আমেরিকা, চীনের পর ইউরোপ নিয়ে এল এআই রিজনিং মডেল

ইউরোপের প্রথম এআই রিজনিং মডেল নিয়ে এসেছে ফ্রান্সের এআই স্টার্টআপ মিসট্রাল। অন্যান্য রিজনিং এআই মডেলের মতোই এটি যৌক্তিকভাবে চিন্তা করে উত্তর দিতে (রেসপন্স করতে) সক্ষম। আজ বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নতুন এই রিজনিং এআই মডেল নিয়ে আসার মাধ্যমে মিসট্রাল চাইছে এআই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা চীন ও আমেরিকান মডেলগুলোর সাথে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে এবং তাঁদেরকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। তবে ওপেনএআই’র চ্যাটজিপিটি ও গুগল জেমিনি’র তুলনায় কিছুটা ভিন্ন কৌশলে এগোতে চাইছে মিসট্রাল এআই। 

চ্যাটজিপিটি ও জেমিনি’র এআই মডেলগুলো যেখানে তাঁদের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন সেখানে মিসট্রাল তাঁদের বেশ কয়েকটি এআই মডেলকে ওপেন সোর্স (উন্মুক্ত উৎস) রেখেছে। অর্থাৎ, গ্রাহকরা চাইলে মিসট্রালের এই মডেলগুলোকে নিজেদের মতো করে কাস্টমাইজ করে নিতে পারবে। 

জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তিতে আমেরিকা ও চীনের তুলনায় এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে ইউরোপ। এক্ষেত্রে মিসট্রালের নিজস্ব এআই প্রযুক্তিই যা কিছু আশার আলো দেখাচ্ছে ইউরোপকে। তবে এআই বিশ্বে মার্কেট শেয়ার ও আয়ের দিক থেকে ওপেনএআই, গুগল, অ্যানথ্রপিক, ডিপসিক, মেটা ও এক্সএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছে মিসট্রাল।

এআই প্রযুক্তিতে জেনারেটিভ এআই মডেল ব্যবহার করে সাধারণ লেখা ও ছবি জেনারেট করা হয়। অন্যদিকে রিজনিং এআই মডেল ব্যবহার করা হয় অপেক্ষাকৃত জটিল কাজের ক্ষেত্রে, যেখানে যুক্তি প্রয়োগ করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হয়। রিজনিং এআই মডেলগুলোতে ‘চেন অব থট’ (চিন্তার শৃঙ্খল) প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়- এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে যুক্তি প্রয়োগ করে একটি জটিল সমস্যার সমাধান বের করা হয়। যেমন বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হয় রিজনিং এআই মডেল।

জেনারেটিভ এআই’র তুলনায় রিজনিং এআই মডেল তৈরির পদ্ধতিও কিছুটা ভিন্ন। জেনারেটিভ এআই মডেলগুলোকে বিশালাকার ডেটাসেট দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, ফলে এগুলো তৈরিতে প্রচুর কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু রিজনিং এআই মডেলগুলো তৈরি করা যায় অপেক্ষাকৃত ছোট ডেটাসেট দিয়েও।

মিসট্রাল এবারে দুটি এআই মডেল নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ওপেন সোর্স ‘ম্যাজিস্ট্রাল স্মল’ মডেল। অন্যটি হচ্ছে এর আরও উন্নত, শক্তিশালী সংস্করণ ‘ম্যাজিস্ট্রাল মিডিয়াম’- যেটি মূলত আনা হয়েছে এন্টারপ্রাইজ কথা মাথায় রেখে। 

নতুন এই মডেল দুটি প্রসঙ্গে মিসট্রাল বলছে, ‘মানুষের সেরা চিন্তাগুলো সরলরৈখিক নয়- এগুলো যুক্তি, অন্তর্দৃষ্টি, অনিশ্চয়তা ও আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। রিজনিং ল্যাংগুয়েজ মডেলগুলোর কল্যাণে আমরা আমাদেরকে জটিল চিন্তাভাবনা ও গভীরভাবে অনুধাবনের ভার এআই’র হাতে অর্পণে সক্ষম হয়েছি।’

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ডিপসিক এআই মডেলের আগমনে এআই খাতে বিনিয়োগ উত্তোলনে বেশ বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে আমেরিকান এআই প্রতিষ্ঠানগুলো। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে, আমেরিকান মডেলগুলোর ভগ্নাংশ পরিমাণ খরচে ডিপসিক তাঁদের আর১ মডেল তৈরি করতে পেরেছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রথম রিজনিং এআই মডেল নিয়ে গত বছর হাজির হয় ওপেনএআই। তাঁদের পথ অনুসরণ করে গুগলও কয়েক মাসের মধ্যেই রিলিজ করে রিজনিং এআই মডেল। মেটা এখনও পর্যন্ত আলাদা করে রিজনিং এআই মডেল আনতে না পারলেও তাঁদের সাম্প্রতিকতম উন্নত এআই মডেলটির রিজনিং সক্ষমতা আছে বলে দাবি করছে জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান।

ওপেনএআই, গুগলসহ বেশিরভাগ আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের এআই মডেলগুলোকে নিজেদের মালিকানাধীন রেখেছে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম মেটা, তাঁরা তাঁদের লামা এআই মডেলকে ওপেন সোর্স রেখেছে। অন্যদিকে ডিপসিক থেকে শুরু করে আলিবাবা পর্যন্ত চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই তাঁদের একেবারে উন্নত মডেলগুলোকেও ওপেন সোর্স রেখেছে।

মিসট্রাল এআই’র বর্তমান বাজারমূল্য ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই’র বাজারমূল্য ১৫৭ বিলিয়ন ডলার। এখন দেখার বিষয়, আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পাল্লা দিতে মিসট্রালও চীনের ডিপসিকের পথেই হাঁটে কি-না।

উল্লেখ্য, মিসট্রাল স্মল মডেলটি বর্তমানে হাগিং ফেস প্ল্যাটফর্ম থেকে ডাউনলোড করা যাচ্ছে। মডেলটি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, অ্যারাবিক ও চাইনিজ (সিমপ্লিফায়েড) ভাষায় ব্যবহার করা যাবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স