স্মৃতিকথা–৯

পরিজন

কোনো এক অতীত সন্ধ্যায় আমাদের বাসটি হঠাৎ থেমে যায়।

টাঙ্গাইলের কাছাকাছি কোনো একটা জায়গা। বিষয়টি বুঝতে বুঝতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। জানা গেল, কাছেই একটি ব্রিজ, তার উপর একটি তেলের গাড়ি বিগড়ে গেছে। নো নড়নচড়ন। ব্রিজ না বলে কালভার্ট বলাই ভালো। খুবই সরু। একটি গাড়িই কেবল যেতে বা আসতে পারে। ফলে রাস্তার দুই দিকেই গাড়ির লাইন বাড়তে থাকে। কখন তেলের গাড়িটি সচল হবে, কখন সে ব্রিজ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি ওপারে পৌঁছুবে এবং আমরা ঢাকার উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু করতে পারব- সে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই বাসে বসে অস্থির। আব্বা নেমে গেলেন পরিস্থিতি বোঝার জন্য।

সময়টা সম্ভবত ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের দিকে। আমরা সবাই, মানে আব্বা-আম্মা-ভাইবোন, ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় ফিরছি। ডিসেম্বরের শেষ দিক। তখনও ঢাকা-ময়মনসিংহের রাস্তা ত্রিশাল-ভালুকা দিয়ে চালু হয়নি। আমাদের আসতে হতো টাঙ্গাইল দিয়ে। সেসময় প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লেগে যেত। প্রতিবারই দেখতাম, ঢাকায় পৌঁছুতে পৌঁছুতে আমাদের কেবলই অনেক রাত হয়ে যেত। বাসায় ফিরে ক্লান্তিতে লম্বা হয়ে যেতাম। আম্মা বাসায় ফিরেই ভাত চড়াতেন। সাথে থাকত গ্রাম থেকে আনা সরিষার তেল মাখানো আলু ভর্তা, ডিম ভাজা বা ভর্তা। মাঝেমধ্যে সাথে থাকত ডাল। সে রন্ধন প্রক্রিয়া আমাদের দেখা হতো না কখনোই। ঘুমিয়ে যেতাম। যখন আমাদের ডেকে ওঠাতেন বাইরে তখন অনেক রাত। ঘুম ঘুম চোখে সে শর্করাধিক্য খাবার অমৃতের মতো লাগত। সারাদিনের কষ্ট ভুলে যেতাম।

কিন্তু সেদিন রাতে আমাদের জন্য অন্য অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল। আব্বা ফিরে এসে বললেন, তেলের ট্রাকটি সরাতে হবে। ক্রেন ডাকা হয়েছে। সেটি আসবে ঢাকা থেকে। আর তা ঘটতে ঘটতে মধ্যরাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যেতে পারে। অচেনা এই জায়গায় কোথায় যাই। রাতটা এখানেই কাটাতে হয় কিনা, কে জানে।
আব্বার কপালে চিন্তার রেখা দেখা দেয়। শীতের রাত দীর্ঘ, ঠান্ডা ও নিঃসহায় হয়।

সেসময়ে বাসগুলোয় তিন-দুই এই নিয়মে আসনের সারি বসানো হতো। এক পাশে দু’জন, অপর পাশে তিনজন। আমরা তিন সিটের আসন নিয়েছি। আব্বা আম্মা দুজনের মাঝের সিটে কখনো আমি, কখনো বা ছোট বোনটি-আবার মাঝেমধ্যে দুজনেই ভাগাভাগি করে বসেছি। ছোট ভাইটি আম্মার কোলে। সে বেশ ছোট। মাঝেমধ্যেই কান্না করছে।

আব্বা-আম্মার কথোপকথনে একটা অস্থিরতা টের পাই। অফিসের কোনো কলিগ কিংবা কোনো বন্ধু, আত্মীয়-পরিজনের বাসা কাছাকাছি আছে কিনা তাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন। কিন্তু কোনো কূলকিনারাই পেলেন না। বয়সে তখনো তাঁরা তরুণ। আব্বা আবার বাস থেকে নেমে গেলেন। বাইরে রাত বাড়ছে।
 
বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে সিটে বসে বললেন, ‘একটা দুঃসংবাদ আছে। বাসটি আজ রাতে আর ঢাকার দিকে যাচ্ছে না। ময়মনসিংহ ফিরে যাবে। আমাদেরকে নেমে যেতে হবে। এখন এই মাঝ রাতে অচেনা জায়গায় কোথায় যাই, কি করি? সাথে জিনিসপত্রও তো মেলা! গ্রামের বাড়ি থেকে বয়ে এনেছি খেতের আলু, সুগন্ধি কালিজিরা চাল, শিমুল তুলায় বানানো লালসালু মোড়ানো নরম লেপ!  এসব নিয়ে বাচ্চাকাচ্চা সহ কী একটা বিপদেই না পড়লাম।’

তিনি আবার নেমে গেলেন বাস থেকে। তাঁর তখন ঘনঘন সিগারেট টানার বাতিক, বিশেষ করে টেনশনের মুহূর্তগুলোতে। কিছু পরেই ফিরে এসে অদ্ভুত একটা কথা শোনালেন, কাছেই একটা রেশন-শপ (তখন জায়গায় জায়গায় রেশন-শপ থাকতো)। সেটি ততক্ষণে দিনের কাজ শেষে বন্ধ। সামনে কিছু স্থানীয় ছেলে-ছোকড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। আর আড়চোখে যাত্রীদের দেখছে। তাদের মধ্যে একজন বেশ কিছুক্ষণ ধরে আব্বাকে লক্ষ্য করছিল। মাঝেমধ্যে আব্বা যে বাসের ভেতর যাচ্ছেন এবং আবার বেরিয়ে আসছেন- বুঝতে অসুবিধা হয়নি বাসের ভেতরে তাঁর পরিবার-পরিজন। একদম অচেনা মানুষটি এগিয়ে এসে আব্বাকে বলল, ‘যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলতে পারি?’

‘জি, বলেন।'

‘বুঝতে পারছি পরিবারের সবাইকে নিয়ে বেশ ঝামেলায়ই পড়েছেন। এখন কোথায় যাবেন? কি করবেন, ঠিক করেছেন? বাস তো আর ঢাকায় যাচ্ছে না শুনেছি।’

‘বুঝতে পারছি না। কাছে ধারে ভালো কোনো হোটেলও তো দেখছি না!’

‘নাহ, এখানে কোনো হোটেল নেই। আমি একটা প্রস্তাব দেই। দেখেন পছন্দ হয় কিনা।‘

‘কি প্রস্তাব?’

আব্বা সাবধান হয়ে যান। কারণ, সময়টা তখন বড়ই গোলমেলে। কাউকে বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতি তখন দেশের ছিল না। বিশেষ করে যুবকশ্রেণির কাউকে তো নয়ই। কয়েক বছর আগে শেখ সাহেব সপরিবারে নিহত হয়েছেন। জিয়াউর রহমান সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। চারদিকে গা ছমছমে অবস্থা। যুবক ছেলেরা উদ্ভ্রান্তের মতো। কখন কি করে বসে ঠিক ঠাওর করা যায় না। তাদের ধরে ধরে জেলে পুরা হচ্ছে।

তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস না করেই শুনলেন ছেলেটি বলছে, ‘আমার বাড়ি এখান থেকে মাইল খানেক দূরে। আমাকে যদি বিশ্বাস করেন তবে চলেন আমার সাথে। রাতটা ওখানে কাটিয়ে সকালের বাসে ঢাকায় চলে যাবেন। ততক্ষণে নিশ্চয়ই তেলের গাড়িটি সরে যাবে। রাস্তাঘাট ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আমি নিজে এসে আপনাদেরকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে যাব।’

আব্বা অবাকই হলেন। মনে মনে ভাবছেন, একে কেন বিশ্বাস করব? শেষে পথের মাঝখানে গিয়ে সবকিছু নিয়ে নিলে? কিংবা খুন-টুনও তো করে বসতে পারে।  

যুবকটি হয়ত বুঝল আব্বার মনের কথা। তাই আবার বলল, ‘বুঝতে পারছি অচেনা অজানা জায়গায় আচমকা অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস কেন করবেন। করা কঠিন। আমি বলি কি, ভেবে দেখেন এবং আপনার স্ত্রীর সাথে কথা বলুন। দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে জানান। আমি এখানেই আছি।‘
আব্বার কথা শুনে আম্মা বললেন, ‘তাহলে যাই চলো উনার সাথে।’

‘কি বলছো? চিনি না, জানি না এমন কারো সাথে কি হুট করে যাওয়া যায়? সে কি আর আমাদের পরিজন?’

‘আল্লাহ ভরসা। চল যাই। বাচ্চাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।’

আব্বা ভাবেননি আম্মা রাজি হয়ে যাবেন এবং ওখানে যাওয়ার জন্য তাগাদা দেবেন।

কিছুক্ষণ পরের দৃশ্য।

যুবক লোকটি (যার নাম এখন আর মনে নেই) চলছে আমাদের সামনে সামনে। তাঁর সাইকেলে বসিয়েছে ছোট ভাইটিকে। আমরা তাঁর পেছন পেছন, কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার শীতের রাত। আসার আগে রেশন দোকানটির দরজা আবার খোলা হলো। আমাদের সব মালপত্র সেখানে রাখা হয়েছে। শুধু শুধু সেসব বয়ে নিয়ে যাবার তো দরকার নেই। কাল সকালে এখান থেকে বাসে উঠিয়ে দিলেই হবে। তাই এই ব্যবস্থা।

হাঁটতে হাঁটতে আব্বা কথা বলেন তাঁর সাথে। যুবকটি জানায়, সে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঢাকায় হলে থেকে লেখাপড়া করে। এখন ছুটিতে বাড়ি এসেছে। রেশন দোকানটির মালিক তাঁর বাবা। বাড়িতে এলে মাঝেমধ্যে তাঁদের এই রেশন দোকানটিতে এসে সে বসে। তাতে তাঁর বাবার কিছুটা আরাম হয়। 

আব্বা যেন কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করলেন। জানালেন, তিনি বাংলা একাডেমিতে কাজ করেন।

যে বাড়িটির সামনে আমাদের আনা হলো, আজও আবছা আবছা মনে আছে আমার, সেটি এক অর্থে প্রকাণ্ড। পরিষ্কার প্রকাণ্ড উঠোন। চারপাশে অনেকগুলো প্রকাণ্ড ঘর। খুব সহজেই বোঝা যায়, এরা বেশ অবস্থাসম্পন্ন। রাত বেশ গভীর হয়ে গিয়েছিল বলে খুব বেশি আওয়াজ করেনি লোকটি। একটি ঘর খোলার ব্যবস্থা করে আমাদের সে ঘরে নেওয়া হলো। সেখানে একটি পরিপাটি বিছানা। পায়ের দিকে সাদা ওয়ারের নরম একটি লেপ। কিছু শুকনো খাবার, সম্ভবত গুঁড়-মুড়ি হবে, এনে আমাদের দিল এবং বললো, ’দুঃখিত, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্য কোনো খাবারের ব্যবস্থা করা গেল না। এগুলো খেয়ে আজ রাতটা পার করে দিন, প্লিজ।’

সে খাওয়া পলান্নের মতোই লেগেছিল সে রাতে। কখন যে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছি, জানি না। ঘুম ভাঙে বাড়ির লোকজনের চলাচল এবং কথাবার্তায়। খুব সকালে বাড়ির মেয়েরা এসে আম্মার সাথে দেখা করে। কিছু কথাবার্তাতেই বেশ ভাব হয়ে যায় তাদের। আম্মাকে আমি ওদের সাথে রান্নাঘরে আলাপরত অবস্থায় পাই। দূরে পুকুর পারে দেখি আব্বা একজন বয়স্ক লোকের সাথে শিথিল ভঙ্গিতে কথা বলছেন। পাশে এক যুবক দাঁড়িয়ে। সম্ভবত ইনিই আমাদের কাল এখানে নিয়ে এসেছেন এবং বয়স্ক লোকটি হয়ত তার বাবা। সর্বত্রই একটা মার্জিত অভিরুচির পরিবেশ।

আমি সেই উপকারী যুবকটির দিকে তাকাই। সে চেহারা আমার আজও মনে আছে। মাঝারি উচ্চতার, সুঠামদেহী। আমার কল্পনাশ্রয়ী মন তাঁর চেহারার সাথে পরবর্তীতে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের চেহারার মিল খুঁজে পেত। কিংবা সেটা একান্তই আমার মনের কল্পনা। 

সকালের নাস্তার পর, ওদের পরিবারের প্রায় সবাই আমাদের সাথে বেরিয়ে পড়ে। বিশাল বহর দেখে আমরা একটু অবাক হই। তাই দেখে আমাদের জানানো হয়, এদের সবাই আসলে এখানকার বিভিন্ন স্কুল কলেজে পড়ছে, কিংবা অফিসে কাজ করছে। তাই সবাই একসাথে বেরিয়েছে। আমরা এগিয়ে চলি। পেছনে লম্বা লাইন। ছোট ভাইটি যথারীতি সাইকেলে বসেছে। এমন অভিনব অভিজ্ঞতায় সে খুবই আনন্দিত। মাঝেমধ্যে ক্রিং ক্রিং করে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে।


 রাস্তা ক্লিয়ার হয়ে গেছে।

সেই তেলবাহী বিকল গাড়িটি আর নেই। একটি বাস ঢাকা যাবার জন্য দাঁড়িয়ে। খানিক পরপর হর্ন দিচ্ছে। চারদিকে একটা চঞ্চলতা। আমাদের সেখানে উঠিয়ে, মালপত্র গুছিয়ে দিয়েছে যুবকটি। বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আব্বার সাথে কথা বলছে।

সে রাতের কথা মনে করে, আজ এত বছর পরেও, আমি বিস্মিত হই। অবাক হই এই ভেবে যে, কি করে আমার পিতা-মাতা একদম কিছু না জেনে, কাউকে না চিনে, এমন একজনের কথায় বিশ্বাস করেছিলেন। ঠিক অপরদিকে, একটি পরিবারের আকস্মিক বিপদ দেখে  কি করে একজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল? আজ, এই সময়ে এসে আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, আমি কি করতাম?  কেউ আমাকে সত্যি সত্যিই এমন বিপদে সাহায্য করলে আমি কি বিশ্বাস করতাম। নাকি নিজে এগিয়ে কাউকে এমন বিপদে সাহায্য করতাম। আমাদের সময়টাই কেমন যেন বদলে গেছে। আত্মকেন্দ্রিকতায় নিমজ্জিত অবিশ্বাসী এক প্রজন্মের সাক্ষী আমরা। আশেপাশের কাউকেই আর নিকট পরিজন বলে মনে হয় না। সবখানেই কেমন অবিশ্বাসের প্রচ্ছায়া।

 

বাস ছেড়ে দেবে।

বাসে ওঠার আগে আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আমরা যদি আপনার সাথে যেতে রাজি না হতাম তাহলে কি করতেন?’

তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সেটাও আমি ভেবে রেখেছিলাম। কারণ অচেনা কারো সাথে যাওয়াটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। সাহস লাগে। আমি তাহলে আর কালরাতে বাড়িই ফিরতাম না। এখানেই রেশন শপে থেকে যেতাম। আপনারা রাজি হলে আপনাদের জিনিসপত্র এখানে তুলতাম। আপনাদেরকেও এখানে থাকতে বলতাম। যদিও ঘুমটা আপনাদের হতো না হয়ত। এখানে তো সে ব্যবস্থা নেই। আপনাদের ধন্যবাদ আমাকে বিশ্বাস করার জন্য।’
 
আমাদের বাস চলতে শুরু করে। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের অপস্রিয়মাণ চেহারাটা দেখি। মনের জমিনে ধরে রাখা চেষ্টা করি। সে কাজ বড় কঠিন, ঠিক মনে করতে পারি না। মনের অতলে হারিয়ে যায় সে মানুষের চেহারা, আমাদের পরিজন। 

আসাদুজ্জামান পাভেল: সাউথ ক্যারোলাইনা (আমেরিকা) প্রবাসী