স্মৃতিকথা–১০

“মন কি যে চায় বলো”

নব্বই দশকের সময়টাই অন্যরকম ছিল।

সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি। শুরু হয়ে গেল আন্দোলনের ডামাডোল। এরশাদ হঠাও আন্দোলন। আসলে এই তোলপাড় অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। জমাট বেঁধেছিল নব্বই-এ। আমি বা আমার কাছের বন্ধুরা কেউই অবশ্য সেই মিছিলে শামিল ছিলাম না। কিন্তু এর ফায়দা ঠিকই লুটতাম। আজ হয়তো ছাত্র ধর্মঘট, ক্লাস বন্ধ; তো পরদিন, কথা নেই বার্তা নেই পরীক্ষা হলে গিয়ে দেখি তালাবন্ধ। পরীক্ষা হবে না। কবে হবে- জানা নেই। আমাদের হতো বেশুমার মজা। টিএসসি যেন বাড়িঘর হয়ে গেল। দুপুরের খাবার “নিরব” (বানানটা এভাবেই লেখা হতো) হোটেল কিম্বা সুইসে। যখন যা কপালে জোটে খেয়ে নিয়ে আবার টিএসসিতে। রাজু মরে গেল, আমাদের খবর নেই। ডাক্তার মিলন মারা গেলেন আমাদের হুশ নেই। চোখের সামনে গালিব গুলি খেয়ে গোঙাতে থাকে, আমরা টিএসসির ভেতর চা-সিঙ্গারা খাই আর তুমুল গুলির শব্দ শুনি।

এরশাদ সাহেবের পতনের পর আবার ঠিকই দল বেঁধে গেলাম প্রেস ক্লাব-পল্টনের সামনে, মজা হবে যে! মঞ্চে দাঁড়িয়ে সবাই গলা ফাটাচ্ছে। আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঙার মুড়ি-চানাচুর খাই। চানাচুর ওয়ালার সাথে বচসা করি, ‘ওই মিয়া ঝাল কম দিসো ক্যান। দাম কম পাইবা। আরেক ঠোঙা বানাও। খায়া দেখি।’

এরশাদ সাহেবের পতনের পর লাইফটা একদম বোরিং হয়ে গেল (অনেকটা ট্রাম্প সাহেবের বিদায়ের পরবর্তী অবস্থার মতো)। কোনো মজা নেই। নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়ে গেল। পরীক্ষার তারিখ পড়ে গেল। কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই। বোমা ফুটছে না, গুলি হচ্ছে না। হরতাল নেই। উত্তেজনায় ভাটা। জীবনটাকে পানশে মনে হতে থাকে। মজার কিছু ঘটছে না। আনন্দের কিছু নেই- কি করি! ঠিক এমন সময়ই একটা ঘটনা ঘটে যায়, যা আমাদের জীবনে এখনো স্মরণীয়।

সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চলছে। জানুয়ারি মাসের শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির শুরু। একটু শীত শীত ছিল সেদিনটিতে। রেজিস্ট্রার অফিস আর কলা ভবনের মাঝের খোলা জায়গাটিতে (ওটার নাম কি মল-চত্বর ছিল?) বিশাল ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রকাণ্ড স্টেজ। তারই দুই দিকে দৈত্যের মতো ঢাউস স্পিকার। প্রথমবারের মতো বাম্বা কনসার্ট করবে। প্রায় বিশটির মতো ব্যান্ড পরিবেশন করবে তাঁদের সৃষ্ট গান, কথা এবং সুর। সত্যিকারের “ওপেন এয়ার কনসার্ট”- মোটেই আবদ্ধ নয়।

মাঠভর্তি ছাত্রছাত্রী। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অহেতুক উপস্থিতি নেই। বসন্তের প্রারম্ভ কিংবা শীত শেষের একটা হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। সবখানেই একটা আরামের, শান্তির হাওয়া। এত্ত বড় একটা আয়োজন, অথচ কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, ভয়ার্ত চিৎকার নেই। ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে একসাথে দেখা সেই অনুষ্ঠান- একটিও অঘটন ঘটল না। আমাদের দেখা সেই অনুষ্ঠানে ছিল সেসময়ের সবগুলো দল। সোলস, ফিলিংস (তখনো জেমস সোলো কিম্বা নগর বাউল হয়ে ওঠেননি), ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, উইনিংস, ডিফারেন্ট টাচ, নোভা- কোনো দল বাদ নেই। এলআরবির তখনও সৃষ্টি হয়নি। মাইলস গেয়েছিল কিনা আজ আর মনে নেই। এখানে অনেক পাঠক বন্ধুরা হয়ত আছেন যারা কিনা সেদিন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা হয়তো শুধরে দিতে পারবেন।

তো সেদিন, অন্য দলের সাথে ডিফারেন্ট টাচ নামে যে ব্যান্ডটি পারফর্ম করেছিল, তারা একেবারেই নতুন ছিল আমাদের কাছে। আগে এদের নাম শুনিনি। একেবারে নতুন ব্যান্ড হওয়া সত্ত্বেও ওরা আমাদের মন জয় করে নিয়েছিল। স্লট বরাদ্ধ ছিল বলে প্রত্যেকটি দল ৩-৪ টির বেশি গান পরিবেশন করতে পারেনি। তাদেরই একটি গান মনের মাঝে চিরদিনের জন্য গেঁথে যায়। ‘‘মন কি যে চায় বলো’’। ওরা গানটি শুরু করেছিল “এ মন কেন যে বাঁধা পড়ে না, কি জানি কেন জানি না”-দিয়ে। সম্ভবত মঞ্চে ওরাই প্রথম যারা কিনা এই গানটি পরিবেশন করে। পরে উইনিং-এর ক্যাসেটে (অ্যালবাম) পেয়েছি গানটি। বহু অনুষ্ঠানে গেয়েছে তারা। উইনিং ছিল আমাদের ইউনিভার্সিটির নির্ধারিত গানের দল। আর চন্দন ভাই ছিলেন আমাদের অ্যানেক্স ভবনের জামাই। যদিও উইনিং-এর অ্যালবামে রঞ্জন গেয়েছিলেন গানটি। তবুও সব কিছু ছাপিয়ে আজও ডিফারেন্ট টাচের ভার্শনটাই মনে গেঁথে গেছে। সেটি কেন? সেটা কি অদ্ভুত সেই সময়ের জন্য? নাকি তারুণ্যের দোলাচলের, ভীরুতার জন্য? অথবা এক নৈর্ব্যক্তিক সংশয়ের জন্য? কে জানে, অত নিবিড়ভাবে ভেবে দেখা হয়নি। তবে এটা সত্য, একেকটি গান চিরদিনের হয়ে যায় তার কথা, সুর এবং সময়ের বোধটিকে সঠিকভাবে ধরতে পারার জন্য।

পরে জেনেছি, এই অসাধারণ গানটির স্রষ্টা হায়দার হোসেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যান্ড কিংবা ব্যক্তি গানটি পরিবেশন করেছেন। আজ ডিফারেন্ট টাচ, উইনিং এবং হায়দার হোসেন- তিনটি সংস্করণই শুনব। আগ্রহীরা চাইলে ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন।


“কি করে যায় সে বলা, আমি আজও শিখিনি”।

সবাইকে অভিনব নব্বই-এ আমন্ত্রণ।


আসাদুজ্জামান পাভেল: আমেরিকা প্রবাসী লেখক