কুয়েতের সব ধরনের ভিসা এক প্রকার ফ্রি, মাত্র ৩০ কুয়েতি দিনার ফি। সেটা হোক শ্রমিক কিংবা অন্য ক্ষেত্রে। তবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠাতে আদায় করা হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ এই ভিসার প্রকৃত সরকারি খরচ টিকিটসহ দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি জানলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে লাভবান হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র।
ভুক্তভোগী শ্রমিকরা নিঃস্ব, আর জাতি হারাচ্ছে সম্ভাবনাময় রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের। ভিসা ফ্রি, অথচ লাখ টাকার লেনদেন! ‘তিন দিনারের ভিসা’ নামে পরিচিত কুয়েতের এসব কর্মসংস্থান ভিসা বাস্তবে সম্পূর্ণ ফ্রি বা নামমাত্র খরচে হবার কথা। তবে বাংলাদেশে এই সুযোগকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে অনৈতিক লোভের বাজার।
ভিসা পেতে খরচ ধরা হচ্ছে ৮-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত, যা কোনো রসিদ ছাড়াই নেওয়া হচ্ছে, নেই কোনো আইনি ভিত্তি। সত্য প্রকাশ করলেন প্রবাসী সাংবাদিক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন বিষয়টি প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু বাণিজ্য নয়, এটা এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন।’
মঈন উদ্দিন সরকার সুমন আরও বলেন, ‘বিদেশগামী শ্রমিক যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন, তখন বিষয়টি শুধুমাত্র আর্থিক লেনদেন নয়; এটি মানবিক অধিকার ও রাষ্ট্রের মর্যাদার বিষয়ও বটে।’
মঈন সুমন অভিযোগ করেন, ‘‘কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সরকার? বাংলাদেশ সরকারের উদাসীনতা ও কূটনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দালালচক্র শ্রমিকদের ‘পণ্যে’ পরিণত করছে। একদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নানা আশ্বাস, অন্যদিকে মাঠে বাস্তবতা হচ্ছে প্রতারণা ও শোষণের চিত্র।’
এই অর্থ লেনদেনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষরা। অনেকে জমি বিক্রি, উচ্চ সুদে ঋণ অথবা সম্পদ বন্ধক রেখে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু ভিসা পাওয়ার পরেও অনেকেই কাজ পান না, কাজ পেলেও চাকরি থাকে অস্থায়ী। ফলে কয়েক মাস না যেতেই অনেকে রেসিডেন্সিহীন, কর্মহীন কোনো সময় দেশে ফেরত আসতে হয়, তখন তারা হয় সর্বস্বান্ত, নয়ত নিঃস্ব।’
সাংবাদিক মঈন সুমন কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকারের প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন: চাকরির স্থায়িত্ব: ন্যূনতম তিন বছর মেয়াদি বাধ্যতামূলক চুক্তি, যেন কর্মীরা নিরাপদে ও স্থায়ীভাবে কাজ করতে পারেন। সুনির্দিষ্ট বেতন ও সুযোগ-সুবিধা: মাসিক বেতন, বাসস্থান, পরিবহনসহ সব সুযোগ-সুবিধার লিখিত ও আইনি নিশ্চয়তা। ক্ষতিপূরণ নীতিমালা: ভিসা পাওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে চাকরি হারালে, দেশে ফেরত আসলে কোম্পানি বা এজেন্সিকে বাধ্য করা হোক কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে।
মঈন সুমন বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রতি প্রবাসীদের আর্তি প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র নয়। তারা জাতীয় অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাদের সুরক্ষায় জরুরি হচ্ছে নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া তদারকি, দালাল ও প্রতারক এজেন্সিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দূতাবাসে তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের ব্যবস্থা, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে শ্রমিক-সুরক্ষা বিষয়ক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা।’
সাংবাদিক মঈন সুমন আরও বলেন, ‘কুয়েতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে যদি এই ধরনের কালোবাজারি ও শোষণ চলতে থাকে, তাহলে প্রবাসীদের জীবনে ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বচ্ছ, মানবিক এবং দালালমুক্ত বিদেশগমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। সরকার, দূতাবাস, সংবাদমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।’
মঈন সুমন বলেন, ‘কুয়েতে বিভিন্ন ক্লিনিং কোম্পানিতে একজন শ্রমিক যে বেতন পায় তা অতি সামান্য। অনেক শ্রমিক নির্ধারিত ৭৫ দিনার সেটাও হাত পায় না। বিভিন্ন অযুহাতে কেটে ফেলে কোম্পানি। যদি একজন প্রবাসী কুয়েতে ডাল–ভাত খেয়ে দিন যাপন করবেন তাতেও মাসে ২০/২৫ দিনার খরচ হয়। এছাড়া মোবাইলে জন্য ৫ দিনার, যদি কেউ সিগারেট খায় তাহলেতো কথাই নেই। আছে আরও নীত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। মোট কথা একজন নিম্ন আয়ের প্রবাসীর যদি কোম্পানির থাকার জায়গা থাকে তাহলেও ৩০/৪০ দিনার মাসিক খরচ হবেই। সাধারণ একজন শ্রমিকের জন্য দেশটির আইন মেনে বৈধ উপায়ে প্রতি মাসে দেশে ৫ হাজার টাকা পাঠানো কঠিন বলা চলে। এসব সাধারণ প্রবাসীদের নিয়ে কেউ ভাবেন না, হয়তো সময়ই পান না।’
প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক মঈন সুমন বর্তমান রাষ্ট্রদূতের প্রশংসা করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে হলেও কুয়েত প্রবাসীরা একজন প্রবাসবান্ধব রাষ্ট্রদূত পেয়েছেন। যিনি সঠিক অর্থে প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করে চলেছেন।’
প্রবাসীদের কল্যাণে রাষ্ট্রদূতের কিছু কাজের উদাহরণ তুলে ধরেন এই সাংবাদিক।
দক্ষ–অদক্ষ নতুন ভিসা নিয়ে কুয়েতেগামী প্রবাসীদের সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো তৈরি করেছেন। ১ আগস্ট থেকে কুয়েতে নতুন ভিসা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে একজন অদক্ষ শ্রমিকের জন্য সর্বনিম্ন বেতন ৯০ দিনার, এবং একজন সাধারণ দক্ষ শ্রমিকের জন্য সর্বনিম্ন বেতন ১৫০ দিনার ধার্য করেছেন। কিছু কোম্পানি বা ব্যক্তির অধীনে কুয়েতে নতুন ভিসা নিয়ে এসেই অনেক রেসিডেন্সি জটিলতা, কর্মহীনতাসহ নিয়োগকর্তার অসত উদ্যেশের কারণে কুয়েতে অবৈধ হয়েছেন, অনেকে দেশে যেতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন ভিসায় কুয়েতে এসে রেসিডেন্সি বা কাজের জন্য কোনো ঝামেলায় যাতে পরতে না হয় সেইদিকটি বিবেচনা করে দূতাবাসে ভিসা সত্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত প্রজোয্য নিয়োগকর্তার জন্য যেমন সর্বনিম্ন বেতন ৯০ দিনার, কোম্পানির কন্ট্রাক্ট সর্বনিম্ন দুই বছর, শ্রমিকের কাজ দৈনিক ৮ ঘণ্টা, সপ্তাহে একদিন ছুটি, ওভার টাইমে কুয়েতের শ্রম আইন অনুযায়ী আদায় করাসহ শ্রমিকদের বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্টের দিকে গুরুত্বারোপ করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কুয়েত প্রবাসী সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছেন রাষ্ট্রদূত।
সাংবাদিক মঈন সুমন বলেন, ‘রাষ্ট্রদূতের এই মহতী উদ্ধোগটি যেন সর্বদা দূতাবাস তদারকি করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীদের কল্যাণে এই মহতী উদ্যোগটি অসাধু ভিসা চক্রের কাছে পছন্দ হবে না। এতে কিছু অসাধু চক্রের রোশানলেও পরতে পারেন রাষ্ট্রদূত।’
মঈন সুমন বলেন, প্রবাসীরা চায় প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যে কাজ করবেন তার পাশে সকল প্রবাসীদের থাকা উচিত। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন এটা আইন করা হোক ভিসা সত্যায়ন ব্যাতীয় শ্রমিক ভিসায় কে যেনো কুয়েতে আসতে না পারে। ভিসা সত্যায়নের সময় যে সকল শর্ত রয়েছে সেগুলো নিয়োগকর্তা মেনে চলেছেন কি না– কমপক্ষে দুই বছর তদারকি করার ব্যবস্থা করা।
কুয়েতে অনেক শ্রমিক ইতোমধ্যে কর্মহীন সে সব কর্মীদের আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নতুন ভিসার অনুমোদন দেওয়ার দিকটি বিবেচনা করতে অনুরোধ জানান মঈন সুমন।