বিসিবি আর ফারুক আহমেদের উদ্দেশ্য নিয়েই উল্টো প্রশ্ন হাথুরুসিংহের

চন্ডিকা হাথুরুসিংহের চুক্তি বাতিল করে এরই মধ্যে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে ফিল সিমন্সকে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তবে হাথুরুসিংহে যে এ নিয়ে চুপ থাকবেন না, সে তো তিনি আগেই জানিয়েছিলেন। নিজের আইনজীবীর সঙ্গে আলাপের পর বিসিবিকে জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক কোচ। আজ এক বিবৃতিতে বিসিবি আর বোর্ডের নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদকে নিয়েই উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন হাথুরু।

তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলে তাঁর পাঁচ মাস বাকি থাকা চুক্তিটি বাতিল করা হলো, সেগুলোকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ করেছেন হাথুরু। যেভাবে তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার শো-কজ নোটিশ দেওয়ার ৪ ঘণ্টার মধ্যেই নতুন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ নিয়োগের ঘোষণা দিল বিসিবি – সেসব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শ্রীলঙ্কান এই কোচ। তাছাড়া বিসিবি সভাপতি হওয়ার পরপরই হাথুরুকে ছাঁটাই করার ব্যাপারে তাঁর মত আগের মতোই আছে জানিয়ে ফারুক আহমেদ যে হাথুরুকে ছাঁটাই করলে বিসিবির আর্থিক লাভের কথাও বলেছেন – সেসব জানিয়ে পুরো সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাথুরুসিংহে।  

যথাযথ অনুমতি না নিয়ে বাড়তি ছুটি ভোগ করে চুক্তির শর্ত ভাঙা এবং ২০২৩ বিশ্বকাপের সময়ে এক খেলোয়াড়কে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার অভিযোগে হাথুরুর চুক্তি বাতিল করে বিসিবি। বাংলাদেশের ক্রিকেটপাড়ায় শোনা যায়, উক্ত খেলোয়াড়ের নাম নাসুম আহমেদ।

তবে ক্রিকইনফো জানাচ্ছে, হাথুরু এ নিয়ে বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘এই অভিযোগগুলোকে আমার কাছে পূর্বপরিকল্পিত মনে হয়েছে। নতুন সভাপতির মেয়াদের প্রথম দিনেই তিনি জনসম্মুখে প্রধান কোচকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন, যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিসিবির আর্থিক বিষয়াদি জড়িত বলেও তিনি স্বীকার করেছিলেন।’

‘এই অভিযোগগুলোকে আমার কাছে পূর্বপরিকল্পিত মনে হয়েছে। নতুন সভাপতির মেয়াদের প্রথম দিনেই তিনি জনসম্মুখে প্রধান কোচকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন, যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিসিবির আর্থিক বিষয়াদি জড়িত বলেও তিনি স্বীকার করেছিলেন।’

- তাঁর চুক্তি বাতিল করার প্রেক্ষিতে বিসিবির নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাথুরুসিংহে

তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ দেওয়ার ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই নতুন কোচ নিয়োগের ঘোষণা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাথুরু, ‘তাছাড়া আরেকজন নতুন প্রধান কোচ নিয়োগের ঘোষণার মাত্র চার ঘণ্টা আগে ‘শো কজ নোটিশ’ পাওয়ার ব্যাপারটিও আমাকে অবাক করেছে। অথচ নোটিশে লেখা ছিল, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য আমাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাক্রমই এমন সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়।’

বিসিবি গত ১৫ অক্টোবর নোটিশটি দিয়েছে হাথুরুসিংহেকে। সেই নোটিশ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া সংবাদ সম্মেলনেই বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ নতুন কোচ হিসেবে ফিল সিমন্সের নাম জানিয়ে দেন। গতকাল ১৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে হাথুরুসিংহের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় বিসিবি।

তবে যে দুই অভিযোগ তুলে তাঁকে ছাঁটাই করা হলো, তার মধ্যে অসদাচরণের অভিযোগটি নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন আছে হাথুরুসিংহের। তাঁর দাবি, উক্ত খেলোয়াড় ওই সময়ে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেননি। এক ইউটিউবার ‘এভাবে কথাটি ছড়িয়েছেন’ এবং এরপরই এ নিয়ে বিতর্ক ছড়ায় বলে দাবি হাথুরুসিংহের।

তাঁর যুক্তি, ‘প্রথমত, কথিত ঘটনাটি খেলোয়াড়দের ডাগআউট বা ড্রেসিংরুমে ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে, বিশ্বকাপের ম্যাচের সময়ে ওই জায়গাটি সার্বক্ষণিকভাবে ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারিতে রাখা হয়। আর, ঘটনাটি যত গুরুতর বলে দাবি করা হয়েছে, তা যদিই সত্যিই হয়, তাহলে উক্ত খেলোয়াড় যে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি দলের ম্যানেজার বা যেকোনো কর্তৃপক্ষের কাছে জানাননি, এ ব্যাপারটিও তো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।’

পুরো ঘটনাটি পরে সাজানো হয়েছে বলে পাল্টা দাবি হাথুরুসিংহের, ‘যদি অভিযোগ করা হয়েই থাকে, সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন জাগে, আমাকে কেন সে সময়েই এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলো না বা সে সময়েই কেন আমার দিক থেকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলো না? এটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে যে কেন কয়েক মাস পর ইউটিউবে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটনাটির কথা ছড়ানো হলো?’

‘যদি অভিযোগ করা হয়েই থাকে, সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন জাগে, আমাকে কেন সে সময়েই এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলো না বা সে সময়েই কেন আমার দিক থেকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলো না? এটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে যে কেন কয়েক মাস পর ইউটিউবে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ঘটনাটির কথা ছড়ানো হলো?’

- তাঁর বিরুদ্ধে বিসিবির আনা অসদাচরণের অভিযোগের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন হাথুরুসিংহের

বিসিবির দিক থেকে হাথুরুসিংহের নিয়মের বাইরে গিয়ে বাড়তি ছুটি কাটানোকেও তাঁকে ছাঁটাইয়ের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এ নিয়ে হাথুরুর দাবি, ‘আমি সব সময়ই (বিসিবির) সিইও এবং ক্রিকেট অপারেশনসের চেয়ারম্যানের কাছে ছুটির আবেদনে সম্মতি পেয়েই ছুটি কাটিয়েছি। আমার ছুটি কাটানো নিয়ে বিসিবি কখনোই আপত্তির কথা জানায়নি। বরং যখনই আমি ছুটির আবেদন করেছি, বিসিবি সেটি অনুমোদন করেছে। এমন কখনোই হয়নি যে আমি যথাযথ অনুমতি না নিয়ে ছুটিতে গেছি।’

নতুন বোর্ডের দিক থেকে তাঁর ছুটির গণনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ হাথুরুর, ‘নতুন বোর্ডের সদস্যরা যখন অভিযোগ করেছেন যে আমি বাড়তি ছুটি কাটিয়েছি, তাঁরা ঈদের দিনগুলোর মতো সাধারণ ছুটি কিংবা আমার ছুটির মধ্যে পড়ে যাওয়া শুক্রবারগুলোকে হিসাবে নেননি। সাধারণ অনেক ছুটির দিনগুলোতেও যে আমি ছুটি নিইনি, সেটির প্রাপ্য স্বীকৃতিও তাঁরা আমাকে দেননি। আমি যতটা বুঝি, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী শুক্রবারগুলোতে কাজ করার বিনিময়ে আমার ছুটি পাওনা থাকে। এর পাশাপাশি বিসিবির কর্মী হিসেবে আমার শুক্রবার দিনগুলোতে এবং বৃহস্পতিবার আধাদিন ছুটি পাওয়ার কথা।’

নিরাপত্তাশঙ্কায় তিনি বাংলাদেশ ছেড়েছেন জানিয়ে কর্মীদের প্রতি বিসিবির ব্যবহার এবং নতুন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মনোভাব নিয়েও বিবৃতিতে প্রশ্ন তুলেছেন হাথুরুসিংহে। ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাকে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। (আমার বিরুদ্ধে) এই অভিযোগগুলো তোলা, অতি দ্রুততার সঙ্গে নতুন প্রধান কোচ নিয়োগ এবং যথাযথ নিয়ম না মানার প্রবণতা – সব মিলিয়ে নতুন ম্যানেজমেন্টের মনোভাব এবং বিসিবির নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের প্রতি তাঁদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’

নিজের মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হাথুরু বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি যেকোনো তদন্তে সহায়তা করতে প্রস্তুত।