কোথাও বেড়াতে যেতে আমার ভীষণ পছন্দ। নতুন জায়গা হলে তো কথাই নেই। শোনামাত্রই দিন গুনতে থাকা। আমাদের লম্বা ভ্রমণ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। সেবার আমাদের নিউ ইয়র্ক সিটি, বাফেলো, মেইন, ভোরমন্ট, কানাডা, আটলান্টা– একবারে ১৭ দিনের ট্যুর ছিল। তারপর থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আর দূরে কোথাও যাব না। তাও গত বছর সমুদ্র দেখতে বেশ দূরে; নর্থ ক্যারোলাইনা যেতে হয়েছিল।
কোথাও কোথাও আমাদের দুই–তিনবারও যাওয়া হয়, যদি সে জায়গা ভালো লাগার মধ্যে পড়ে যায় এবং কাছাকাছি হয়। প্রায় সময়ই যেখানে যেতে ভালো লাগে, সেটা হলো ওহাইও আমিষ টাউন।
আমিষদের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখতে ভালো লাগে। ওরা ১৭২০ সালে প্রথম আসে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া শহরে। ওদের শেকড় সুইজারল্যান্ডে, কিছু আছে জার্মানির। এই একবিংশ শতাব্দীতেও আমিষদের ধর্মীয় রীতিনীতি সংস্কৃতির এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। যেমন আমিষদের পোশাক–পরিচ্ছদ খুব শালীন; লম্বা ফ্রক পা পর্যন্ত, থ্রি কোয়ার্টার হাতা মাথায়। মেয়েদের অন্য রকম একটা আবরণের মতো থাকে, আর ছেলেদের মাথায় কাউবয় হ্যাট। তাঁদের যানবাহন বাইসাইকেল ও ঘোড়ার গাড়ি।
যেখানে পশ্চিমারা ওয়াশিং মেশিন ছাড়া চিন্তাই করতে পারে না, সেই একই দেশে থেকেও আমিষরা কাপড় হাতে ধুয়ে রোদে শুকোয় । ভাবতে কেমন লাগে না!
আমিষ টাউনের কারও হাতে আমি কোনো স্মার্ট ফোন দেখিনি। তাঁদের আচার–ব্যবহার খুবই নম্র । তবে তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলে সেটা মানবে না। যাহোক আমার কেন জানি বার বার ওখানেই যেতে ভালো লাগে।
আর এতো বিলাসবহুল রিসোর্টগুলো। আমার কথা হলো বেড়াতে গেলে থাকার জায়গাটা অবশ্যই খুব ভালো হতে হবে। খাবার ব্যবস্থা যেমন হোক, সে নিয়ে আমার খুব একটা মাথাব্যথা থাকে না।
রাতের ৮টা–৯টায় একদম সুনসান নীরবতা। ঘোড়ার পায়ের লোহার জুতা পিচঢালা পথে খুব সুন্দর ছন্দ তুলে। রাতের নীরবতা ভেদ করে আসে সেই কাব্যিক ছন্দ, যা হয়ত যেকোনো পর্যটককেই মুগ্ধ করে।
যা হোক আমাদের এবারের ভ্রমণ ছিল নর্থ ক্যারোলাইনার সেটোলা রিসোর্ট।
নর্থ ক্যারোলাইনা খুব বড় নয়, ছিমছাম ছোট শহর।
সাড়ে চার ঘণ্টার ড্রাইভ। এ দেশে নিয়ম মেনে ড্রাইভ করলেও দুর্ঘটনা যে একদমই হয় না, তা নয়। তাই যখনই যেখানে যাই ড্রাইভ আমার স্বামী করলেও আমি একটু তটস্থই থাকি; বিশেষ করে যখন বড় বড় ট্রাকগুলো ওভারটেক করতে হয়।
আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। জিপিএস ধরে যেখানেই যাই রিসোর্টে ঢোকার রাস্তা বন্ধ। রাস্তায় কাজ হচ্ছে– এ কী বিপর্যয়! আমার মুখে কথা সরছে না। তারপর আমরা ওখানকার এক প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করে জানি যে, একটু অপেক্ষা করলেই দেখব রিসোর্টের অতিথিদের জন্য গেইট খোলা আছে।
একরাশ ক্লান্তি নিয়ে আমরা রিসোর্ট প্রবেশ করি। লেকভিউ ডিলাক্স রুম দেখে আমার সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।
সেদিন আর আমরা কোথাও বের হইনি। তাছাড়া ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে।
লেকের চারপাশ মরিচ বাতি দিয়ে খুব সুন্দর সাজানো আর পানিতে সেই আলো সে এক মনোরম দৃশ্য।
রাতে জোসেফ পিৎজা অর্ডার করল। আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। পেটে ততক্ষণে ইঁদুরের ডিগবাজি শুরু! খিদে পেটে এতো মজার খেয়েছি সেই পিৎজা, তা আর কী বলব।
দ্বিতীয় দিন জানতে পারলাম ব্রেকফাস্ট ফ্রি নয়। রিসোর্টের রেঁস্তোরায় ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার– সব কিনে খেতে হয়।
আমরা আকাশচুম্বী দাম দিয়ে সকালের নাস্তা খেলাম।
তারপর দেখতে গেলাম সেখান থেকে ব্লোয়িং রক (Blowing Rock) নামের একটা জায়গা। অবশ্য আমাদের টিকিট কিনতে হয়েছে। তবে সেখানটা ছিল সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর। আমার নীচের দিকে তাকিয়ে মোট কথা, গা শিউরে উঠছিল । আমাদের মেয়ে জেনিফার খুব একটা উপভোগ করল না দেখে আমরা খুব বেশি সময় সেখানে অপচয় করিনি।
তারপর জানতে পারলাম সেখান থেকে বেশ কিছু দূরেই একটা ঝর্ণা আছে। আমরা ঝর্ণার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম।
মাই গুডনেস! এমনি আঁকা বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা! দেখি জোসেফই সিরিয়াস মুডে ড্রাইভ করছে। আমার মাথা ঘুরছিল, কিন্তু সে কথা তো ওকে বলা যায় না। বেচারা এত কষ্ট করে উৎসাহ ভরে নিয়ে যাচ্ছে। পাছে কষ্ট পায়, সেই ভেবে চুপচাপ দেখছিলাম, রাস্তা কতটা আঁকা বাঁকা হতে পারে। আর ভাবছিলাম সেখানকার মানুষের জীবন শৈলী।
অবশেষ আমরা খুঁজে পেলাম সেই ঝর্ণা। জেনিফার খুব পছন্দ করেছে ঝর্ণা। তাই আমাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে বলব।
আসার সময় ঘুরে দেখলাম ওয়াইন ফ্যাক্টরি। খুব ভালো ওয়াইন পেলে জোসেফ ট্রাই করতে পছন্দ করে। তবে আমি মুসলিম বলে ও কখনো আমাকে অ্যালকোহল অফার করে না। এটা তার সবচেয়ে ভালো গুণ।
দুপুরে একটা রেঁস্তোরায় খেয়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে আবার প্রায় সন্ধ্যা তারপরও চমৎকার একটি দিন কেটেছে।
তৃতীয় দিনে কী করা যায় ভাবছি। জোসেফ সন্ধান পেল বেশ পুরোনো সুন্দর একটি বাড়ির। আমাকে জিজ্ঞেস করতেই আমি সানন্দে জবাব দিলাম অবশ্যই যাব।
পরে আমরা সেখানে গেলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সে বাড়ি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হবে এপ্রিল মাসে। শত বছরের পুরোনো সেই বাড়ি কিন্তু অপূর্ব সুন্দর। যেহেতু খুলবেই না কি আর করা অগত্যা বাড়ির আশপাশে ঘুরে ছবি তুলে ফিরে এলাম । তবে সেদিনও বেশ ভালোই কেটেছে।
পরের দিন সকালে বাড়ির উদ্দেশে আবার রওয়ানা হলাম।
মৌসুমী পুলেন: আমেরিকা প্রবাসী কবি