেছি। এই প্রচেষ্টায় আমাদের সাথে রয়েছেন কানাডার হ্যালিফ্যাক্স শহরের তরুণ লেখক অতনু দাশ গুপ্ত।]

অতনু: আপনার ওয়েবসাইট সম্পর্কে সাম্প্রতিক আত্মজৈবনিক বই ‘উৎস থেকে পরবাস’-এ আমরা জানতে পেরেছি। তবে ওয়েবসাইটের কথা বলতে গেলে আপনি এর আগের সাক্ষাৎকারে যেভাবে বলেছেন, তখন সার্চ ইঞ্জিনে কোনো বাংলা ভাষাভাষী কোনো সাহিত্যিক বা লেখকের নাম লিখে সার্চ দেওয়া হলে রেজাল্ট আসত না! 'এরর অন পেজ' এ কথাটি আসত। বিষয়টা আপনাকে অনেক পীড়া দিত। এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আপনি একটা উদ্যোগ নিলেন, সেটা হলো একটা ওয়েবসাইট নির্মাণ করা যাতে কেউ খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের লেখকদের নাম খুঁজে পাবেন, তাঁদের নামে লেখা বেরিয়ে আসবে। এত বড় উদ্যোগের পেছনের গল্পটা যদি আমাদের একটু বলেন।  ‘উৎস থেকে পরবাসে’-এ যেখানে আপনি দেবান্জনা মুখার্জি ভৌমিকের সাথে আলাপরত হয়ে আমাদের এর গল্পটা আংশিক শুনিয়েছেন। এখন আমরা এর আখ্যান সবিস্তারে শুনতে আগ্রহী। 

সুব্রত কুমার দাস: বাংলাদেশে ইন্টারনেটের সংযোগ ঘটে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে। আমরা ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে ইন্টারনেট শব্দের সাথে পরিচিত হতে শুরু করি। তখন উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তখনও এর তেমনভাবে ব্যবহার শুরু  হয়নি। সে সময়ের প্রেক্ষিতে বলতে গেলে বাসাবাড়িতে ইন্টারনেটের সংযোগ নেওয়া এক রাজকীয় ব্যাপার ছিল। এত টাকার প্রয়োজন ছিল যে, এমন স্বপ্ন দেখাটাও কঠিন ছিল আমাদের জন্যে।  সেসময় ঢাকায় বেশ কিছু সাইবার ক্যাফে তৈরি হয়, যারা ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তারা ঘণ্টার হিসেব করে ইন্টারনেটযুক্ত কম্পিউটার ভাড়া দিতেন। প্রথমদিকে ইমেইলের সাথে পরিচিত হওয়া বা ইন্টারনেটে অন্যান্য কাজের সাথে মানুষজন ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়া শুরু করে। 

আমি যেহেতু একজন সাধারণ পরিবারের মানুষ, তাই তখন আমার চিন্তা ভাবনাও ওই পর্যায়ে যায়নি। কিন্তু বোধ করি ১৯৯৭ বা ১৯৯৮ সালে একটা ঘটনা ঘটে। আমার শিক্ষকতার সুবাদে বাসায় ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসতো তখন। ধানমন্ডির এক ছাত্র আমাকে প্রথম ইমেইল এবং ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করে। সে আমাকে কয়েকদিন বলার পরে একদিন আমরা দুজনে সাইবার ক্যাফেতে যাই। ও আমাকে ইমেইল একাউন্ট করে দেয়। সেটা হটমেইল একাউন্ট ছিল। কীভাবে ইন্টারনেটে কোনো জিনিস খুঁজে পেতে হয় সেটাও দেখিয়ে দিয়েছিল ওইদিন। তখনও কিন্তু গুগল সার্চ ইঞ্জিন আসেনি। তখন খুব সম্ভবত আমরা ইয়াহু সার্চ ইঞ্জিন বা অন্য কোনো কিছু ব্যবহার করতাম। 

আমার এ গল্পে ছাত্রের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে বোঝাতে চাইছি ছাত্ররাও শিক্ষককে অনেক কিছুই শেখাতে পারে। শুধু শিক্ষক শেখান, তা কিন্তু নয়। জীবনে এমন বহু ঘটনা আমার রয়েছে যখন আমি দেখেছি যে একজন ছাত্রের আচরণ, চিন্তা, ভাবনা এসব আমার মতো একজন শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠের চিন্তাধারাকে পরিপুষ্ট করেছে। যা-ই হোক, সেই ছাত্রের দেখানো পথে আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে শুরু করলাম এবং ক্রমে ক্রমে যে বিষয়টি আমার সামনে অন্য একটি জগত উপস্থাপিত হতে শুরু করলো।  তখনকার দিনে তো আমরা বই কিনতাম, বই কিনতে আগ্রহী থাকতাম। প্রচুর বই সংগ্রহ করতাম। ধরা যাক, ইংরেজি সাহিত্যের কথায় আসলে শেক্সপিয়ার, কিটস বা বায়রন নিয়ে কিংবা ডি.এইচ. লরেন্স – যিনি আমার খুবই প্রিয় উপন্যাসিক তাই তাঁর নাম বলছি– কিন্তু তাদের লেখা পাওয়া তখনকার দিনে তো খুব কঠিন কাজ ছিল। কারণ তাদের নিয়ে যেসমস্ত বই বা লেখা প্রকাশিত হতো সেগুলোর দাম অনেক বেশি ছিল। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় লাইব্রেরিতে বা ব্রিটিশ কাউন্সিলে পাওয়া যেত। 

কিন্তু ইন্টারনেটে সার্চ করা শিখে যেটি হলো তা হচ্ছে এরকম জায়গায় না গিয়ে আমি শেক্সপিয়ারের উপর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ বা নাটকের বা সনেটের উপরে একটি বিশেষ অভিসন্দর্ভ পড়ে ফেলতে পারছি। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার এবং এই পথের ভেতর দিয়ে আমি প্রায় প্রথম এক দুই বছর কাটালাম।  প্রতিদিনই ধরা যাক আমি প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ পৃষ্ঠা বা চল্লিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রিন্ট নিতাম। যে লেখাটি পেয়েছি, ভালো লেগেছে সেগুলো সাইবার ক্যাফে থেকে বাসায় এনে সংগ্রহ করতে লাগলাম। এভাবে বিশাল এক ভান্ডার হয়ে গেল আমার। 

অধিকাংশ সময়ই তখন সাহিত্য নিয়েই পড়াশোনা চলছে। চর্চার এক পর্যায়ে এসে মাথায় প্রশ্ন এলো, সাহিত্যের যে এত বিপুল পরিমাণ ভান্ডার, বাংলা সাহিত্য নিয়ে কি ওয়েবসাইটে কিছু আছে? তখন সার্চ ইঞ্জিনে বাংলা সাহিত্যের বিষয়গুলোকে খুঁজতে শুরু করি। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আছেন, খুব অল্প সল্প আছেন। সে-সময় উত্তর আমেরিকা থেকে একটি ইংরেজি ভাষী ওয়েবসাইট চলতো। সেই সাইটটি শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নয়, মূলত বাংলা সাহিত্য নিয়ে। তারা বাংলা সাহিত্যের বিষয়গুলোর কাজ খুব যত্ন নিয়ে করতেন। খুব মূল্যবান ওয়েবসাইট ছিল এটি। অনেক ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করতেন ওরা। কিন্তু সর্বোপরি বিস্তারিতভাবে কোনো সাহিত্যিককে নিয়ে তেমন কোনো কাজ ছিল না।
 
এরপর কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আরেক ভদ্রলোক যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি ওয়েবসাইটের যাত্রা শুরু করেন। এসব দেখতে দেখতে আমার মাথায় ধারণা এলো ওয়েবসাইটে তো বাংলা ভাষার সাহিত্য নিয়ে কিছু কাজ থাকা দরকার৷ তখনও বাংলা ভাষা পড়া যাবে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়নি, কারণ ইউনিকোড আসেনি। ইন্টারনেটে যে কোনোদিন বাংলা ভাষায় কোনো কিছু পরা যাবে সে কথা বোধ করি আমাদের কারও মনেই আসেনি।  

তখন আমি বাংলা ভাষার সাহিত্য নিয়ে ইংরেজি বেশ কিছু পত্রিকায়; যেমন বাংলাদেশ অবজারভার, ইনডিপেনডেন্ট ইত্যাদিতে লেখালেখি করছি। বেশ কিছু আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। সেই আর্টিকেলগুলো নিয়ে অগ্রসর হওয়া শুরু করলাম। এর শুরুটা হচ্ছে এমন–  ধরা যাক, একটি সাহিত্য পত্রিকার হদিশ পেলাম।  তাদের আমি ইমেইল করতে শুরু করলাম যে তাঁরা যেহেতু সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন– আমি বাংলাদেশের একজন লেখক,  যদি আমাদের দেশের সাহিত্য নিয়ে লেখা পাঠাই – তাঁরা আমার লেখা ছাপবেন কি না?  তাদের মধ্যে দু'চারজন উত্তর দিয়েছেন। লেখা পাঠালে তারা সেগুলো পাবলিশও করেছেন। 

সেগুলো অনেক আনন্দের ছিল। ইন্টারনেটে লেখা ছাপা হয়েছে সে এক বিপুল খুশির জোয়ার বয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার ছিল আমার কাছে। তবে সে পত্রিকাগুলো তো এখন আর নেই। কারণ ইন্টারনেটে তো সবকিছুই খুব দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হয়। ওই সময় একটা কাজ আমি সবসময় করতাম সেটা হচ্ছে ওদের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের লেখা দেখতে পাওয়াটা ছিল আবেগপূর্ণতার। যেমন আমরা কোথাও লেখা ছাপা হলে সেটা খুলে খুলে বারবার দেখি, দেখতে কেমন হয়েছে। 

তখন একই সাথে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমি তখন অনেক পড়ছিলাম, বিশেষ করে বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে। হয়তো দেখা গেছে কোনো লেখককে নিয়ে পড়েছি, বা যে বিষয়েই পড়েছি, সেসব নিয়ে আমি দীর্ঘ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি। যেমন  সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক বা শহীদুল্লাহ্ কায়সারের নাম যদি বলি, এদের প্রত্যেককে নিয়ে আমি ঢাউস আকৃতির বাংলা প্রবন্ধ লিখেছি। তবে একই সাথে ইংরেজি ভাষায়ও প্রবন্ধ তৈরি করেছি। কারণ সেসময় ইংরেজিতে বাংলা ভাষার সাহিত্যের বিষয়গুলো লেখার ব্যাপারটা আমার মধ্যে বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল এবং পত্রিকায় লেখাগুলো আসতো সে ব্যাপারগুলো আমার কাছে বেশ আনন্দের ছিল। 

ইন্টারনেট শেখা এবং এর ভেতর দিয়ে সাহিত্যকে প্রদর্শনের যে একটি সুযোগ রয়েছে সে ভাবনাটা ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। এমন এক সময় একটা ভ্রূণের মতো তৈরি হয় আমার হৃদয়ে, স্বপ্নে, করোটিতে– বাংলাদেশের উপন্যাস নিয়ে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করা যায় কি না! 

অতনু: অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম আমরা প্রশ্নের সুবাদে। ওয়েবসাইট তৈরি করার সাথে যে ব্যাপারটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হচ্ছে ডোমেইন ক্রয়। শুধু কেনাই না, এটাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারটাও রয়েছে। এসব কাজের ব্যাপারে আমাদের যদি অবহিত করতেন।

সুব্রত কুমার দাস:  দুই দশক আগের তখনকার সময়ের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে ডোমেইনের বিষয়গুলো বা ডিজাইন করা, আসলেই অনেক জটিল ছিল এবং এই ব্যাপারগুলো আসলে অনেকেই এখন বুঝতে পারবেন না। তুমি যে বুঝতে পেরেছো এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।  একটু আগেই আমি যে বিভিন্ন জায়গায় ইমেইল করার বিষয়টি  উল্লেখ করেছি তখন হঠাৎ করে একদিন, বোধ করি ২০০২ সালের শেষের  বা ২০০৩ এর শুরুর দিকেও হতে পারে একটা ইমেইল পেলাম। তাতে একজন আমাকে জানালেন, আমি তাঁকে লেখা প্রকাশের ব্যাপারে একসময় অনুরোধ করেছিলাম। তাঁরা ঢাকায় এসেছেন এবং বেইলি রোডের কাছে একটি অফিস নিয়েছেন। তাঁরা আমার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে চান এবং আমার ভাবনার কথা শুনতে চান। আমরা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজটা এগিয়ে নিতে পারি কি না সে বিষয়ে আলোচনা করতে চান। 

আমি গেলাম ওদের অফিসে। গিয়ে দেখলাম তাঁরা বাঙালি, পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মানুষ। তাঁদের কোম্পানি আমেরিকাভিত্তিক যেখানে ওরা কাজ করেন। আমি তো তখন এত কিছু বুঝি না। তাঁরা কিছু ব্যাপারে আমার সাহায্য চাইলেন। জানালেন তাঁরা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি, সাহিত্যিকদের সম্পর্কে জানতে এবং তাঁদের নিয়ে কাজ করতে চান। তাঁরা কতটা সফল হতে পেরেছিলেন সেই কাজে তা আমার মনে নেই। তবে আমার ধারণা যে তারা আসলে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের জন্যে ওয়েবসাইট নির্মাণ করতে– তাঁদের নিয়ে কাজ করায় উৎসাহী ছিলেন তাঁরা। 

আমি ওইসময় বাংলাদেশের মোটামুটি প্রথম সারির লেখকদের সাথে চলাফেরা করি। সবার সঙ্গেই সখ্য ছিল অনেক। ধরা যাক, মুহম্মদ নূরুল হুদা, ইমদাদুল হক মিলন, মইনুল আহসান সাবের, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ, আহমেদ ছফা, হুমায়ুন আজাদ– এদের অনেকের সাথেই নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ, যাওয়া আসা, খাওয়া দাওয়ার সম্পর্ক ছিল। এজন্য ওই কোম্পানির লোকেরা আমার কাছে সহযোগিতা চাইলেন। আমি যখন রাজি হলাম। তখন ওরা জানতে চাইলেন যে এর বিনিময়ে আমি কী চাই? আমি তখন একটিই জিনিসই তাদের কাছে আকাঙ্খা করেছিলাম। বলেছিলাম, ওয়েবসাইটে আমাদের সাহিত্যের তেমন কিছুই প্রায় নেই। আমি যদি কোনো কিছু লিখে সার্চ করি, কিছুই আসে না! এই ‘ডিডন্ট ম্যাচ’কে আমি ‘ম্যাচড দ্য ফলোয়িং’ করতে চাই।  

ততদিনে আরও একটি কাজ নিজে করে রেখেছিলাম সেটা হচ্ছে আমার ওয়েবসাইটের ম্যানুয়েল ডিজাইন– যা আমি নিজেই হাতে করেছিলাম। কয়টা মেইন লিঙ্ক থাকবে, সেই লিঙ্কের অধীনে কয়টি সাবলিঙ্ক থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার যতগুলো লেখা ইংরেজিতে আছে সে লেখাগুলোকে কীভাবে সাজিয়ে ওয়েবসাইটে উপস্থাপন করা যায় যায়, এসব বিষয়াবলি ওদেরকে জানালাম। মোট বত্রিশ জন লেখককে নিয়ে সমানসংখ্যক প্রবন্ধ তৈরি করে রেখেছিলাম। সবকিছু ঠিকঠাক করে ওদেরকে দিলাম। ইমেইলে দিয়েছিলাম না পেন ড্রাইভে বা কীভাবে দিয়েছিলাম সে স্মৃতিতে ধূসর জমেছে। চেয়েছিলাম ওয়েবসাইটের  নাম হোক ‘বাংলাদেশ নভেলস’। 

ওরা তখন একটি ডোমেইন কেনেন। ডোমেইন কেনার সময় বাংলাদেশের এক ভদ্রলোকের সাথে কীভাবে যেন আমার সংযোগ হয়ে গিয়েছিল। ওয়েবসাইটের উদ্বোধনের পর তাঁর সাথে দুয়েকবার দেখা সাক্ষাৎও হয়েছে। পরে অবশ্য ভুলে গেছি। ডোমেইন হোস্টিং কোম্পানির সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। মনে রাখতে হবে তখন আমাদের দেশের এসব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের একদম ঊষাকাল মাত্র। তখন ওরা ওয়েবসাইটকে ডিজাইন করে তৈরি করার কাজ শুরু করলেন। এভাবেই এক সময় আমার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন ওয়েবসাইটটি বাস্তবে রূপ নিল।

অতনু: বাহ! অসাধারণ সব গল্প। শুরুর দিকের। যখন কেউই এসব বিষয় তেমন একটা জানতেন না। এখন জানতে ইচ্ছে করছে পৃষ্ঠপোষকতায় যে কোম্পানি ছিল সেটার নাম কী ছিল? বা এর পরের ঘটনাক্রম কী ছিল? 

সুব্রত কুমার দাস:  খুব কঠিন হবে বলা। কারণ পরবর্তীকালে তো ওদের সাথে বিশেষ সংযোগ ছিল না। স্বাভাবিকভাবে ওরা ওয়েবসাইটটি করার পরে পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিল। এরপর আমাদের কাজ ছিল একে আপডেট করা, আরও গোছানো, ঠিকঠাক সন্নিবেশিত করা। এসব তো আমার পক্ষ থেকেই করতে হবে। পুরো কাজটিই তখন আমার জন্য অনেক চ্যালেন্জিং ছিল যেহেতু  আমি প্রযুক্তির মানুষ নই। সেসময় আরেকজন ছাত্র পাশে এসে দাঁড়ায়। ও কি করে ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত হয়েছিল সেটি আমার মনে নেই। ওরা হয়তো আমার উদ্যম দেখে আমার পাশে থাকতো অথবা বিভিন্ন কারণে পছন্দ করতো। এজন্যই হয়তো আমার কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগকে ওরা ওমন না ভেবে বড় কোনো সামাজিক বা সাহিত্যিক উদ্যোগ ভেবে এর সাথে থাকতো। 

উদাহরণস্বরূপ বলতে চাই, ওয়েবসাইটের উদ্বোধন হয়, ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসের দুই তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে। সে উদ্বোধনে প্রধান অতিথি ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি দেশবরেণ্য একজন বুদ্ধিজীবী। কিন্তু সেখানে থাকতে রাজি হয়েছিলেন। অনেক দামি কথা শুনিয়েছেন সেদিন সবাইকে। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটে ওয়েবসাইটের আইকনে ক্লিক করে এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করলেন তিনি। 

সভাপতিত্বে ছিলেন তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মনসুর মুসা। তাঁকে সভাপতি হিসেবে চিন্তার কারণ হলো– তিনি হলেন দেশের অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তাই তাঁকে রেখেছিলাম। বক্তৃতা প্রদানের জন্য আমরা তিনজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে রাখি - প্রফেসর ফখরুল আলম, তাঁকে রাখলাম কারণ তিনি ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক। আমি যে কাজটি করছিলাম পুরো কাজটি ইংরেজিতে ছিল। এরপর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে। আমাদের  কাজটি ইন্টারনেট সম্পর্কিত তাই। প্রযুক্তির একজন মানুষ, দেশবরেণ্য বিজ্ঞানী। এবং ড. মাসুদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। যেহেতু কাজটি বাংলা সাহিত্য নিয়ে, তাই তাঁকেও রেখেছিলাম।

এদের উপস্থিতির কারণে সেই অনুষ্ঠান আলাদা মর্যাদা লাভ করেছিল। আরও উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, যিনি বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক; আবুবকর সিদ্দিক, দেশের একজন অগ্রগণ্য ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। আরও ছিলেন রিজিয়া রহমান, রাবেয়া খাতুন, ইমদাদুল হক মিলন, নাসরীন জাহান প্রমুখ।

আমি মূল প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গেছি।  ওয়েবসাইটের ডিজাইনের ব্যাপারে যে প্রশ্নটি তুমি করেছিলে সে প্রসঙ্গে বলি, এতে আমার যে ছাত্র আমাকে সহযোগিতা করেছিল তার নাম ছিল শাহ মোস্তফা খালেদ। সে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করতো। কোন বিভাগে ছিল তা মনে নেই। খুব সম্ভবত প্রযুক্তির কোনো বিভাগে হবে। তবে আনন্দের বিষয় হচ্ছে খালেদ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়। বর্তমানে কানাডায় আছে, ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডি করছে। খালেদ ওই সময় আমার বাসায় আসতো আর ওয়েবসাইটের কাজে সাহায্য করতো। বিভিন্ন কোডিংয়ের মাধ্যমে যেভাবে তা করা প্রয়োজন সে করতো। সময়টা আমাদের ভীষণ রকমের উত্তেজনার ছিল। প্রায় এক-দুই বছর প্রতিদিন নতুন নতুন লেখা আপলোড করছি। তবে পরে সে পড়াশোনার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন আরেকজন ছাত্র সাহায্য করতে এগিয়ে এল। ওর নাম আল আমিন। ওকে আমি কাজের সাথে যুক্ত করলাম। ও আরও গুছিয়ে, ঠিকঠাক করে বাকি কাজগুলো করে দিত নিয়মিতভাবে। এভাবে ওয়েবসাইট সামাল দেওয়া হয়েছে। 

পরে আমি কানাডা চলে আসার পরে যা ঘটলো তা হলো– ওয়েবসাইটকে নিজের কাছে ভারী জিনিস মনে হচ্ছিল। কারণ এখানে নতুন দেশে এসে সবকিছুই নতুন করে শিখতে হচ্ছিল। মূলত নতুন দেশের জীবনের অনেক বাঁকে পড়ে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এর ফলে ওদিকে আর নজর দেওয়া সম্ভবপর ছিল না। ফলে এর ডোমেইনটি এক সময় হারিয়ে যায়, আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে আমরা নতুন করে আরেকটা ডোমেইন নিয়েছি। যার ইউআরএল bdnovels.org। আবার নতুন করে ওয়েবসাইটকে গোছাতে শুরু করি। 

এবারে যে সংযোজন ঘটলো তা হল ২০০৩ সালে তো ইংরেজি ভাষাতে করেছিলাম। ২০০৫ এর ফেব্রুয়ারিতে এসে আমরা ওয়েবসাইটকে দ্বিভাষী বানাই। বাংলা ভাষা সংযুক্ত করা হয়। তখনও ইউনিকোড আসেনি। চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে এই প্রথম আলোর মতো পত্রিকাও কিন্তু তখন অনলাইন ভার্সনে প্রকাশ হয়নি। অনলাইনের পত্রিকা ছিল দি ডেইলি স্টার এবং ইনডিপেনডেন্ট। তখন আমি একটা কাজ করি – আমার লেখা ঢাউস আকৃতির বাংলা প্রবন্ধগুলোকে পিডিএফ ফাইলে ওয়েবসাইটে তুলতে শুরু করি। লেখাগুলো ওভাবেই ২০১০ সাল অব্দি ছিল। পরে লেখাগুলোকে পিডিএফ  থেকে ইউনিকোডে রূপান্তরিত করা হয়।  

আজ দুই দশক পরে এসে আবার ইচ্ছে হয়েছে যে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এ স্বপ্ন যার সাথে দেশ, বাংলা ভাষা, সাহিত্য জড়িত, তাকে আরেকটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখি। সেই প্রত্যাশা থেকেই এ ওয়েবসাইটকে আবার একটু সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু করেছি।