পর্ব- ৩

অতি দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য সংকট না সম্ভাবনা?

মানুষ অমরত্ব চায়। নিদেনপক্ষে একটা অতি দীর্ঘ আয়ু। আমাদের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের তো আক্ষেপ ছিল—একটা কচ্ছপের যদি ৩০০ বছর আয়ু হয়, তবে মানুষের এত কম কেন? এই আক্ষেপ অনেকেরই আছে, থাকে। আর এ জন্য মানুষ কত না চেষ্টা করেছে যুগে যুগে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়—সত্যি সত্যি মানুষ অমর হলে, তা কি ভালো হবে, নাকি মন্দ?

প্রশ্ন শুনে খটকা লাগতেই পারে। মনে হতে পারে এমন অদ্ভুত প্রশ্নের মানে কী? প্রিয়জনের মৃত্যু মাত্রই তো মানুষকে কাঁদায়। মনে হয়—আহা মানুষটা চলে গেল। যদি আর কিছুদিন থাকত, যদি মৃত্যু বলে কিছু না থাকত! কিন্তু মৃত্যুই বাস্তব। অন্তত এখন পর্যন্ত।

মৃত্যু এড়ানোর কোনো দাওয়াই মানুষ আজও পায়নি। অতি শিগগিরই পাবে, এমন কোনো নিদর্শনও পাওয়া যায়নি। তবে অতি দীর্ঘায়ুর জন্য গবেষণা করতে করতে মানুষ একটি জায়গায় পৌঁছেছে। সে কথা আগেই বলা হয়েছে।

শতবর্ষী লোক এখন আর তেমন বিরল নয়। অনেক দেশেই আছেন এমন শতবর্ষীরা। মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। মানুষ এই আয়ুষ্কালকে আরও বাড়িয়ে শত বছর পেরিয়ে আরও এক-দুই দশক যুক্ত করতে চায়। সে পথে অনেকটা এগিয়েও গেছে।

অ্যান্টি-এজিং বা অমরত্ব নিয়ে গবেষণায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছেন ধনকুবেরা। এ তালিকায় আছেন জেফ বেজোস থেকে শুরু করে আরও অনেকেই।

মানুষ অমর হলে বা নিদেনপক্ষে অতি দীর্ঘ আয়ু পেলে কী হবে? অনেক কিছুই হবে বা হতে পারে। সাধারণ বুদ্ধি বলে, তেমন কোনো কিছু অর্জন করতে পারলে এর চেয়ে বড় কিছু আর হবে না। কর্মযোগী মানুষেরা আরও অনেক দিন কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন। তাদের কাছ থেকে পৃথিবী অনেক কিছু পাবে। ধরা যাক আইনস্টাইনের মতো কারও কথা। ধরা যাক স্টিফেন হকিংয়ের কথা। এ ধরনের মানুষ দীর্ঘায়ু পেলে হয়তো আরও অনেক কিছুই করে যেতে পারবেন। অনেক অসম্পূর্ণ গবেষণা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।

দীর্ঘায়ু নারীদেরও দেবে বিশেষ সুবিধা। সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের মতো বিষয়ের কারণে অনেক মেধাবী নারীর খুব অল্প বয়সেই হারিয়ে যান। দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হলে নারীদের পক্ষে কাজে যুক্ত থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। গোটা বিশ্বই এ থেকে উপকৃত হবে।

কিন্তু এই কি সব? না। কারণ, দীর্ঘায়ুর ফলে পৃথিবী আরও অনেক বিচিত্র ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কথা। জাপান বা অন্য অনেক দেশ এখন এই বয়স্ক জনগোষ্ঠী নিয়ে দুর্ভাবনায় আছে।

কথা হলো দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হলে স্বাস্থ্যকর দীর্ঘায়ুও তো এর সাথে নিশ্চিত হচ্ছে। তাহলে আর দুশ্চিন্তা কেন?

দীর্ঘায়ুর ফলে পৃথিবী আরও অনেক বিচিত্র ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কথা। জাপান বা অন্য অনেক দেশ এখন এই বয়স্ক জনগোষ্ঠী নিয়ে দুর্ভাবনায় আছে। ছবি: সংগৃহীতশুনুন তাহলে ইলোন মাস্কের কথা। অনেক ধনকুবের দীর্ঘায়ু বা অমরত্ব প্রকল্পে টাকা ঢাললেও তিনি এখনো ঢালেননি। এই অনাগ্রহের পেছনে তিনি কারণও দেখিয়েছেন। এ সম্পর্কিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘অতি দীর্ঘকাল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা আমাদের করা উচিত বলে আমি মনে করি না। এতে একটি অবরুদ্ধ সমাজ তৈরি হবে। কারণ, সত্য হচ্ছে- অধিকাংশ মানুষই সময়ের সঙ্গে মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা মরে যায়। আর যদি না মরে, তখন আমরা পুরোনো ধ্যান-ধারণাতেই আটকে পড়ব এবং সমাজ এগোবে না।’

কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাস্ক যে যুক্তি দিচ্ছেন, তাকে খারিজ করা যাবে পাল্টা কোন যুক্তি দিয়ে? এই সময়েই তো দেখা যায় বয়স্ক মানুষেরা যত সুস্থই থাকুন না কেন, জীবনের একটা পর্যায়ে তাঁরা আর নতুনকে স্বাগত জানাতে পারেন না। বাদ থাকে তো নতুন চিন্তা ও নতুন উদ্যোগের কথা।
 
এমনকি বয়স্ক ব্যক্তির নেতৃত্ব নিয়েও দেশে দেশে নানা সমালোচনা রয়েছে। আজকের আমেরিকায় আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় কী? দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বয়স। বা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ৭৭ বছরের ডোনাল্ড ট্রাম্পই বাদ যাবেন কেন। 
 
এদিকে বিজ্ঞানীরাও বলছেন, কোষের যৌবন ফিরিয়ে আনাই হোক, বা বুড়িয়ে যাওয়া কোষের অপসারণই হোক—যে উপায়েই অতি দীর্ঘায়ু বা অমরত্বের কাছকাছি মানুষ পৌঁছাক না কেন, মস্তিষ্কের কোষকে যৌবন ফিরিয়ে দেওয়া একেবারে আলাদা বিষয়। শরীরের অন্য সব কোষের সাথে এর তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এ চলে নিজের ধারায়। ফলে শরীরে সামর্থ্য থাকলেও বা অতি দীর্ঘ সময় সে ১০০ হোক বা ১২০ বছর, মস্তিষ্ককে তরুণ রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। সে ক্ষেত্রে এই অতিবুড়ো মানুষেরা তো বোঝা হয়ে উঠবে সমাজ/ দেশের জন্য, এমনকি বিশ্বের জন্যও।
 
এটা আরও এই কারণে যে, জৈবপ্রযুক্তি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরে আসা আশু এই সাফল্যের সুধা কিন্তু পান করবেন সমাজের ক্ষমতবানেরাই। ফলে নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাবনার প্রসার তো দূরের কথা, নতুনের উত্থানের পথই রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে অমরত্বের দিশা পাওয়া মানুষের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিযান হতেই পারে, কিন্তু তা কতটা সম্ভাবনাময় হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবে এটা মানতে, যেকোনো আবিস্কারের ফল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে এসে পৌঁছায়। এটাই ভরসা।

(চলবে)

আরও পড়ুন:

ধনীরাই তবে বাঁচবে বেশি?

মানুষের আয়ু হবে ১২০ বছর, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

অমরত্বের খোঁজে মানুষের যত ছোটাছুটি