ভারত ২৮ নভেম্বর যে আদেশ দিয়েছিল, পাঁচ দিনেই সেটা বাতিল করতে বাধ্য হলো  

অ্যাপল, স্যামসাং, শাওমিসহ যত স্মার্টফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানি আছে, সবাইকে গত ২৮ নভেম্বর একটা চিঠিতে ভারতের সরকার আদেশ জারি করেছিল – এখন থেকে সব ফোনে ভারতের সরকারের তৈরি ‘সাইবার সুরক্ষা’ অ্যাপটি থাকতেই হবে। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এ নিয়ে দেয়নি ভারত, শুধু কোম্পানিগুলোকে চুপিসারে এ ব্যাপারে চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু সে খবর ফাঁস হওয়ার পর চারিদিক থেকে সমালোচনা ও চাপের মুখে পড়ে ভারতের সরকার। এর প্রেক্ষিতে চিঠিটি পাঠানোর পাঁচ দিন পরই আজ আগের নির্দেশনাটি বাতিল করে দিয়েছে ভারতের সরকার।

ভারত যে স্মার্টফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে এমন নির্দেশনা দিয়েছে, গত সোমবার সংবাদসংস্থা রয়টার্স প্রথম ফাঁস করে সে খবর। সেখানে জানানো হয়, অ্যাপল, স্যামসাংসহ সব প্রতিষ্ঠানকেই ভারতের সরকার চিঠিতে বলে দিয়েছে, তাদের নতুন সব ফোনে ৯০ দিনের মধ্যে ভারতের সরকার প্রযোজিত সাইবার সিকিউরিটি অ্যাপ ‘সানচার সাথী’ প্রি-লোড করে রাখতে হবে। অর্থাৎ, বাজারে আসার আগেই ফোনগুলোতে এই অ্যাপ থাকতে হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছিল, ভারতের সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এই অ্যাপকে এমনভাবে রাখতে হবে যাতে ফোন ব্যবহারকারী চাইলেও অ্যাপটি ডিলিট বা ডিজঅ্যাবল করতে না পারেন!

এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে চারিদিক থেকে চাপের মুখে পড়ে ভারতের সরকার। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে রয়টার্স পরে জানায় যে, অ্যাপল ও স্যামসাং এই নির্দেশনা মানতে নারাজ।

ভারতের বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যে, সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় মতামতে এবং অ্যাক্টিভিস্টদের আওয়াজে এর তুমুল বিরোধিতা চলেছে। তাঁদের দাবি ছিল, সরকার সাইবার সিকিউরিটির ধোঁয়া তুলে আসলে এই অ্যাপের মাধ্যমে ফোনে নজরদারির ব্যবস্থা করছে। ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার এতে লুণ্ঠিত হবে বলে যুক্তি দেন অ্যাক্টিভিস্টরা।  

এর মধ্যে অবশ্য ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এই অ্যাপ এমনভাবে রাখতে বলেছেন যাতে কোনো ব্যবহারকারী চাইলে সেটি ডিলিট করে ফেলতে পারেন। তাতেও সমালোচনা থামেনি।

এরপর আজ নির্দেশনাটি বাতিল করার ঘোষণা দেয় ভারতের সরকার। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয় আজ এক বিবৃতিতে লিখেছে, ‘সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে মোবাইল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর জন্য (অ্যাপটি) প্রি-ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক করা হবে না।’

অথচ এক দিন আগেই ভারতের সরকারের মন্ত্রীরা এই সানচার সাথী অ্যাপের পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, এই অ্যাপ শুধুই চুরি হওয়া ফোন ট্র্যাক করা এবং সেটির ব্যবহার বন্ধ করার কাজে লাগবে, যাতে চুরিকৃত ফোনের অপব্যবহার না হয়।

আজ আগের নির্দেশনাটি বাতিল করার বিবৃতিতে সরকার বলেছে, ‘এই অ্যাপটি নিরাপদ এবং এটি শুধু সাইবার জগতের দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে নাগরিকদের বাঁচানোর স্বার্থেই বানানো হয়েছিল।’ তবে বিবৃতিতে তারা জুড়ে দেয়, গত কিছুদিনে অ্যাপটির জনপ্রিয়তা আপনাআপনিই বেড়ে যাওয়ায় এখন তারা নির্দেশনাটি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা, গত সোমবার অ্যাপটির প্রাত্যহিক ডাউনলোডের হার ১৩ শতাংশ বেড়ে উঠেছে ৭৮ হাজারে।

 

প্রতিবাদ ও উদ্বেগের পর সরকারের পিছু হটা

তবে কারণ যা-ই হোক বা সরকার যা-ই বলুক, এভাবে নির্দেশনা দিয়ে আবার পিছু হটতে হওয়া ভারতের সরকারের জন্য বিব্রতকরই হওয়ার কথা।

আজ বুধবার বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা রানদীপ সিং সুরজেওয়ালা সংসদের উদ্দেশে পাঠানো নোটিশে বলেছেন, এভাবে একটি ‘অমোচনীয় অ্যাপ’ রাখার বাধ্যবাধকতা জারি করার আইনি কর্তৃত্ব সরকারের আছে কি না, এটা সরকারকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। পাশাপাশি গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ঝুঁকির ওপর একটি বিতর্কেরও আহ্বান করেছেন তিনি।  

বাকস্বাধীনতার অধিকার নিয়ে কাজ করা গ্রুপ ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) বলেছে, তারা আজ বুধবার সরকারের এই পিছু হটে আসার পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়, তবে তারা এখনো সরকারের আগের সিদ্ধান্তের পেছনের আইনি ব্যাখ্যা কী সেটি জানার অপেক্ষায় আছে।

নরেন্দ্র মোদির সরকারের আগে স্মার্টফোনে সরকারি অ্যাপ বাধ্যতামূলক করার পথে হেঁটেছে শুধু রাশিয়া। গত আগস্টে রুশ সরকার নির্দেশ দেয়, হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্র প্রযোজিত মেসেঞ্জার অ্যাপ ‘মাক্স’ প্রতিটি স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকতে হবে। সেটি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে অনেক।  

এর আগে কোভিড মহামারির সময়েও মোদির সরকারের এমন এক সিদ্ধান্ত বিতর্কের মুখে পড়েছিল, তখনও চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদলায় ভারতের সরকার। তখন অফিসগামী লোকদের জন্য করোনার ‘কনট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ’ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। তবে এর ফলে মানুষের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার যুক্তি জোরাল হয়ে দেখা দিলে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে যায় মোদির সরকার।