উড়ন্ত গাড়ির সফল পরীক্ষা, কবে আসছে বাজারে?

আকাশে উড়ছে গাড়ি! এমন দৃশ্য কল্পকাহিনীতেই দেখতে অভ্যস্ত আমরা। যেমনটা দেখা যায় ‘ব্লেড রানার’, ‘দ্য ফিফথ্‌ এলিমেন্ট’, ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’-এর মতো সিনেমাগুলোতে। কিন্তু প্রযুক্তির ক্রমাগত উৎকর্ষতায় কল্পকাহিনীও কখনও কখনও বাস্তব হয়ে উঠে। কল্পনার বাস্তব হয়ে উঠার এমনই এক দৃষ্টান্ত সম্প্রতি উপহার দিয়েছে আলেফ অ্যারোনটিক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। আমেরিকান এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি তাঁদের উড়ন্ত গাড়ি বা ফ্লাইং কারের পরীক্ষামূলক সফল উড্ডয়নের একটি ভিডিও প্রকাশ করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

ভিডিও’তে দেখা যায়, আলেফ অ্যারোনটিক্স-এর উড়ন্ত গাড়িটি উলম্বভাবে (ভার্টিক্যালি) আকাশে উড্ডয়ন করছে, যেমনটা হেলিকপ্টার করে থাকে। অর্থাৎ, আকাশে উড়ার বা টেক অফের জন্য এর কোনো প্রকার রানওয়ের প্রয়োজন হয় না, জায়গায় দাঁড়িয়েই এটি উড্ডয়ন করতে পারে। ভিডিও’তে দেখানো ইলেকট্রিক গাড়িটি আলেফ মডেল জিরো-এর একটি আলট্রালাইট ভার্সন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আলেফ অ্যারোনটিক্স-এর প্রকাশিত ভিডিও’টিতে আরো দেখা যায়, গাড়িটি উড্ডয়নের পর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে কিছুটা দূরে উলম্বভাবেই (ভার্টিক্যালি) অবতরণ করছে। এর অর্থ হচ্ছে, উড্ডয়ন ও অবতরণ উভয় ক্ষেত্রেই গাড়িটির অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয় না। ফলে ছোট পরিসরেও অপারেট করা যাবে গাড়িটি। 

তবে শুধু আকাশে উড়তেই নয়, সাধারণ গাড়ির মতো ভূমিতেও চলতে সক্ষম আলেফের এই উড়ন্ত গাড়ি। সাধারণ গাড়ির মতো ভূমিতে চলতে চলতে চালক যেখানেই প্রয়োজন বোধ করবেন সেখানেই গাড়িটিকে আকাশে উড়িয়ে নিতে পারবেন। এরপর আবার যখন তার মনে হবে নিচে রাস্তা ফাঁকা তিনি গাড়িটিকে মাটিতে অবতরণ করাতে পারবেন।

আকাশে উড়ার পাশাপাশি মাটিতেও চলতে সক্ষম আলেফ অ্যারোনটিক্স-এর এই উড়ন্ত গাড়িটি। ছবি: আলেফ অ্যারোনটিক্সউড়ন্ত গাড়ির উড্ডয়ন ও অবতরণের এটিই প্রথম প্রকাশ্যে আসা ভিডিও বলে দাবি করছে ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক আলেফ অ্যারোনটিক্স। আলেফ মডেল জিরো’র পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও অবতরণ কোনো প্রকার সুরক্ষাজনিত সমস্যা ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আলেফ অ্যারোনটিক্স-এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) জিম দাক্‌হভনি আশা করছেন, এই ভিডিওটি সাধারণ মানুষের মনে উড়ন্ত গাড়ি বা ফ্লাইং কার সম্পর্কে পরিবহণের বাস্তবসম্মত নতুন মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জুম কলের মাধ্যমে দেওয়া এক অনলাইন সাক্ষাৎকারে দাক্‌হভনি বলেন, ‘আমরা সত্যিই আশা করি যে এটি রাইট ব্রাদার্সের ভিডিওর মতোই প্রভাব ফেলবে, এই অর্থে যে এটি মানবজাতির কাছে প্রমাণ করে, পরিবহনের নতুন এই মাধ্যমটি বাস্তবসম্মত। এটি (ভিডিওটি) স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণ করে যে, পরিবহণের নতুন এই পদ্ধতি বিদ্যমান এবং এটি কাজ করছে। আমরা এও আশা করি যে, এই ভিডিওটি নতুন একটি বাজার ও অর্থনীতির সূচনা করবে পরিবহণ ব্যবস্থার নতুন এই মাধ্যমটির জন্য- যাকে আমরা ফ্লাইং কার বলছি।’ 

তবে বর্তমানে একটি উড়ন্ত গাড়ি কেনা ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল’ হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি, কেননা এটি এখনও উৎপাদনের পর্যায়ে নেই। তবে একবার উৎপাদন শুরু হলে এর দাম উল্লেখযোগ্যহারে কমার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তিনি। আলেফ অ্যারোনটিক্সের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, উড়ন্ত গাড়িটির দাম একটা সময় টয়োটা করোলা, ফোর্ড, ফোকাস বা এ ধরণের অন্যান্য গাড়ির দামের চেয়েও কমিয়ে আনা বা সমপর্যায়ে নিয়ে আসা।

বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেই গাড়িটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ছবি: রয়টার্সএখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যৎমুখী সিনেমার বাইরে কবে নাগাদ উড়ন্ত গাড়ি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব হয়ে উঠবে। উত্তরে দাক্‌হভনি বলেছেন, ‘সঠিক সময় (বছর) অনুমান করা কঠিন, তবে আমার মনে হয় আমরা পর্যায়ক্রমে সেদিকেই এগোচ্ছি।’

তবে বিবিসি’র সিনিয়র প্রযুক্তি প্রতিবেদক ক্রিস ভ্যালেন্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাক্‌হভনি বলেছেন যে, তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাছে উড়ন্ত গাড়িটির কয়েক হাজার ক্রয়াদেশ বা প্রি-অর্ডার রয়েছে এবং ১২ মাসের মধ্যেই তাঁরা উৎপাদন শুরু করতে পারবেন।

আলেফ অ্যারোনটিক্স জানাচ্ছে, ইলেকট্রিক এই উড়ন্ত গাড়িটির দাম হতে পারে ৩ লাখ ডলারের মতো এবং একবার শতভাগ (ফুল) চার্জ দিলে ১১০ কিলোমিটার আকাশে উড়তে সক্ষম এই গাড়িটি। তবে গাড়িটির একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এতে একজনের বেশি দু’জন যাত্রী বসা কিছুটা কষ্টসাধ্য হবে। বিবিসি’র প্রতিবেদন বলছে, এতে দেড় জনের বসার মতো জায়গা রয়েছে!

ফ্লায়িং কার বা উড়ন্ত গাড়ি নিয়ে আলেফ অ্যারোনটিক্স ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কাজ করছে এবং তাঁরাও চেষ্টা করছে নিজেদের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে উড়ন্ত গাড়ি বাস্তবরুপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক ও আইনগত প্রতিবন্ধকতা নিরসনে এখনও অনেক কাজ করতে হবে আলেফ অ্যারোনটিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তবেই বাস্তব হয়ে উঠবে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। সে পর্যন্ত না হয় অপেক্ষা করা যাক!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, দ্য ইনডিপেনডেন্ট (ইউকে)