প্রযুক্তি বিশ্বে নিত্যনতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্মী ছাঁটাই। ছোট থেকে বড় সব ধরণের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেই দেখা যাচ্ছে এই প্রবণতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই এখন মানব কর্মীর চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে। আর মোক্ষম এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ব্যয় সংকোচন এখন অনেক প্রতিষ্ঠানেরই দীর্ঘমেদায়ী পরিকল্পনার অংশ। সম্প্রতি জানা গেল, ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন সারা বিশ্বে ম্যানেজারিয়াল (ব্যবস্থাপনা) পর্যায়ে তাঁদের ১৪ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করতে যাচ্ছে।
বছরের শুরুতেই এই বিশাল পরিমাণ কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে অ্যামাজনের সাশ্রয় হবে বছরে ২.১ বিলিয়ন থেকে ৩.৬ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ম্যানেরাজিয়াল পর্যায়ে অ্যামাজনে কর্মরত আছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৭৭০ জন কর্মী। এদের মধ্য থেকে ১৪ হাজার, অর্থাৎ ১৩ শতাংশ কর্মী চাকরি হারাতে চলেছেন। এতে করে ম্যানেজারিয়াল পর্যায়ে অ্যামাজনের কর্মী সংখা নেমে আসবে ৯১ হাজার ৯৩৬ জনে।
অ্যামাজন অবশ্য কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে ব্যয় সংকোচনকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আভ্যন্তরীণ কাঠামোর পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই কর্মী ছাঁটাই করতে যাচ্ছে তাঁরা। নিজেদের কার্যক্রম সুবিন্যস্ত করার মাধ্যমে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করে তুলতে চাইছে অ্যামাজন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে অ্যামাজন তাঁদের কমিউনিকেশন্স ও সাসটেনেবিলিটি বিভাগেও কর্মী ছাঁটাই করেছে। আভ্যন্তরীণ বিভাগগুলোতে সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাঠামো পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে বলে জানিয়েছে অ্যামাজন। আভ্যন্তরীণ কাঠামোর পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিভাগগুলোর দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডার বলছে, কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তটি অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী (সিইও) অ্যান্ডি জ্যাসির কৌশলগত পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ করে তোলার মাধ্যমে জ্যাসি চাইছেন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে।
অ্যামাজন সিইও অ্যান্ডি জ্যাসির পরিকল্পনা হচ্ছে, চলতি বছরের (২০২৫ সালের) প্রথম তিন মাসে ম্যানেজারের তুলনায় সাধারণ কর্মীদের সংখ্যা অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এভাবে দৈনন্দিন কাজে বিদ্যমান জটিলতা হ্রাস করে দ্রুত কার্যসম্পাদনই মূল লক্ষ্য অ্যামাজন কর্তার।
অ্যামাজন স্বীকার না করলেও বাজার বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে ব্যয় সংকোচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। সুপরিচিত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মরগ্যান স্ট্যানলি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছর কাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে ম্যানেজারিয়াল পর্যায়ের ১৩ হাজার ৮৩৪ জন কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারে অ্যামাজন এবং এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যহারে খরচ কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যামাজনের পরিকল্পনায় যে ব্যয় সংকোচনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে সেটা প্রতিফলিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে। এই যেমন পোশাকের ক্ষেত্রে ‘ট্রাই বিফোর ইউ বাই’ (কেনার পূর্বে যাচাই করুন) প্রোগ্রামটি তাঁরা ইতোমধ্যেই বাতিল করেছে। এছাড়া ফিজিক্যাল শপের মাধ্যমে ডেলিভারি সার্ভিসও বন্ধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ম্যানেজারদেরকেও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন দৈনন্দিন কার্যপ্রণালী আরো সুবিন্যস্ত ও কার্যকর করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়।
উল্লেখ্য, প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যামাজনও করোনা মহামারীর সময় নতুন করে বিপুল পরিমাণ কর্মী নিয়োগ দেয়। দীর্ঘদিন লক-ডাউনের কারণে ওয়েব ভিত্তিক সেবার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয় তাঁরা। ফলে ২০১৯ সালে ৭ লাখ ৯৮ হাজার কর্মীর প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ২০২১ শেষ হতে হতে ১৬ লাখ কর্মীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলে ওয়েব সার্ভিসের চাহিদা পুনরায় স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। এ কারণে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ২৭ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করেছে অ্যামাজন। এবারে ১৪ হাজার ম্যানেজারের পালা!
প্রযুক্তি বিশ্বে কর্মী ছাঁটাইয়ের চিত্রটা কেমন?
সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মী ছাঁটাইয়ের চিত্রটা একেবারেই আশাব্যঞ্জক নয়। গত বছর (২০২৪ সালে) সারা বিশ্বে ৫৪৯টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারিয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৭২ জন কর্মী। এ বছর এখন পর্যন্ত (১৮ মার্চ) প্রযুক্তি বিশ্বে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৪ জন। অবশ্য করোনা-পরবর্তী ২০২২ ও ২০২৩ সালে আরও বেশি সংখ্যক প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস