বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচের আগে বলেছিলেন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই সিরিজ থেকেই নতুন ধরনের ক্রিকেট খেলতে চান তাঁরা। কিন্তু সিলেটে আজ প্রথম টেস্টের প্রথম দিন শেষে কী দেখা গেল? সেই একইরকম এলোমেলো ব্যাটিং, ধুঁকতে ধুঁকতে কিছু রান করা, এবং দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে আসা প্রতিনিধির মুখে সেই ‘চেষ্টা করছি’র গল্প।
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের শট সিলেকশনের দুর্বলতা ও টেস্টের টেম্পারামেন্টের অভাব আরেকবার সাদা চোখে ধরা পড়ল, যখন দিনের তৃতীয় সেশনের ১১ ওভারের মধ্যেই টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া বাংলাদেশ অলআউট হয়ে গেল ১৯১ রানে। টেস্টে সর্বশেষ ১২ ইনিংসে এ নিয়ে ৮ বার ২০০-র নিচে অলআউট হলো বাংলাদেশ।
এরপর আলোকস্বল্পতায় কিছুটা আগেভাগে শেষ দেখা দিনে যে ১৪.১ ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেল জিম্বাবুয়ে, তাদের ব্যাটিং দেখে বরং বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আক্ষেপ আরও বাড়ার কথা। কোনো উইকেট না হারিয়েই ৬৭ রান তুলে ফেলেছে জিম্বাবুয়ে। দুই ওপেনারের মধ্যে ব্রায়ান বেনেট ৩৭ বলে ৪০ রান নিয়ে ব্যাট করছেন, অন্য ওপেনার বেন কারেন ৪৯ বলে করেছেন ১৭ রান।
এমন দিনের শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তরের ধরনে আর নতুনত্ব থাকবে কীভাবে! বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুর্দশা নিয়েই বেশিরভাগ প্রশ্ন হলো। বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হয়ে আসা সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনেরও সেই পুরোনো ঢংয়ের উত্তর ছাড়া আর কী-ইবা বলার ছিল!
শান্তর কথা ধরে যখন নতুন কী দেখলেন জিজ্ঞেস করা হলো সালাউদ্দিনকে, উত্তরে তিনি বললেন, ‘ক্যাপ্টেন কী বলেছে সেটা আমি জানি না। তবে নতুন যেটা বললেন, আমি মনে করি ছেলেরা মানসিকভাবে নতুন অনেক কিছু চেষ্টা করেছে। নিজের উন্নতির ব্যাপারে তারা অনেক সচেতন। হয়তো আজ আমরা খারাপ খেলেছি। তার জন্য বলা যাবে না যে তারা চেষ্টা করছে না বা তাদের বড় হওয়ার ইচ্ছা নেই। নতুন কিছু করতে চাচ্ছি আমরা। আরও ভালো যাতে হতে পারি। সেজন্য কাজ করছি। যেসব জায়গায় উন্নতি দরকার, চেষ্টা করছি করার।’
মুশফিক, মিরাজ, জয়, সাদমানরা দাঁড়াতেই পারেননি। মুমিনুল, শান্ত, জাকেররা শুরু পেলেও সেটা টেনে নিতে পারেননি। এঁদের বেশিরভাগই আউট হয়েছেন অদ্ভুত সব শট খেলে। এ নিয়ে সালাউদ্দিনের কথা, ‘আমিও মনে করি ট্যাকটিক্যালি আমরা কিছু ভুল করেছি। যখনই খেলাটা ধরছি, হঠাৎ করে কোনো শট খেলে ফেলছি। এটা পুরোটাই মানসিক। দ্রুতই এই জায়গা নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিপক্ষ নিয়মিতই এভাবে আমাদের উইকেট নিয়ে যায়। এই জায়গাগুলো তাড়াতাড়ি বুঝতে হবে।’
টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর তো ইদানিং প্রায় প্রতি সিরিজে, বলতে গেলে প্রতি ইনিংসের শেষেই কমন! এ নিয়ে প্রশ্নে সালাউদ্দিনের উত্তর, ‘আসলে কোনো দেশের ক্রিকেট ৫-৬ জনের উপর দাঁড়ায় না। ক্রিকেট কালচারের ব্যাপার থাকে। কে কতটুকু চ্যালেঞ্জ ফেইস করে জাতীয় দলে আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ম্যাচ খেলেই আসতে হবে - ‘এ’ দল হোক, এইচপি হোক। এখানে আসার আগে প্রিমিয়ার লিগে খেললেন, এখানে এসে দেখলেন পুরোপুরি ভিন্ন ঢংয়ের খেলা। আসলে এই জিনিসগুলোর উপরই নির্ভর করে ছেলেরা কীভাবে বড় হচ্ছে এবং গোটা ক্রিকেট স্ট্রাকচারটা।’
এ থেকে উত্তরণে কী করা যায়, তারও একটা গাইডলাইন পাওয়া গেল সালাউদ্দিনের কথায়, ‘এখন শেষ ৬ ম্যাচে বেশি রান হয়নি। ফলে নতুন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে। তখন তাকে আবার সুযোগ দিয়েই যেতে হবে, তাকেও তৈরি করতে হবে। অনেক সময় লাগবে, তারপর একটা সময় গিয়ে সে ভালো করবে। রিসোর্স আসলে কম আছে। তবে এর মধ্য থেকেই বের হয়ে আসতে হবে, কী নাই তা চিন্তা না করে।’
নতুন কাউকে খুঁজে বের করা মানে তো বর্তমান কাউকে বাদ দিতে হবে! মুশফিকুর রহিমের বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন হলো সংবাদ সম্মেলনে। সে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই পাশ কাটিয়ে গেলেন সালাউদ্দিন, ‘এটার উত্তর আমি কীভাবে দিব। (টিমের পার্ট) আমি তো টিমের সবকিছু না।’
তা বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের এই দৈন্যদশা কাটতে কত সময় লাগতে পারে, এমন প্রশ্ন যখন হলো, সালাউদ্দিন উত্তরটা ছড়িয়ে দিলেন সর্বব্যাপী, ‘একটা দেশে যদি অর্থনৈতিক দিক থেকে ভালো হয়, তাহলেই কি সব ভালো হবে? ভালো ডিসিশন, রাস্তাঘাট, ভালো লোকজন সবকিছুই লাগবে। যদি বলা হয় ছেলেরা চেষ্টা করছে না, তাহলে ভুল বলা হবে। কারণ আমরা কাছ থেকে দেখতেসি ছেলেরা চেষ্টা করছে। এর সাথে আমার ভালো কোচ লাগবে, ভালো কোচিং লাগবে, ভালো মাঠ লাগবে। সবকিছুই ভালো লাগবে। শুধু প্লেয়ারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সবাইকে মিলেই কাজ করতে হবে। প্রস্তুতির কথা বললে একটা জাতীয় দলের যেরকম প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার ছিল সিলেটে এসে সবাই সেটা পেয়েছি। তবুও আজকে ভালো করতে পারে নাই। এখানে কেউ একা কিছু করতে পারবে না। সবাই ভালো করতে হবে। সব মিলেই কিন্তু আমাদের আগাতে হবে।’
কিন্তু এই এগোনোর চেষ্টার গল্প তো অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশের এগোতে কত দিন লাগতে পারে, সেই প্রশ্নে আরেকবার আলোকপাত করার পর সালাউদ্দিন বললেন, ‘সবকিছুই দ্রুত করতে হবে। এখানে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই, কারণ সবাই দেখবে বাংলাদেশের ক্রিকেট আগায়নি। জাতীয় দল কেমন খেলছে, এটা দেখেই বোঝা যায় একটা দেশের ক্রিকেট এগোলো কি না।’
ক্রিকেটারদের পক্ষে দাঁড়িয়েই এরপর বললেন, ‘আমি কাছ থেকে দেখছি ছেলেদের মানসিকতা, ওয়ার্ক ইথিক্স বলেন, ইচ্ছা বলেন সব আছে। তাদের একা দোষ দিলে হবে না। এর বাইরে আরও অনেক কিছু আছে যা আমি সবসময় বলতে পারি না বা বলা উচিতও না। এখন এটা কত দ্রুত ঠিক করা যায় সেটা আমাদের দেখতে হবে।’