পাকিস্তানে আরেক নাটক

নতুন কোচকে না জানিয়েই তাঁর সহকারীকে বিদায় করে দিয়েছে বোর্ড

পাকিস্তানের ক্রিকেটে কখন যে কী হবে, সেটা সম্ভবত দেশটার ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কর্মকর্তারাও জানেন না। আজ একটা সিদ্ধান্ত হলো, কাল হয়তো দেখা গেল সে সিদ্ধান্তের আর কার্যকারিতা নেই। নতুন নাটক জমেছে দলটার কোচ জেসন গিলেস্পির ভবিষ্যত নিয়ে।

এই তো গত এপ্রিলে ঢাকঢোল পিটিয়ে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির জন্য গ্যারি কারস্টেন আর টেস্টের জন্য গিলেস্পিকে কোচ করে নিয়ে এল পিসিবি। এর মধ্যে অক্টোবরে কারস্টেন হঠাৎ দায়িত্ব ছেড়ে দেন, এর পেছনে আনুষ্ঠানিক কারণ তিনি না জানালেও অনেকের ধারণা, অধিনায়ক বদল আর দল নির্বাচনে কোচের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার কারণেই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন কারস্টেন। সে সময় অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে গিলেস্পিকে সাদা আর লাল বলের দল দুটিরই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মাস চারেক না যেতেই সেই গিলেস্পির পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে কেন? কারণ, গিলেস্পিকে না জানিয়েই তাঁর ‘ডানহাত’ হিসেবে পরিচিত সহকারী কোচ টিম নিয়েলসেনকে বিদায় করে দিয়েছে পিসিবি। ক্রিকইনফো জানাচ্ছে, এতে বিরক্ত গিলেস্পি নিজেও এখন বিকল্প ভাবছেন।

গত আগস্টে ‘হাই পারফরম্যান্স রেড বল কোচ’ হিসেবে নিয়েলসেনকে নিয়োগ দেয় পিসিবি। তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে পাকিস্তানের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর। চুক্তিটি নবায়নের আলোচনা চলছিল, নিয়েলসেন নিজেও চুক্তি নবায়নের আশায় বসে ছিলেন। ক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, তিনি ভেবেছিলেন দলে তিনি ‘ভালো উন্নতি করছেন’, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে পাকিস্তানের আসন্ন টেস্ট সিরিজের জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে পিসিবি নিয়েলসেনকে জানিয়ে দিয়েছে, তাঁকে আর দরকার নেই।

ক্রিকইনফো লিখেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যে তাঁর সহকারী নিয়েলসেনকে পাবেন না, সেটা গিলেস্পিকে পিসিবি আগে থেকে জানায়নি। এতেই বেশ চটেছেন গিলেস্পি। গত কয়েক মাসে নির্বাচক প্যানেল থেকে কোচদের সরিয়ে দেওয়াসহ নানা সিদ্ধান্তে এমনিতেই পিসিবিতে নিজের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে সংশয়ে থাকা গিলেস্পি এখন তাঁর সঙ্গে আলাপ না করেই নিয়েলসেনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নেওয়ার কোনো কারণও নেই।

অক্টোবরে নির্বাচক প্যানেল থেকে কোচদের সরিয়ে দেওয়ার পরই বিরক্তিটা গিলেস্পি জানিয়েছিলেন এভাবে যে, তিনি নিজেকে এখন শুধুই ‘ম্যাচের পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে দেখছেন।

নিয়েলসেনকে সরিয়ে দেওয়াতে গিলেস্পির বিরক্তি বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে ক্রিকইনফো জানিয়েছে, গিলেস্পির মনে হয়েছিল, খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিয়েলসেনের সম্পর্কটা দিনে দিনে আরও গভীর হয়ে উঠছিল। গিলেস্পি এবং নিয়েলসেন দুজনেরই মনে হয়েছে যে, নিয়েলসেনের পাকিস্তানে ঘাঁটি গেঁড়ে না থাকাই পিসিবির তাঁর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার একটি বড় কারণ।

নিয়েলসেনের বিকল্প কে হচ্ছেন, সে আলোচনায় পিসিবির নতুন খামখেয়ালিপনার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে। সেখানে লেখা, পিসিবি এখন আবার ভাবছে, বিদেশি কোচদের বদলে পাকিস্তানভিত্তিক কোচদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এর আগে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ভরাডুবির পরও বিদেশি কোচদের পাইকারি হারে সরিয়ে দেয় পিসিবি, কাউকে ছাঁটাই করেছে, কারও চুক্তি নবায়ন করেনি। কিন্তু এ বছরের শুরুতে আবার বোর্ডের নেতৃত্বে বদলের পর গিলেস্পি-কারস্টেনদের নিয়োগ দেয়।

এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সফরের পর কারস্টেনের বিকল্প হিসেবে আকিব জাভেদকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত সাদা বলের দলের কোচ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানেও পিসিবির খামখেয়ালের ছাপ পাওয়া যায়। আকিব জাভেদ যে আগে থেকেই পিসিবির নির্বাচক প্যানেলের সদস্য। এর আগে মিসবাহ-উল-হক একইসঙ্গে নির্বাচক প্যানেলে আর কোচের দায়িত্বে থাকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করতেন আকিব জাভেদ, সেই তিনিই এখন একই কাজ করছেন।

আকিব জাভেদকে দায়িত্বটা দেওয়ার আগে অবশ্য গিলেস্পিকে টেস্টের পাশাপাশি ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টির কোচের দায়িত্ব নিতেও বলেছে পিসিবি, কিন্তু সে জন্য তাঁকে বাড়তি টাকা-পয়সার কোনো প্রস্তাব দেয়নি। গিলেস্পি দায়িত্বটা নেননি। সেটিকেও পিসিবি ভালোভাবে নেয়নি বলে জানাচ্ছে ক্রিকইনফো। সেই থেকেই গিলেস্পির সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্কটা শীতল হতে শুরু করে।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট সিরিজের আগে গিলেস্পি দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে ক্রিকইনফো। এরপর কী হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ গিলেস্পিকে পিসিবি ছাঁটাই করলে সে ক্ষেত্রে চুক্তির বাকি সময়ের একটা বড় অংশের জন্য তাঁকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর গিলেস্পি নিজে থেকে সরে গেলে সে ক্ষেত্রে পিসিবির ক্ষতিপূরণের অঙ্কটা কম হবে।

গত মাসে গিলেস্পির ভবিষ্যত নিয়ে গুঞ্জন শুরু হওয়ার পর পিসিবির বিবৃতিটাও ছিল অদ্ভুতূড়ে। বিবৃতিতে পিসিবি তখন জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা সফর পর্যন্ত গিলেস্পিই থাকছেন! কিন্তু চুক্তির বাকি সময়ের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে ব্যাপারে কিছু জানায়নি।