আরও চার বছর খেলতে চাওয়া সাকিব এখন কেন অবসর নিচ্ছেন

২০২৩ বিশ্বকাপের আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিই হবে বাংলাদেশের জার্সিতে তাঁর শেষ টুর্নামেন্ট। তবে বিশ্বকাপ শেষে আবার বলেছিলেন ওটা কথার সুরে বলেছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে দুই কেন, আরও চার বছর খেলতে পারেন।

সে চিন্তার ধারাবাহিকতাতেই ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বোর্ডের এক কন্টেন্টে সাকিবই বলেছিলেন, খেলতে চান ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে একটি অনন্য অর্জন আছে সাকিবের। সে অর্জনের কথা টেনে বলেছিলেন, ‘আমি এবং রোহিত শর্মাই হয়তো মাত্র দুজন খেলোয়াড় যারা সবগুলো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেছে। আশা করব আরও একটি বিশ্বকাপ যেন খেলতে পারি।’

২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে পারলে সে অর্জনে আর রোহিত শর্মাকে সঙ্গী পেতে হতো না সাকিবকে। কারণ, ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে অবসর নিয়ে নিয়েছেন রোহিত। এদিকে আজ কানপুর টেস্ট-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে টেস্ট থেকে অবসরের ঘোষণার পাদটীকা হিসেবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ থেকে অবসরের কথা জানিয়েছেন সাকিব।

গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচটিই এই ফরম্যাটে সাকিবের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁকে দেখা যাবে অক্টোবর পর্যন্ত। আর ওয়ানডের জন্যও সীমা জানিয়ে দিয়েছেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলে ৫০ ওভারের ক্রিকেট থেকেও বিদায় নেবেন তিনি।

টেস্টের শেষ ভেন্যু হিসেবে ঘরের মাঠের কথা নির্দিষ্ট করে জানালেও ওয়ানডে থেকে বিদায় কোথা থেকে নেবেন সেটা বলতে পারেননি সাকিব। কারণ, পাকিস্তানে আয়োজনের কথা থাকলেও এখনো ভারত রাজি না হওয়ায় ভেন্যু বদলে যেতে পারে এই টুর্নামেন্টের।

যেকোনো বিচারেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স, ম্যাচ বদলে দেওয়া মুহূর্তের জন্ম দেওয়া বাদ দিয়ে শুধু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও কথাটি সত্যি।

টি-টোয়েন্টির পাট যখন চুকিয়ে ফেলেছেন, সেটাই আগে দেখা যাক। ১২৯ টি ম্যাচে ২৫৫১ রান আর ১৪৯ উইকেট। ১৩টি ফিফটি আর ২৩.১৯ গড়। দুবার ম্যাচে পাঁচ উইকেট পেয়েছেন, বোলিং গড় ২০.৯১। ইকোনমি ৬.৮১। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি, কিছুদিন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন।

কিন্তু টি-টোয়েন্টি সাকিবকে একসময় বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার বানায়নি। বানিয়েছে অন্য দুই ফরম্যাট। সাকিব যেমনটা বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুযোগ পেলে সেটাই হবে তাঁর শেষ ম্যাচ। সে হিসেবে টেস্টে আর তিন ম্যাচ খেলবেন। এর আগের ৭০ টেস্টেই যা করেছেন, তাতে সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় থাকবেন সাকিব।

৭০ টেস্টে একটি ডাবল সেঞ্চুরিসহ পাঁচ সেঞ্চুরি হয়তো তাঁর ব্যাটিং সামর্থ্যের পরিপূর্ণ পরিচয় দেয় না, তবু ৩৮.৩৩ গড়ে ৪৬০০ রান করেছেন। ৩১.৮৫ গড়ে ২৪২ উইকেট পেয়েছেন। ইনিংসে ১৯ বার ৫ উইকেট পেয়েছেন। ব্যাটিং ও বোলিং গড়ে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের সঙ্গে শুধু পাল্লা নয়, তাদের টেক্কাও দেন সাকিব।

ওয়ানডেতে সাকিবের দাপট আরও বেশি। ২৪৭ ম্যাচে ৯টি সেঞ্চুরিসহ ৭৫৭০ রান, গড়টা একসময় ৪০ পেরিয়ে গেলেও ইদানীং কমে ৩৭.২৯-এ নেমেছে। উইকেট পেয়েছেন ৩১৭টি। ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়েছেন ৪ বার। প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে শীর্ষস্থানের স্বাদ এনে দিয়েছেন তিনি এই ফরম্যাটেই।

কিন্তু গত তিন বছরে সাকিবের এই পারফরম্যান্সে চিড় ধরেছে। সাকিবকে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় রাখার সবচেয়ে বড় যুক্তি ছিল ব্যাটিং ও বোলিং গড়ের পার্থক্য। অর্থাৎ, ব্যাটিং গড় বোলিং গড়ের চেয়ে বেশি। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি- তিন ফরম্যাটেই সাকিবের ব্যাটিং গড় বোলিং গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু গত তিন বছরের পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে, সেটা আর বলা যায় না।

২০২১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ১২টি টেস্ট খেলেছেন সাকিব। এই সময়ে মাত্র ৬ ফিফটি, কোনো সেঞ্চুরি নেই। ব্যাটিং গড় ৩৩.৩৫।  ওদিকে ২৭ টেস্টে মাত্র ২৭ উইকেট পাওয়া সাকিবের এ সময় বোলিং গড় ৩৮.১১। অর্থাৎ ব্যাটিং ও বোলিং গড়ের পার্থক্য -৪.৭৬।

ওয়ানডেতেও ধারাটা প্রায় একই রকম। ৩২ ম্যাচে কোনো সেঞ্চুরি নেই, ৩৩.৪৪ গড়ে রান করেছেন ৯৭০টি। আর ৪০ উইকেট পেয়েছেন ৩০.১২ গড়ে। ফলে যেখানে ক্যারিয়ার গড় পার্থক্য যেখানে ৭.৭৬, সেটা গত তিন বছরে ৩.৩২-এ নেমে এসেছে।

টি-টোয়েন্টিতে অবশ্য ভিন্ন চিত্র। ৪১ ম্যাচে ৭৮৮ রান করা সাকিবের ব্যাটিং গড় (২৩.৮৭) ক্যারিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি, ফলে বোলিং গড় আগের তুলনায় বেড়ে গেলেও, ব্যাটিং ও বোলিং গড়ের পার্থক্য ২.২৭ থেকে ২.৩৯ হয়েছে।

কিন্তু সেটা যদি শুধু গত এক বছরের সীমায় নেমে আসে? তাহলে টি-টোয়েন্টিতে তা -১০.৬৫, ওয়ানডেতে তা -৯.৯৮, আর টেস্টে -২৭.৮৮। অর্থাৎ, গত এক বছরে সাকিব দলে ব্যাট হাতে যতটুকুই অবদান রাখুন না কেন, বল হাতে তার চেয়ে অনেক বেশি রান বিলিয়ে দিচ্ছেন। এর মানে হলো, আদর্শ অলরাউন্ডারের যে মানদণ্ড সাকিবের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সেটাতেই তিনি ফেল করছেন। 

এ কারণে দলে সাকিবের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এবং নিজের অবস্থা বুঝতে পেরেই অবসর নিয়ে নিয়েছেন তিনি।