সপ্তাহে আমরা ক’দিন কাজ করি- এই প্রশ্নের জবাবে কেউ বলবেন ৫ দিন, কেউ আবার ৬ দিন। ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিশ্বজুড়ে সংখ্যাটা এর চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা কমই। কিন্তু এবারে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি বিল গেটস জানালেন, একটা সময় আসবে যখন মানুষ সপ্তাহে ২-৩ দিন কাজ করবে! শুধু তাই নয়, কবে থেকে এমনটা হতে পারে তা-ও জানিয়ে দিলেন গেটস।
এক সময়ের বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটসের অনুমান সঠিক হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই মানুষ সপ্তাহে ৫-৬ দিন নয়, কাজ করবে ২ থেকে বড়জোর ৩ দিন। তাঁর এমন অনুমানের নেপথ্যে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। এআই’র কারণে মানুষের কাজ করার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, ফলে সপ্তাহে ২-৩ দিনের বেশি কাজ করার প্রয়োজন পড়বে না। কেননা বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন করবে এআই নিজেই। এমনটাই মত গেটসের।
সম্প্রতি জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান দ্য টুনাইট শো’তে উপস্থিত হয়ে সঞ্চালক জিমি ফ্যালনের সাথে কথা বলেছেন বিল গেটস। ফ্যালনের সাথে কথোপোকথনের এক পর্যায়ে গেটস বলেন, ‘(আমাদের) কাজগুলো কেমন হবে? আমাদের কি সপ্তাহে শুধু ২-৩ দিন কাজ করলেই চলবে?’
মন্তব্যটি প্রশ্নের ঢঙে করলেও গেটস আসলে এমনটাই ইঙ্গিত করেছেন। অবশ্য এআই প্রযুক্তির কারণে মানুষের সাপ্তাহিক কর্মদিবস কমে যাওয়ার ভবিষ্যৎবাণী তিনি এর আগেও করেছেন। চ্যাটজিপিটির একেবারে শুরুর দিকে ২০২৩ সালে গেটস বলেছিলেন যে, একদিন সমাজ হয়তো এমন জায়গায় পৌঁছাবে যখন সপ্তাহে তিন দিন কাজ করাটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে- আর তখন মানুষকে ভাবতে হবে তাঁরা এই অবসর সময়ে কী করবে।
এআই প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় নিত্যনতুন উদ্ভাবনী সব ফিচার ও টুল আসছে প্রযুক্তি বিশ্বে। এআই উন্নয়নের গতি এখন এতটাই প্রবল যে, প্রতি মাসে কোনো না কোনো বড় টুল বা ফিচারের দেখা মিলছে এআই খাতে।
ট্রেভর নোয়ার ‘হোয়াট নাউ’ পডকাস্টে বিল গেটস একবার বলেছিলেন, ‘আপনি যদি জীবনকে একটু বড় পরিসরে দেখেন, তাহলে জীবনের উদ্দেশ্য কেবল চাকরি করা নয়।’
এআই’র কারণে মানুষের সাপ্তাহিক কর্মঘন্টা হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে বিল গেটসের সাথে একমত হতে পেরেছেন জেপি মরগ্যানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেমি ডিমন। তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তি কাজ করার বিষয়টিকে মানুষের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে একটা সময় সপ্তাহে সাড়ে তিন দিন কাজ করাই যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান হবে বলে দাবি করেছেন ডিমন। তবে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানে অচিরেই এমনটা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, কেননা সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিসে এসে কাজ করার কড়া নিয়ম চালু হয়েছে সদ্যই।
দুটি পেশা চলে যেতে পারে এআই’র দখলে
এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের ধারবাহিকতায় দুটি পেশার মানুষ কাজ হারাতে পারেন এআই’র কাছে। দ্য টুনাইট শো’তে ফ্যালনের সাথে কথোপকথনের সময় বিল গেটস এমনটাই জানিয়েছেন। তিনি চিকিৎসক ও শিক্ষকদের কথা বলেছেন - যাদের কাজ অনেকাংশে এআই করে দিবে বলেই মত তাঁর।
বিল গেটস বলেন, ‘এআই’র কল্যাণে আগামী দশ বছরে বুদ্ধিমত্তা (ইনটেলিজেন্স) ফ্রি ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে- যেমন খুব ভালো ডাক্তারি পরামর্শ, খুব ভালো টিউটরিং পাওয়া যাবে।’ বিষয়টি সমাজের জন্য ভালো হবে বলেই মনে করছেন তিনি। তবে পেশাদার স্পোর্টস যেমন বেসবল খেলার মতো কিছু কাজে মানুষের বিকল্প নেই বলেই মত তাঁর।
গেটস আরও বলেছেন, 'কিছু জিনিস আমরা নিজেদের করার জন্য রাখব, তবে কোনো জিনিস তৈরি করা ও সরানো, আর খাবার উৎপাদনের মতো কাজগুলো সময়ের সাথে সাথে এআই করে দেবে।'
সার্বিকভাবে এআই প্রযুক্তির কারণে মানুষের কর্মঘন্টা যেমন কমে যেতে পারে তেমনি অনেক মানুষ কর্মহীনও হয়ে পড়তে পারেন। অর্থাৎ এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের বিষয়টি একদিকে সুখকর হলেও অন্যদিকে উদ্বেগজনকও বটে। তবে এআই’কে দূরে সরিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং নতুন ও উন্নত এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, জানতে হবে এর ব্যবহার এবং একে কাজে লাগিয়েই নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে বলে মত প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
এখন দেখার বিষয়, সপ্তাহে ২-৩ কর্মদিবস চালু হওয়া নিয়ে বিল গেটসের ভবিষ্যৎবাণী আদৌ সত্য হয় কি না।
তথ্যসূত্র: ফরচুন