ধরুন, আপনার হাতের স্মার্টফোন বা ঘরের কম্পিউটারটিতে এমন একটা ভাইরাস ঢুকে পড়ল—যা মানুষের মতোই নিজে নিজে ভাবতে পারে, নিজের মতো প্ল্যান করতে পারে; আবার আপনি যদি তাকে আটকে দেন, সে নিজেই বিকল্প খুঁজে নেয়! না, এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমা নয়, গত জুনে বিজ্ঞানীদের এক পরীক্ষায় ঠিক এই জিনিসটাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। কানাডার একদল বিজ্ঞানী তৈরি করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এক মারাত্মক ডিজিটাল পোকা, যার নাম ‘এআই-ওয়ার্ম’। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার কী জানেন? এই ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে বর্তমান বিশ্বের সব নিরাপত্তাব্যবস্থাই পুরোপুরি ব্যর্থ! আজকে আমরা জানব, এই নতুন ম্যালওয়্যার কেন পুরো পৃথিবীর জন্যই সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ।
সাধারণ ভাইরাস বনাম এআই-ওয়ার্ম
কম্পিউটার বা মোবাইলের ভাইরাস জিনিসটা আসলে কী? সোজা বাংলায়, এটা হলো একটা ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার, যা এক যন্ত্র থেকে অন্য যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। মনে আছে ২০১৭ সালের সেই বিখ্যাত ‘ওয়ানাক্রাই’ ভাইরাসের কথা? মাত্র কয়েক দিনে লাখ লাখ কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাজ্যের পুরো স্বাস্থ্যসেবাকে অচল করে দিয়েছিল সেটি। ওই বছরই ‘নটপেটিয়া’ নামের আরেক ভাইরাসে সারা বিশ্বের এক হাজার কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। কিন্তু ওই পুরোনো ভাইরাসগুলোর একটা বড় দুর্বলতা ছিল। তারা কম্পিউটারের নির্দিষ্ট একটা ভুল খুঁজে নিয়ে ভেতরে ঢুকত। কিন্তু কম্পিউটার আপডেট করে ফেললে, সেটি আর ঢুকতে পারত না। কিন্তু এই নতুন এআই-ওয়ার্ম কোনো নির্দিষ্ট দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। সে জানালা বন্ধ থাকলে দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, দরজা বন্ধ থাকলে ভেন্টিলেটর কাটার প্ল্যান করে! অর্থাৎ, এটি নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে আক্রমণের রাস্তা বদলাতে পারে!
কীভাবে কাজ করে এই ভাইরাস
প্রশ্ন হলো, এই এআই-ওয়ার্ম ঠিক কীভাবে কাজ করে? এটি মূলত ৩টি ধাপে আপনার-আমার কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে প্রবেশ করতে পারে। প্রথম ধাপে এটি কোনো নেটওয়ার্ক বা ডিভাইসে ঢোকার পর প্রথমে চুপচাপ বসে পুরো জায়গাটা ‘রেকি’ করে। আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারের মডেল কী, সেখানে কী কী অ্যাপ আছে, সব তথ্য জোগাড় করে। দ্বিতীয় ধাপে মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই ভেতরের নিজের বুদ্ধিতেই ওই তথ্যের ওপর একটা নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরি করে। যেমন, কোন দিক দিয়ে হ্যাক করা সহজ, তা নিজেই বের করে। আর তৃতীয় ধাপে যখন সে একবার আপনার ডিভাইস দখল করে ফেলে, সেখানে নিজের একটা হুবহু কপি তৈরি করে রাখে। আর সেই কপিটা আবার নতুন স্বাধীন সত্তা হিসেবে পাশের অন্য কোনো মোবাইল বা কম্পিউটারে আক্রমণ শুরু করে! যদি কোনো কারণে একটা আক্রমণ ব্যর্থ হয়, সে মন খারাপ করে বসে থাকে না। সে নিজেই অ্যানালিসিস করে দেখে কেন ব্যর্থ হলো এবং সাথে সাথে অন্য একটা নতুন উপায়ে হ্যাক করার চেষ্টা চালায়। কী ভয়ংকর, তাই না?
গবেষণাগারের ভয়ংকর রিপোর্ট
কানাডার ভেক্টর ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিকোলা প্যাপার্নোর তত্ত্বাবধানে একদল তরুণ গবেষক লিনাক্স, উইন্ডোজ আর আইওটি—এই তিন ধরনের মোট ৩৩টি ডিভাইস নিয়ে একটা কৃত্রিম নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। তারপর সেখানে এই এআই-ওয়ার্মটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মাত্র ৭ দিনের পরীক্ষায় যা দেখা গেল, তা দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ চড়কগাছ! দেখা গেল, এই ডিজিটাল পোকাটি ওই নেটওয়ার্কের ৭৪ শতাংশ দুর্বলতা নিজে নিজেই ধরে ফেলেছে এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৬২ শতাংশ ডিভাইস পুরোপুরি হ্যাক করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে! সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, ২০২৬ সালে আবিষ্কৃত একদম নতুন ৩টি সিকিউরিটি ত্রুটিও সে নিজে নিজেই ইন্টারনেট থেকে তথ্য ঘেঁটে খুঁজে বের করে হ্যাক করতে পেরেছে। অথচ এই এআই ভাইরাসটিকে তৈরি করার সময় ওসব নতুন ত্রুটির কোনো ট্রেনিংই দেওয়া হয়নি!
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা
এখানেই শেষ নয়, এই ভাইরাসের আরও দুটি মারাত্মক গুণ আছে। প্রথমত, এটি যখন কোনো শক্তিশালী কম্পিউটারে ঢোকে, তখন সেই কম্পিউটারের ভেতরের গ্রাফিক্স কার্ড বা জিপিইউ-এর শক্তি চুরি করে নিজের ব্রেন বা বিশ্লেষণ ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নেয়! মানে, আপনার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অবস্থা! ফলে যারা এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে, তাদের নতুন করে কোনো টাকা খরচ করতে হচ্ছে না, কিন্তু যারা বাঁচার চেষ্টা করছে, তাদের সিকিউরিটির পেছনে কোটি কোটি টাকা ঢালতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই এআই ভাইরাসটি চালানোর জন্য চ্যাটজিপিটি বা ওপেনএআই-এর মতো কোনো বড় কোম্পানির পেইড সার্ভিসের দরকার হয় না। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন সোর্স এআই মডেল দিয়ে চলে। ফলে চ্যাটজিপিটির মতো কোম্পানিগুলোর যে সুরক্ষাকবচ বা ফিল্টার রয়েছে, তা একে আটকানোর জন্য কোনো কাজেই আসবে না!
বাঁচার উপায় কী?
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই গবেষণাপত্রটি এখনো বিজ্ঞানীরা চূড়ান্ত রিভিউয়ের জন্য রেখেছেন। তবে তারা এই ভাইরাসের কোডের মেইন গোপন অংশগুলো ইচ্ছা করেই লুকিয়ে রেখেছেন, যাতে কোনো খারাপ হ্যাকার এটা কপি করতে না পারে। তাহলে এই ভবিষ্যৎ বিপদ থেকে বাঁচার উপায় কী? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন থেকে আমাদের ‘কাউকে বিশ্বাস না করার’ নীতিতে চলতে হবে। অর্থাৎ ইন্টারনেটে যুক্ত প্রতিটি ডিভাইসকে প্রতি মুহূর্তে পাসওয়ার্ড বা আইডেন্টিটি দিয়ে বারবার লক চেক করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ভেতর ছোট ছোট দেয়াল তুলতে হবে, যাতে ভাইরাস একটা রুমে ঢুকলেও যেন পাশের রুমে যেতে না পারে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, চোরেরা তত বেশি বুদ্ধিমান হচ্ছে। এখন আর কোনো একটা কোম্পানি বা সরকারের পক্ষে একা এই সাইবার দুনিয়া নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে মিলেই তৈরি করতে হবে সচেতনতার এক নতুন দুর্গ।



