ভারতে কেন বিনামূল্যে এআই টুল ব্যবহার করতে দিচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির এই যুগে বিভিন্ন এআই টুলের ব্যবহার যেমন বাড়ছে তেমনি চাহিদা অনুযায়ী যোগান দিতে এ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে চলেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। এই প্রেক্ষাপটে, ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে একেবারে বিনামূল্যে উন্নত সব এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে চ্যাটজিপিটি’র মতো শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো। 

প্রশ্ন হচ্ছে, বড় অংকের অর্থ ব্যয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে প্রিমিয়াম এআই টুলগুলো কেন অফার করছে তাঁরা? উত্তরটা আসলে লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নের মাঝেই- ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠানগুলো চাইছে, তাঁদের উন্নত ‘পেইড’ এআই টুলগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহার করে এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠুক ভারতীয়রা। এভাবে ভারতের বাজারে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে তাঁরা। যেমনটা মাইক্রোসফট করেছে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ক্ষেত্রে।

গত সপ্তাহে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই ঘোষণা করেছে যে, তাঁদের স্বল্পমূল্যের এআই চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি গো’ আগামী এক বছর বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন ভারতের ব্যবহারকারীরা। শুধু ওপেনএআই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে গুগল ও পারপ্লেক্সিটি এআই ভারতে স্থানীয় মোবাইল অপারেটরদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিনামূল্যে অফার করছে তাঁদের এআই টুলগুলোর ‘পেইড’ সংস্করণ।

ভারতীয়দের বিনামূল্যে এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ দিতে গুগল চুক্তিবদ্ধ হয়েছে দেশটির সবচেয়ে বড় টেলিকম অপারেটর রিলায়েন্স জিও’র সাথে। অন্যদিকে পারপ্লেক্সিটি এআই চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এয়ারটেলের সাথে। টেলিকম অপারেটর প্রতিষ্ঠান দুটি ইতোমধ্যেই মাসিক ডেটা প্যাকের সাথে বিনামূল্যে এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে গ্রাহকদেরকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমানুল্যে এআই টুল ব্যবহারের এই অফারগুলোকে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোর উদারতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, বরং এগুলোকে দেখতে হবে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে। ওপেনএআই, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলা যায় ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যতের ওপর বড় অংকের বাজি ধরেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ-এর বিশ্লেষক তরুণ পাঠক ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা বিবিসি-কে বলেছেন, ‘(তাঁদের) পরিকল্পনাটি হল প্রথমে ভারতীয়দেরকে জেনারেটিভ এআই-তে অভ্যস্ত করে তোলা, এরপর তাদের কাছ থেকে অর্থ চাওয়া।’ 

পাঠক আরও যোগ করেন, ‘ভারত যা দিচ্ছে তা হল তরুণ ব্যবহারকারীদের মাঝে ব্যবসা বিস্তৃতির সুযোগ। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে চীন, যদিও প্রযুক্তি খাতে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার অনেকাংশেই সীমাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন তিনি।

ব্যবসা বিস্তৃতির জন্য চীনের তুলনায় ভারতের বাজার অনেক বেশি আকর্ষণীয়, কারণ দেশটিতে ব্যবসা করার পরিবেশ অনেক বেশি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক।  ভারতে লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করছে বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রযুক্তি। ফলে এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন ব্যবহারকারী সহজেই পাওয়া যাবে ভারতের বাজারে।

উল্লেখ্য, ভারতে বর্তমানে ৯০ কোটিরও বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং খরচের দিক থেকেও ভারতেই পাওয়া যায় বিশ্বের সবচেয়ে সুলভ ইন্টারনেট। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, দেশটির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগেরই বয়স ২৪-এর নিচে, যাদের বসবাস বলতে গেলে অনলাইন দুনিয়াতেই। 

ডেটা ব্যবহারের দিক থেকেও বিশ্বে ভারতের অবস্থান উপরের দিকেই। ফলে ডেটা প্যাকের সাথে এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ প্যাকেজ আকারে অফার করার কারণে খুব সহজেই গ্রাহকদেরকে আকৃষ্ট করতে পারছে গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। উল্লেখ্য, এআই প্ল্যাটফর্মগুলো যত বেশি ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করতে পারবে তত বেশি তাঁদের ব্যবহার সম্পর্কিত ডেটা পেয়ে যাবে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো।

এ প্রসঙ্গে তরুণ পাঠক বলেন, ‘ভারত আশ্চর্যরকম বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। ভারতীয়দের এআই ব্যবহার সম্পর্কিত তথ্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি হিসেবে কাজ করবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘তাঁরা (এআই প্রতিষ্ঠানগুলো) সরাসরি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে যত বেশি অতুলনীয় ডেটা সংগ্রহ করবে, তাঁদের (এআই) মডেলগুলো, বিশেষ করে জেনারেটিভ এআই সিস্টেমগুলো তত বেশি উন্নত হবে।’ 

এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি লাভজনক হলেও, বিষয়টি সাধারণ ব্যবহারকারীদের ডেটা গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) ও সুরক্ষা সম্পর্কিত উদ্বেগের জন্ম দেয়। দিল্লি-ভিত্তিক প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক প্রশান্ত কে রয় বলেন, ‘অধিকাংশ ব্যবহারকারী কিছু সুবিধা পেতে বা বিনামূল্যে কিছু পেতে ডেটার ওপর নিজের অধিকার ছেড়ে দেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। 

এক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ আশা করছেন তিনি। রয় মনে করেন, ব্যবহারকারীরা অতি সহজে নিজেদের ডেটা অধিকার ছেড়ে দেওয়ার কারণে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে হবে।’ 

উল্লেখ্য, বর্তমানে ভারতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। ডিজিটাল মিডিয়া ও প্রাইভেসি (গোপনীয়তা) সম্পর্কিত ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট ২০২৩ থাকলেও এটি এখনও কার্যকর হয়নি।

এই আইনটি ব্যক্তিগত ডেটার ক্ষেত্রে বিস্তৃত সুরক্ষা প্রদান করলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত নিয়মগুলো এখনও স্থগিত আছে। পাশাপাশি এই আইনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বা অ্যালগরিদমিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে না।  

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং-এর প্রযুক্তি পরামর্শদাতা মহেশ মাখিজা বিবিসি-কে বলেছেন যে, আইনটি কার্যকর হলে ডিজিটাল প্রাইভেসির দিক থেকে এটি হবে সম্ভবত সবচেয়ে উন্নত আইনগুলোর একটি।’

তবে বর্তমানে ভারতের নিয়ন্ত্রণ আইন ওপেনএআই ও গুগল-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেলিকম প্ল্যানের সাথে বিনামূল্যে এআই সরঞ্জাম যুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছে, যা অন্যান্য দেশে অনেকটাই কঠিন।