বিশ্বের শীর্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব ও ভীতিকর পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটার মতো জায়ান্টরা জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষামূলক এআই মডেলগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ইন্টারনেটে যুক্ত হয়েছে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা চালিয়েছে।
সাইন্স ফিকশন সিনেমার মতো শোনালেও এই ঘটনাগুলো এআই নিরাপত্তার ভঙ্গুর রূপটিই তুলে ধরেছে। সেই সঙ্গে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, এআই এখন আর কেবল নির্দেশ মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং লক্ষ্য পূরণে নিজস্ব পথ বেছে নিয়ে ক্ষতিকর আচরণও করতে শুরু করেছে।
গত মাসে ওপেনএআই প্রথম জানায়, চ্যাটজিপিটি পরিচালনাকারী একটি পরীক্ষামূলক মডেল তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ইন্টারনেটে প্রবেশ করে। এমনকি সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে এটি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে হ্যাক করে তথ্যও চুরি করে। এর পরপরই অ্যানথ্রোপিক ও মেটা স্বীকার করে, তাদের এআই মডেলগুলোতেও একই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
এখন পর্যন্ত সংঘটিত সাইবার হামলাগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এআই যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে যেকোনো উপায় অবলম্বন করতে শুরু করে, তবে তা মানবজাতির জন্য হতে পারে চরম বিপজ্জনক। এই সংকটকে নাম দেওয়া হয়েছে এআই অ্যালাইনমেন্ট সমস্যা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেক মুর জানান, ‘এআই যখন কোনো লক্ষ্য অর্জনে একটি প্রতিষ্ঠানকে হ্যাক করাকে একমাত্র পথ বলে ধরে নেয়, তখন তা বাধা না দেওয়া পর্যন্ত ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যায়। আজ এটি একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক বা অন্যান্য জরুরি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাবে না—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
ঘটনাটি ভীতিকর হলেও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এখানে আতঙ্কের চেয়েও বেশি রয়েছে এআই কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বিপণন কৌশল বা মার্কেটিং হাইপ। অনেকের দাবি, নিজেদের তৈরি এআই কতটা শক্তিশালী এবং আধুনিক, তা বিশ্বকে দেখানোর এটি একটি চতুর কৌশল হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা সহজ হয়। আবার আরেক দল মনে করছে, এআই নিজেই সব করছে—এমন প্রচারণা চালিয়ে কোম্পানিগুলো মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায় এড়াতে চায়। মেটা ও অ্যানথ্রোপিকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ল্যাব সেটিংসে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবেই এআইগুলো ইন্টারনেটে অ্যাক্সেস পেয়েছিল।
তবে এখনই সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই; যদিও সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা জরুরি। যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যেই সতর্ক করে জানিয়েছে যে বর্তমানে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা বলয় মোটেই পর্যাপ্ত নয়। তাই আগামী দিনে এআই নিয়ন্ত্রণে কেবল কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নয়, বরং কঠোর সরকারি ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রয়োগই একমাত্র সমাধান।