স্মৃতিকথা–৮

অন্তর্ধান

এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক দু-দিন আগ থেকে দীপ্রকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

ঘটনাটি বেশ আকস্মিক এবং অভিনব। পরীক্ষার মাঝে আমাদের বাসায় ঘনঘন আসতে থাকেন গুরুত্বপূর্ণ  সব আত্মীয়স্বজন। বাসার সামনে প্রায়ই দেখা যায় ঢাউস সব গাড়ি। তাতে চড়েই আসতেন দীপ্রর নিকটজন। এসে আব্বা-আম্মার সাথে কথা বলতেন। পাশের ঘরে আমি পড়ার টেবিলে, কিন্তু উৎকর্ণ-পড়াতে মন নেই। বোঝার চেষ্টা করি কী কথা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে দরজা ঠেলে তাঁদেরই দুয়েকজন ঢুকে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন, তারপর চোখে অবিশ্বাসের আভা নিয়ে চলে যেতেন। এরপর থেকে পরীক্ষার বাকি ক’দিন যখনই দরজায় টোকা পড়ত, আমরা চমকে উঠতাম। এই বুঝি আবার এলেন ওঁরা।

দীপ্র ও আমি একই সালে এসএসসি পাস করি, যদিও দু’জনের  স্কুল আলাদা। সে আমার আত্মীয় হলেও, দূর-সম্পর্কে ভাগনে, খুব একটা বন্ধুত্ব ছিল না তখন। ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে ওর নানার বাসায় আমরা যেতাম। জবুথবু হয়ে বসার ঘরে বসে থাকতাম। কেমন যেন একটা আড়ষ্টতা কাজ করত সবসময়। এমন না যে কেউ আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে, তবুও। এ এক অনভিপ্রেত অন্তর্গত অনুশাসন। ঠিক স্বাভাবিক হতে পারতাম না। দীপ্রকে দেখতাম ছোটদের দলের মধ্যমণি, স্মার্ট ও ফিটফাট। চটাস চটাস কথা বলছে, আর সবাই হুল্লোড় করে হাসছে- এ দৃশ্য প্রায়ই দেখতাম। নিজেকে আমি কখনো সে দলে সম্পৃক্ত করতে পারতাম না। কোথায় যেন একটা বাধা।

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ওরই ভালো হবে, সেটাই স্বাভাবিক। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়ত। অনেক গৃহশিক্ষকের কাছে পড়েছে। বিদেশে উপার্জনশীল বাবার ছেলে, সামাজিক অবস্থান ও আর্থিক সঙ্গতির কারণে কখনও টানাপড়েন টের পায়নি। পড়াশোনা করার জন্য আলাদা ঘর, আধুনিক ডেস্ক, বুকশেলফ- সে তো ভালো রেজাল্ট করবেই। কিন্তু বাস্তবে ফলাফল হলো বেশ অন্যরকম। দেখা গেল সে আমার থেকে অনেক নম্বরে পিছিয়ে। নিজেকে শ্রেয়তর প্রমাণের শ্লাঘা বোধ থেকে এ কথা এখানে বলছি ঠিক তা নয়, বলছি ফলাফলের এই তুলনামূলক ব্যবধান আমাদের কিশোর মনে কিংবা পরিবারে কি রকম প্রভাব ফেলে – সে কথা ভেবে। সেটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একটু পরে বলছি সে কথা।

নটরডেমে কিছুদিন ক্লাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে যাই। ঢাকা কলেজে ভর্তির প্রথম দিন কি একটা গন্ডগোল হয়েছিল। যারা ঢাকা কলেজে সেসময় পড়েছে তারা জানে কি পদ্ধতিতে সব বন্ধুদের একই সেকশনে ঢোকা যায়। ভর্তির সময় দুজন পরপর লাইনে দাঁড়ালেই হয়। যেমন এক, সেকশন-এ; দুই, সেকশন-বি; তিন, সেকশন-সি; এই ভাবে। আমরা, স্কুলের বন্ধুরা, সেভাবেই একই সেকশনে ঢুকবো- এমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু গণ্ডগোলের কারণে সেদিন আর সেটা সম্ভব হয়নি। পরদিন আমি নটরডেমে গেলাম ক্লাস করতে। পরপর দু-দিন ক্লাস মিস দিতে চাইনি। আব্বা গেলেন আমার ভর্তির ফর্ম জমা দিতে। তাঁর কিছু বন্ধু তখন ঢাকা কলেজের শিক্ষক। তাঁরা তো আর আমাদের পদ্ধতি মেনে ফর্ম জমা দেবেন না। ফলে সব স্কুলের বন্ধুদের থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গেলাম সি-তে। 

কলেজ জীবন আমার কিছুটা বন্ধুহীনই কেটেছে। তবে সে বন্ধুহীনতা কিছুটা কমেছিল দীপ্রর কারণে। সেও ভর্তি হলো ঢাকা কলেজে, তবে আমার সেকশনে নয়। সেকশন-এ তে। দীপ্রর সাথে আনন্দময় সময় কেমন কেটেছে এর কিছু কথা অন্য একটা লেখায় লিখেছি। সে কথা এখানে আবার বললে তা হয়ত পুনরাবৃত্তিই হবে, তাই বাদ দিলাম। আজকের লেখার বিষয়বস্তুও তা নয়।

ফিরে আসি দীপ্রর অন্তর্ধানের রহস্যময় গল্পে। এইচএসসির ঠিক দু-দিন আগে কলেজ থেকে প্রবেশপত্র নেওয়ার কথা। দীপ্র সেদিন সকালে আমাদের বাসায় এল। ওকে বললাম, দুপুরের দিকে কলেজে যাব। সেখান থেকেই যাব দীপ্রর নানুর বাসায়, আজিমপুরে। তখন মুরুব্বীদের দোয়া নেওয়ার একটা চল ছিল। জানতে চাইলাম, সে যাবে কিনা আমার সাথে। সে বলেছিল, ‘নারে তুই যা। আমি পরে যাব।‘ বলে সে চলে গিয়েছিল। খুব সময়ের জন্য বসেওনি। এমনিতে বাসায় এলে সহজে যেতে চাইত না। কিন্তু সেদিন চট করে চলে গিয়েছিল। 

এর দু-দিন পর, মানে প্রথম পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় জানতে পারলাম ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী সর্বনাশ! অপহরণ নয় তো? আর তা সত্যি হলে থানা পুলিশ হবে। আমিই ছিলাম ওর একান্ত বান্ধব। পুলিশ এসে তো আমাকেই প্রথম ধরবে। এই চিন্তায় আমাদের বাসার সবাই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। কিন্তু দীপ্রর পরিবার প্রথমেই পুলিশে রিপোর্ট করেনি। কেন করেনি? আব্বা-আম্মা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতেন, আমার রেজাল্ট খারাপ হলে তা কেবল দীপ্রর আত্মীয়দের জেরার কারণেই হবে। পরীক্ষা চলাকালে এত ডিস্টার্ব হলে পড়বে কি করে? কিন্তু আমাদের সে ধারণাও ভুল বলে প্রমাণিত হল। জানা গেল কার্পেটের তলায় লুকানো ধূলিময় গল্প।

একদিন দুপুরে আম্মা গেলেন ওদের বাসায়। কিছুটা সমবেদনা থেকে, কিছুটা বিষাদ থেকে। দীপ্র ছিল আমাদের সবার অনেক কাছের আনন্দময় স্ফুরণবর্তিকা। ওর মায়ের ঘরে বসেছে সব আত্মীয়স্বজনের মেলা। কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ তসবি টিপছে, দীপ্রর মায়ের চোখ সজল। 

এক এক করে তাঁরা আম্মাকে শুরু করলেন প্রশ্ন। আমি কল্পনা করি, আমার নিরীহ মা জড়সড় হয়ে পাশে বসে রইলেন। যেন বা আমাদের পরিবারই দীপ্রর লা-পাত্তা হওয়ার পেছনের ক্রীড়নক। কিন্তু অলৌকিকভাবে আম্মা সেদিন সম্মান নিয়েই ফিরেছিলেন। ওখানে থাকতে থাকতেই দীপ্রর ছোট মামা আরও কয়েকজনকে নিয়ে হঠাৎ করে বাইরে থেকে এলেন। এসেই ভরা মজলিশে, হয়ত আম্মাকে খেয়াল না করেই বলে বসলেন, ‘বড় ফা, দীপ্র তো ঢাকা কলেজে ভর্তিই হয়নি। আমি সেখান থেকেই আসছি। ওখানে কোথায়ও ওর নাম নেই।‘

- কি বলিস! পয়লা ভর্তিটাই হয় নাই?
- নাহ, কেন, তুমি জান না?
- না, আমি জানব কি করে!

এখানে সম্ভবত তিনি মিথ্যে বলেছিলেন। এর কারণটা একটু ব্যাখ্যা করার দরকার। কলেজে পড়ার সময় আমি বেশ কিছু স্যারের কাছে পড়তাম, আর বাংলা পড়াতেন আমার বাবা। দীপ্রও সেসব স্যারের কাছে পড়ত, এমনকি আব্বার কাছে এসেও বাংলা পড়ত। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর, যেখানে আমার রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়েছিল, একদিন আম্মা দীপ্রর মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে বাংলায় কেমন করেছে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ভালোই করেছে। প্রায় ষাটের কাছাকাছি (আমরা সকলেই জানি বাংলায় সেসময় ঐ নম্বর পাওয়া বেশ কঠিন ছিল) পেয়েছে।‘ তিনি নিজে নাকি কলেজে গিয়ে সে ফলাফল নিয়ে এসেছেন। নিজেই যদি তিনি সেদিন কলেজে গিয়ে থাকবেন, তবে সেদিনই তো জানার কথা ছেলে কলেজের ছাত্র কিনা।

ঘরের মাঝে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। আম্মা একসময় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন সেই বাসা থেকে। ওদের ওখানে আমাদের বাসা থেকে কারও সেই শেষ যাওয়া। তারপরও পরীক্ষা চলাকালীন আমাদের বাসায় সেই তরুণ জেরাকারী দলের আনাগোনা থামেনি। এবার জিজ্ঞাসার রকম বদলেছে। প্রশ্নের হাইপোথিসিস ছিল এমন, আমি নিশ্চয়ই জানতাম দীপ্র ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়নি। আমিই সত্য গোপন করেছি। তাই যদি হয় তবে আমি কেন কাউকে জানাইনি, ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাই হোক, পরীক্ষা চলছে। পদার্থ বিজ্ঞানে সবসময় লেন্সের একটা অঙ্ক থাকতো। সায়েন্সের মোটামুটি পরিশ্রমী যে কোনো ছাত্রই অঙ্কটি শুদ্ধভাবে উত্তর দিতে পারতো, জটিল কিছু নয়। কিন্তু পরীক্ষার পর প্রশ্ন রিভিউ করার পর টের পেলাম, আমি সাত নম্বরের সে প্রশ্নটির উত্তর না দিয়েই চলে এসেছি। অথচ হাতে ঠিকই সময় ছিল। আব্বা-আম্মা শুনে আফসোস করে বলেছিলেন, দীপ্রর নিরুদ্ধেশোত্তর সান্ধ্যকালীন রোজ জেরার কারণেই ছেলেটার ভুল হয়েছে। আসলে তা না, আমার এমনই ভুলো মন। এরপরেও কত প্রশ্নের জানা উত্তর না দিয়ে চলে এসেছি!

পরীক্ষা শেষ হলো। দীপ্রর নিখোঁজ সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হলো, “ফিরে এসো, বাবা” এ জাতীয় কিছু একটা। সে সংবাদ কেটে আমি আমার ডায়রিতে সেঁটে দীর্ঘদিন রেখেছি। কিছুদিন পর সে ফিরে এলো। আমরা পরস্পর জানতে পারলাম ওকে নাকি অপহরণ করা হয়েছিল। ওর দুই হাতে শক্ত বাঁধনের দাগ তখনও স্পষ্ট।

পরীক্ষার পরবর্তী দু-তিন মাস কিছুটা অলস সময়। আমার সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ মন শুয়ে শুয়ে বিচ্ছিন্ন ডটগুলো জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সেটা কিছুটা এই রকম: দীপ্র বা ওর পরিবার ভাবতে পারিনি দীপ্রর এসএসসির ফলাফল আমার থেকে খারাপ হবে। এটা মেনেই নেয়নি তারা। সে যে আমার থেকে অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে, তাই প্রমাণ করতে আমি যে কলেজে পড়ব, ওকে নিদেন পক্ষে সে কলেজে কিংবা এরচেয়ে ভালো কলেজে পড়তে হবে এবং এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে এক হাত দেখিয়ে দেবে- হয়ত সেটা ওর পরিবারেরই সামন্ত চিন্তা, দীপ্রর নয়। আমি যখন ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম এবং সে সম্ভবত সুযোগ পায়নি, সে মিথ্যেমিথ্যি বলেছে যে সেও চান্স পেয়েছে। একই সেকশন হলে ধরা পড়ে যেতে পারে, সে কারণেই অন্য সেকশনে ভর্তি হওয়ার কথা বলেছে সে। আর এটা আমরা তো জানিই, ঢাকা কলেজ সে সময় ছিল একটা হাটের মতো, কে কার খবর রাখে! সে মিথ্যার ভীতে পড়তে থাকে একের পর ভ্রান্ত-প্রস্তর। প্রায় দুই বছর বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে গিয়ে পড়েছে, অন্তত পড়তে যাওয়ার কথা বলেছে। হয়ত কেউ ওকে আশ্বাস দিয়েছিল, কোনো এক সুযোগে কলেজে ঢুকিয়ে দিতে পারবে। কে জানে- কত কিছুই তো সম্ভব দেশে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। একেবারে শেষে এসে সে হয়ত দিশেহারা হয়ে যায়। তাই এই অপহরণের নাটক। আমার নিভৃত মনের একান্ত ধারণা, ওর মা-ই ওকে এই পথ বাতলে দিয়েছে। আর সে কারণেই প্রথমেই ওঁরা পুলিশে খবর দেয়নি। এবং ভাবেওনি দীপ্রর ছোট মামা হুট করে কলেজে গিয়ে অত খোঁজখবর করবেন। ওর বাবা তো তখন বিদেশে কর্মরত।

কিন্তু কেন এটা করবেন ওঁরা, কিংবা দীপ্রই বা কেন এমন ভয়ংকর আত্ম-বিলাপের পথ বেছে নিল? আমার মনে একটি উত্তরই বারবার ফিরে ফিরে আসে, তা হলো সামাজিক ভেদাভেদজনিত বৈষম্য। আর্থিক বা কৌলীন্যের বিচারে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষকে আমাদের সমাজ চিরকালই হেয় চোখে দেখে এসেছে। দীপ্রর পরিবারও এটাই ভেবে এসেছে। এর বলি দীপ্রর দুটি বছরের ক্ষতি। আসলে বিষয়টি আরও গভীরে প্রোথিত। আমি আজও, এই মধ্যবয়স পেরিয়েও, ভাবি, এই দুবছর প্রতিটা দিন সে কোন ধুম্র-কুয়াশা মাথায় নিয়ে বেরিয়েছে? কখনও কি নিজের মুখোমুখি সে হয়নি? এও তো এক ধরনের পলায়নই, তাই না। সে আসলে মানসিকভাবে আগেই পালিয়েছে। দৈহিক পলায়ন ঘটেছে দু’বছর পর।

আমাদের সময় স্টার নম্বর পাওয়া মানে বিশাল কিছু। পত্রিকায় প্রকাশিত রোল নম্বরের পাশে একটি ছোট্ট তারকা চিহ্ন দিয়ে তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেওয়া হতো।


আসাদুজ্জামান পাভেল: লেক্সিংটন, সাউথ ক্যারোলাইনা (আমেরিকা)