পর্ব- ৪

অমরত্বের খোঁজে মানুষের যত ছোটাছুটি

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে– কথাটা শাশ্বত হলে বাস্তবোচিত নয়। তাই বলে চেষ্টা যে নেই তা তো নয়। কল্পলোকের সেই গল্পগাঁথাকে সুন্দর ভুবনে নিয়ে আসার জন্য কাজ করে চলেছেন একদল বিজ্ঞানি। তবে মৃত্যুকে জয় বা অতি দীর্ঘ আয়ু লাভের ভালো–মন্দ দুটো দিকই আছে। চার পর্বের এই আয়োজনে ফজলুল কবির তুলে ধরেছেন মানুষের সেই স্বপ্নযাত্রাকে।

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৮ পিএম

‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই/ নেই কোনো দাবি–দাওয়া’—কবীর সুমন যতই বলুন না কেন—বাস্তবতা হচ্ছে মৃত্যু মানুষ চায় না। এ জন্যই সেই কবে থেকে বলে আসছে মানুষ—‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে।’ অমরত্ব, হ্যাঁ, অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা মানুষের মজ্জাগত। এ জন্য ছোটাছুটিও কম করেনি মানুষ।

ভারতীয় পুরাণের দিকে তাকালে এই অমরত্বের জন্য কত না লড়াই, কত না প্রতিযোগিতার দেখা মিলবে। ধরা যাক সেই সমুদ্রমন্থনের কথাই, যেখানে সবার শেষে দেবতাদের হাতে এসেছিল অমৃত। এই অমৃত কী? পুরাণমতে, অমৃত হচ্ছে সেই আরাধ্য, যা দেবতাদেরকে দিয়েছে অমরত্বের স্বাদ। গ্রিক পুরাণেও রয়েছে এমন এক জাদুকরী, যার নাম অ্যাম্ব্রোসিয়া। অমৃত বা অমীয় বা অ্যাম্ব্রোসিয়া, নাম যাই হোক, কাজ একই—দেবতাদের মতো মানুষকে তার আরাধ্য অমৃতের স্বাদ দেওয়া।

আসা যাক মহাভারতের গল্পে, যেখানে রয়েছেন পাণ্ডবদের পিতামহ ভীষ্ম, যাঁর ছিল ইচ্ছামৃত্যু। বহুল পরিচিত এই মহাকাব্যের বর্ণনামতে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কণ্টকশয্যায় শায়িত ভীষ্মের কাছ থেকেই কিন্তু জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির পেয়েছিলেন ধর্মপোদেশ।

আর গিলগামেশের কথা তো সবাই জানে। সেই কোন অতীতে মেসোপটেমিয়ার লেখা হয়েছিল মানুষের অমর হওয়ার সাধের গাথা। রাজা গিলগামেশেরই বয়ান বিধৃত আছে সেখানে। মাটির ফলকে লেখা সেই লিপিতে রয়েছে সেই বিস্ময় বাক্য—আমাকেও তবে মরতে হবে! বন্ধুর মৃত্যুর পর রাজা গিলগামেশের উক্তি এটি। কী বিস্ময়, কী ব্যাথ্যার অনুরণন তাঁর কথায়!

মৃত্যু অনিবার্য জেনে গিলগামেশ আয়োজন করেন আজকের শতকোটিপতিদের মতোই মৃত্যুকে জয়ের লড়াই। কিন্তু হায়, সবই ব্যর্থ। মৃত্যু আসে মৃত্যুরই নিয়মে। এমন অনেক চরিত্রের নাম বলা যেতে পারে, যাদের কেউ পুরাণের কেউবা বাস্তব ইতিহাসের চরিত্র।

স্বর্গের সিঁড়ি তৈরির কত চেষ্টার গল্প আছে পৃথিবীতে। কেন স্বর্গ? সেও এক অমরত্বের খোঁজ। কারণ, সব ধর্ম ও পুরাণমতেই স্বর্গ হচ্ছে সেই স্থান যা অনন্তযৌবনা, যেখানে নেই কোনো জরা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ–নেই মৃত্যু। ফলে পৃথিবীজুড়েই মানুষ এখনো সেই স্বর্গে যাওয়ার পথই খুঁজছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মই দেয় স্বর্গের প্রতিশ্রুতি। এজন্য সৎ পথ, সৎ চিন্তা ও সৎ কর্মের মতো কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

সে যাক। ইতিহাসে ফেরা যাক। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চীনের সম্রাট ছিলেন কিন শি হুয়াং। অন্য অনেক রাজা–মহারাজার মতোই তাঁরও সাধ ছিল অমর হওয়ার। গিলগামেশের মতোই তিনি ছিলেন মৃত্যুচিন্তায় ভীষণভাবে ভীত। এটা এতটাই যে, মৃত্যু নিয়ে যেকোনো আলোচনাকেই তিনি বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন। এর জন্য শাস্তির বিধানও করেছিলেন। কী সেই শাস্তি? অবশ্যই মৃত্যু।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো স্টিফেন কেভের ‘ইমমর্টালিটি’ বইয়ে মানুষের অমরত্বের পেছনে ছোটার এমন অজস্র কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেন, কিন শি হুয়াং মৃত্যু নিয়ে এমন অবস্থান নিলেও তাঁর রাজ্যে ঠিকই মৃত্যু নিয়ে গ্রাফিতি করেছিল কেউ। তিনি তখন তাঁর সেনাবাহিনীকে আদেশ দেন, সেই ব্যক্তিকে ধরে আনতে, যেমনটা করেন আরকি সম্রাটেরা। কিন্তু সেনাদল ব্যর্থ হয়। পরে ওই এলাকার সব মানুষকে সম্রাটের আদেশে হত্যা করা হয়। হায় অমরত্বের পিছে ধাওয়া এক সম্রাটের খেয়ালে মারা পড়তে হয়েছিল কত না মানুষকে।

এই সম্রাটও কিন্তু পেয়েছিলেন অমৃতের খোঁজ। এ খোঁজ তাঁকে দিয়েছিলেন এক জাদুকর; নাম জু ফু। জু ফু সম্রাটকে জানান, পূর্ব চীন সাগরে এক জাদুর দ্বীপে রয়েছে সেই অমৃত। সেই অমৃত নিয়ে আসতে যথেচ্ছ অর্থায়ন করেন সম্রাট। আজকের শতকোটিপতিদের মতোই। শেষ পর্যন্ত তাঁকে এক অদ্ভুত পানীয় দেওয়া হয়। আর সম্রাট কিন পারদের বিষক্রিয়ায় মাত্র ৪৯ বছরেই মারা যান।

যুগে যুগে এমন অজস্র অমৃতের সন্ধান মানুষ পেয়েছে। বেশি নয়, এই গত ষোড়শ শতকে এক ফরাসি নারীর ইচ্ছা হলো তিনি চীরযৌবনা থাকবেন। দায়াঁ দ্য পতিয়েঁ নামের সেই নারী শারীরিক সৌন্দয্য রক্ষায় পান করেছিলেন তরল সোনা। অবশ্য চীরযৌবনের জন্য ইতিহাসে বহু মানুষকেই পাওয়া যাবে, যারা সোনাকে বেছে নিয়েছিলেন নিদান হিসেবে। কারণও আছে। সোনা সেই বহু আগে থেকেই অভিজাত ধাতু হিসেবে সমাদৃত। ফলে মানুষ অর্থবিত্তের লোভে শুধু নয়, চীরযৌবনের লোভেও সোনার খোঁজ করেছে। আর এই খোঁজ তাকে নিয়ে গেছে পরশপাথর খোঁজার পথেও। কী সেই পরশপাথর? এ হলো সেই পাথর বা বস্তু, যার স্পর্শে এলে সবই সোনা হয়ে যায়।

অমৃত হোক বা চীরযৌবনের খোঁজেই হোক, মানুষ বারবার ফিরে গেছে রক্তের কাছে। রক্তকে মানুষ কখনো পবিত্র জ্ঞান করেছে, কখনো অচ্ছুত। ছবি: সংগৃহীত

অমৃত হোক বা চীরযৌবনের খোঁজেই হোক, মানুষ বারবার ফিরে গেছে রক্তের কাছে। রক্তকে মানুষ কখনো পবিত্র জ্ঞান করেছে, কখনো অচ্ছুত। এও এক লম্বা গল্প। সে গল্পকে পাশে রেখেই বলা যায় যে, শুধু অনন্ত যৌবন বা জীবনের জন্য যুগে যুগে অভিজাতরা কত কত মানুষই না মেরেছে, শুধু তাদের রক্তের জন্য। ১৪৯২ সালে মৃতপ্রায় পোপ অষ্টম ইনোসেন্টের শরীরে শিশুদের রক্ত প্রবেশ করানো হয়েছিল। হায় শিশু, হায় অমরত্ব!

আর ১৭ শতকের হাঙ্গেরির কাউন্টেস এলিজাবেথ বাথোরির গল্প কে না জানে। তিনি কুমারিদের রক্তে নিয়মিত স্নান করতেন, এর মাধ্যমে তাঁর শরীরের ত্বক সবসময় টানটান ও তারুণ্যদীপ্ত থাকবে।

আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা তো বলতেই হয়। বিশ শতকের সেই ভয়াবহ সময়ে নাৎসিরা নেমেছিল এই অমরত্বের খোঁজে। নাৎসি নেতা হেনরিখ হিমলার খ্রিষ্টীয় মতে অমৃতের গুণধারী হলি গ্রেইলের খোঁজে নামেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই হলি গ্রেইল তাঁকে অতিমানবের শক্তি দেবে। কারণ, মধ্যযুগ পর্যন্ত এ কথা প্রচলিত ছিল হলি গ্রেইলে করে কিছু পান করলে, তা মৃত্যুকে বিনাশ করে। হিমলার কখনোই সেই গ্রেইলের দেখা পাননি। অমরত্বও ধরা দেয়নি। ব্রিটিশ সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে তিনি শেষ পর্যন্ত সায়ানাইড পান করে মারা যান।

এমন অজস্র গাথা ও গল্প আছে, যা পুরাণ বা ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। অমরত্ব এখনো ধরা দেয়নি মানুষের হাতে। তবে চেষ্টা থেমে নেই। বিজ্ঞানীরা আজও চেষ্টা করে যাচ্ছেন অমরত্বের খোঁজ পেতে। দেশে দেশে অ্যান্টি–এজিং নিয়ে গবেষণার বিস্তার হচ্ছে। কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ফল কী আসে, তা এখনো কেউ জানে না। তবে সবাই আশায় বুক বেঁধে আছে।

(শেষ)

আরও পড়ুন:

ধনীরাই তবে বাঁচবে বেশি?

মানুষের আয়ু হবে ১২০ বছর, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

অতি দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য সংকট না সম্ভাবনা?

মহাকাশ গবেষণা ও নজরদারিতে যুগান্তকারী অধ্যায় শুরু করল চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলযুক্ত নতুন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি উন্মোচন করেছে দেশটির গবেষকরা। এসব স্যাটেলাইট...
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রকৃতির অজানা ও সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যের ভাইরাল জেনোম তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা নির্দিষ্ট পোষকদেহে আক্রমণ করতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একে বড়...
মহাকাশের অজানা রহস্য উন্মোচনে নতুন অভিযানে যাচ্ছে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা– নাসা। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার উৎক্ষেপণ হচ্ছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। ডার্ক...
পৃথিবীর মতোই প্রাণধারণে সক্ষম এক গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি এ আবিষ্কার করেন। তাঁদের দাবি, গ্রহটির অবস্থান পৃথিবী থেকে ২৫ আলোকবর্ষ দূরে।...
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আইআরজিসি।
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে ঘষামাজা করে চলছে আবারও চালুর প্রস্তুতি। তবে সংস্কারের কোনো অনুমতি ছাড়া এ ধরনের সংস্কারকাজ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে...
খুলনা ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ট্রলার ও ফেরি সংঘর্ষে হয়েছে। এতে ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছে কিনা তা...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর