পর্ব- ২

ধনীরাই তবে বাঁচবে বেশি?

দীর্ঘায়ুর আরক বা অমৃতের সন্ধান মানুষ হয়তো একদিন পাবে। হয়তো একদিন মানুষ বেঁচে থাকবে শত বছর পেরিয়েও বহু বছর। হয়তো এই অমরত্বের তৃষ্ণা মিটবে একদিন। কিন্তু তা কি সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে কোনো দিন?

অমরত্ব বরাবরই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বিষয়বস্তু হিসেবে জনপ্রিয়। সেই অতীত থেকেই এই চল চলে আসছে। ফলে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে সময়ে সময়ে উদ্‌গ্রীব হবেন। হয়েছেনও। কিন্তু হলেই তো হবে না। গবেষণার জন্য টাকা চাই। আর এ ক্ষেত্রেই বরাবরের মতো নিদান হাতে হাজির হয়েছেন ধনাঢ্য ব্যক্তিরা।

বিষয়টি বোঝার জন্য এই সময়ের কিছু তথ্যের দিকে তাকানো যাক। ২০১৩ সালে গুগল ক্যালিকো নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। জৈবপ্রযুক্তির এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ‘মৃত্যু’ নামক সমস্যাটির সমাধান করা। এর কিছুদিন পরই পেপাল-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার থিল মুত্যুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দেন। আর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনেই সংবাদমাধ্যমটির মালিক জেফ বেজোসের এই খাতে বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছে ।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখছে, ২০২১ সালে আমাজন চেয়ারম্যান বেজোস অ্যালটোস ল্যাবে বিনিয়োগ করেন। কী কাজ এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের? আর কিছুই নয়- শরীরে থাকা কোষকে নবযৌবনের স্বাদ দেওয়া। শরীরের কোষগুলোর বুড়িয়ে যাওয়া রোধের পাশাপাশি কোষ-পর্যায়েই রোগের নিদান হাজির করা। নিশ্চিতভাবেই লক্ষটি আর কিছু নয়—অমরত্ব।

এই অ্যালটস ল্যাবও কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরেক শতকোটিপতি ইউরি মিলনারের বিনিয়োগে। এতে যুক্ত আছেন আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক এবং জুনো থেরাপেটিকস ও গ্রেইলের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ক্লসনার। অ্যালটস ল্যাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যুক্ত হয়েছেন।

শুধু এটুকু নয়। এরই মধ্যে কুকুরের আয়ুষ্কাল বাড়াতে কাজ করে সাফল্য পেয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লয়াল একটি ওষুধ তৈরি করেছে, যা বড় আকৃতির কুকুরের আয়ুষ্কাল বাড়াতে কাজ করবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। তারা এখন পশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ক্রাইনেটিকসের সাথে কাজ করছে, যাতে লয়-০০৩ নামের ওই ওষুধের পর্যাপ্ত পরীক্ষা চালানো যায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই পরীক্ষার সাফল্য মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়াতে অনুরূপ ওষুধ তৈরিতে বিজ্ঞানীদের উৎসাহী করবে। এই প্রকল্পে সরাসরি জড়িত আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থ্য বিভাগ।

এদিকে মেটা বা ফেসবুকের মালিক মার্ক জাকারবার্গও বসে নেই। তিনি ও তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান প্রতিষ্ঠিত দ্য ব্রেকথ্রু প্রাইজ থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞান গবেষণা খাতে ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। মজার বিষয় হলো, এই প্রকল্প থেকেই সেইসব বিজ্ঞানী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেন, যারা আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির মতো বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন।

আরেক মার্কিন শতকোটিপতি পিটার ডায়মান্ডিসও তরুণ রক্ত ও স্টেম সেল গবেষণায় টাকা ঢালছেন। লক্ষ্য আর কিছুই নয়, অমরত্ব অধরা থাকলেও যেন দীর্ঘ আয়ুষ্কালের খোঁজ পাওয়া যায়।

তবে বিনিয়োগ যে হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এমন অনিশ্চিত কিন্তু ভবিষ্যমুখী গবেষণায় টাকা ঢালার সক্ষমতা আর কজনের থাকে? নিশ্চিতভাবেই এ তালিকা ছোট। এবং অতি অবশ্যই এ তালিকার আগাগোড়া জুড়ে আছেন বিশ্বের শতকোটিপতিরাই। এরই মধ্যে এই অমরত্ব প্রকল্প বা আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির প্রকল্পে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এই বিনিয়োগ ৬১০ বিলিয়ন (৬১ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। আর ২০৩০ সালের পর এটি হতে যাচ্ছে আরেকটি ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প।

মেটা বা ফেসবুকের মালিক মার্ক জাকারবার্গও বসে নেই। তিনি ও তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান প্রতিষ্ঠিত দ্য ব্রেকথ্রু প্রাইজ থেকে প্রতি বছর বিজ্ঞান গবেষণা খাতে ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। ছবি: সংগৃহীতআগেই বলা হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বড় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত গবেষক ও ইনস্টিটিউট অব এজিং রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক নির বার্জিলাইয়ের ভাষ্যটা পরিষ্কার। তিনি বলছেন, ভবিষ্যমুখী এই গবেষণা খাতে শতকোটিপতিরা বিনিয়োগ করলেও এ খাত আরও বিনিয়োগ প্রত্যাশা করে। ফার্মিসিউটিক্যাল-টেকনোলজি ডট কম–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছেন যে, এই গবেষণা খাতই আদতে মানুষের ইতিহাসের পরের অধ্যায়গুলো লিখবে। ফলে এ খাতে আরও আরও বিনিয়োগ জরুরি।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের পল এফ গ্লেন সেন্টার ফর দ্য বায়োলজি অব দ্য হিউম্যান এজিং রিসার্চ এবং নাথান শক সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন দ্য বেসিক বায়োলজি অব এজিংয়ের পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন বার্জিলাই। এন্টি–এজিং গবেষণায় এই সময়ের একজন পুরোধা বলা যায় তাঁকে।

বার্জিলাইসহ আরও অনেক বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে চলমান বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে ক্রমেই বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। শত শত কোটি ডলার ঢুকছে এ খাতে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, অর্থবিত্ত ও সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অর্জনের পর মানুষ তার আজন্মের সাধটি মেটাতে চাইবেই। আর তা হলো আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা। পারলে অমরত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া।

মানুষ মৃত্যু ভালোবাসে না। সে সাধারণই হোক, আর অসাধারণ। মৃত্যুকে জয়ের পথে মানুষ তো আর আজ থেকে ছুটছে না। বহুকাল ধরেই সে এই পথে হাঁটছে। যদি ধরা দেয় কখনো সেই মৃতসঞ্জিবনী আরক বা সেই অমৃত, তবে তা করায়ত্ত করতে যে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই ঝাঁপাঝাঁপিতে চোখ বুঁজেই বলে দেওয়া যায় যে, এগিয়ে থাকবে ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই। বিষয়টি বুঝতে ক্যানসার চিকিৎসার দিকে একটু চোখ বোলালেই হবে। চিকিৎসা কিন্তু অনেকটাই হাতে এসেছে। কিন্তু সেই চিকিৎসার কতুটুকুই-বা সাধারণের মানুষের সাধ্যে আছে। বিপরীতে সমাজের বিত্তশালীরা এমন এমন সব চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বিস্ময়ে বিহ্বল করে দিচ্ছে আমজনতাকে। আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি বা আংশিক বা পূর্ণ অমরত্ব প্রাপ্তির কোনো উপায় মানুষ জানতে পারলেও, তা যে সহজে সাধারণের ধরাছোঁয়ায় যাবে না-এটা নিশ্চিত।

(চলবে)

আরও পড়ুন:

মানুষের আয়ু হবে ১২০ বছর, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

অতি দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য সংকট না সম্ভাবনা?

অমরত্বের খোঁজে মানুষের যত ছোটাছুটি