সিঙ্কহোল কী, কেন ও কীভাবে তৈরি হয়?

আজ বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের ব্যস্ততম একটি সড়কে হঠাৎ মাটি ধসে গভীর এক গর্ত (সিঙ্কহোল) তৈরি হয়েছে। দেশটির ভাজিরা হাসপাতালের সামনের রাস্তায় সৃষ্ট এই গর্তের গভীরতা প্রায় ১৬০ ফুট (৫০ মিটার)। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে এটি ৩০ মিটার।

এই গর্ত বা সিঙ্কহোলের কারণে টানেল ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও ইতোমধ্যেই ভাজিরা হাসপাতালের সাড়ে তিন হাজার রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। 

প্রশ্ন হচ্ছে সিঙ্কহোল আসলে কী, এবং কেন ও কীভাবে এটি তৈরি হয়? চলুন এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজে দেখা যাক।

সিঙ্কহোল কী?
সিঙ্কহোল হচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠের এমন একটি গর্ত, যা এর নিচের শিলাস্তর ধসে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়। মাটির নিচের শিলাস্তরটি পানিতে দ্রবীভূত হলেই তৈরি হয় এমন গর্ত। এই শিলাস্তরটি প্রায়শই লাইমস্টোন বা চুনাপাথরের হয়ে থাকে, যা পানির প্রবাহে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বা সরে যেতে পারে।

সিঙ্কহোল কীভাবে তৈরি হয়?
যেসব অঞ্চলের মাটির নিচে চুনাপাথর থাকে, সেখানে বৃষ্টির পানি এই পাথরের ফাটলগুলোতে জমা হতে থাকে। এই ফাটলগুলোকে বলা হয় ‘জয়েন্টস’। বৃষ্টির পানি জমে পর্যায়ক্রমে চুনাপাথর দ্রবীভূত হতে থাকে এবং এরই সাথে জয়েন্টসগুলো আরও চওড়া হতে থাকে। একপর্যায়ে মাটি অস্থিতিশীল হয়ে ধসে পড়ে বা দেবে যায়। এই ধস কোনো প্রকার পূর্ব‑সতর্কতা ছাড়া, আকস্মিকভাবে হয়ে থাকে।

সিঙ্কহোলের ধরন ও আকার
সিঙ্কহোল সাধারণত ফানেল আকৃতির হয়ে থাকে। এর চওড়া মুখটি ভূ-পৃষ্ঠের দিকে খোলা অবস্থায় থাকে এবং সরু দিকটি থাকে মাটির নিচের দিকে। উল্লেখ্য, গুহার ছাদ ধসেও তৈরি হতে পারে সিঙ্কহোল।

আকারের দিক থেকে একটি সিঙ্কহোল ১ মিটার (৩ দশমিক ২৮ ফুট) থেকে শুরু করে ৫০ মিটারেরও (১৬৫ ফুট) বেশি পর্যন্ত হতে পারে। পানি এই সিঙ্কহোলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভূগর্ভস্থ একটি চ্যানেল বা গুহায় নিষ্কাশিত হতে পারে। যখন কাদা বা আবর্জনা একটি ভূগর্ভস্থ গুহাকে আটকে দেয়, তখন সেটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে একটি হ্রদ বা পুকুরে পরিণত হয়।

মানুষের কারণেও কী তৈরি হয় সিঙ্কহোল?
হ্যাঁ, মানুষের কারণেও তৈরি হতে পারে সিঙ্কহোল। বিশেষ করে মানুষ যখন রাস্তা, ভূগর্ভস্থ জলস্তর (অ্যাকুইফার) বা অন্য কোনো প্রকার নির্মাণকাজ করে, তখন তৈরি হতে পারে সিঙ্কহোল। কেননা এভাবে ভূমির পরিবর্তনের কারণে মাটির নিচের শিলাস্তর দুর্বল হয়ে যায়। ফলে বেড়ে যায় সিঙ্কহোল তৈরির সম্ভাবনা। বিশেষ করে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় শহরের ব্যস্ত রাস্তা বা আবাসিক এলাকায় তৈরি হতে পারে সিঙ্কহোল।

কোথায় বেশি তৈরি হয় সিঙ্কহোল?
সিঙ্কহোল প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়ে থাকে। বিশেষ করে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং মাটির নিচের চুনাপাথরের শিলাস্তর থাকে। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সিঙ্কহোলের একটি উদাহরণ হতে পারে ‘সেনোট’, যা ভূগর্ভস্থ গুহার ছাদ ধসে গিয়ে পানিকে ভূ-পৃষ্ঠে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে তৈরি হয়। 

উল্লেখ্য, মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে ২ হাজারেরও বেশি সেনোট রয়েছে, যেগুলো বাসিন্দাদের সুপেয় পানির প্রধান উৎসও বটে। প্রাচীন মায়ান সভ্যতায় মানুষ বিশ্বাস করত যে, এই সেনোটগুলো হচ্ছে পাতাললোকে যাওয়ার পথ!

পৃথিবীর কোন অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের ডেড সি-এর চারপাশের অঞ্চলের মাটি সিঙ্কহোল তৈরির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানা গেছে। কেননা এই অঞ্চলে রক সল্টের প্রাচুর্য রয়েছে, যা পানিতে সহজে দ্রবীভূত হয়। সিঙ্কহোল সম্পর্কে জানেন না, এমন পর্যটকদের পাশাপাশি এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন এমন বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত এই অঞ্চলটিতে সিঙ্কহোলের মধ্যে পড়ে আহত হয়েছেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক