২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এক সিরিজ। কিন্তু তার আগেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। যে বিমানে দুদিন পর উঠার কথা পুরো দলের, তার আগেই সেই বিমানে চড়ে বসলেন দুই পেসার— নাহিদ রানা আর তাসকিন আহমেদ। হাতে ব্যাট-বল নয়, তাদের সঙ্গী পুরোনো চোটের রিপোর্ট। গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া— তবে খেলতে নয়, চিকিৎসা নিতে।
আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক গভীর সংকটের গল্প। সে কারণেই প্রশ্নটাও উঠছে জোরোসোরে- কেন একটার পর একটা চোটের জন্য বারবার বিদেশমুখী হতে হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের?
কারা যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন?
গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইনের চোটে অস্ট্রেলিয়া সফর থেকেই ছিটকে গেছেন নাহিদ রানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তার আসল সমস্যাটা এই সাইড স্ট্রেইন নয়। নাহিদের দুই পায়ে রয়েছে ক্রনিক শিনবোন বা শিন স্প্লিন্টের পুরোনো সমস্যা— জাতীয় দলে আসার আগে থেকেই যা নিয়ে খেলে যাচ্ছেন তিনি।
তাসকিন আহমেদের সমস্যা আবার ভিন্ন— পুরোনো গোড়ালির ব্যথা, যার কারণে তাকে টানা খেলানো যায় না, দিতে হয় বিশ্রাম। আর এই দুজনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও, যিনি সিরিজ শেষে যাবেন হাঁটুর পুরোনো চোট দেখাতে।
তিনজন, তিনটা আলাদা পুরোনো চোট। কিন্তু গন্তব্য একটাই— বিদেশ।
আসল কারণ কী— টাকা নাকি সক্ষমতা?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— কেন সবকিছুতেই বিদেশমুখী হতে হয় ক্রিকেটারদের? অনেকের ধারণা, বিসিবির হাতে টাকার অভাব নেই, তাই বিদেশে পাঠাতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু বাস্তবতা হলো, আসল কারণটা টাকার নয়— সক্ষমতার। নির্দিষ্ট করে বললে, স্পোর্টস মেডিসিনের সীমাবদ্ধতা।
ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা সাউথ আফ্রিকার মতো বড় ক্রিকেট বোর্ডে থাকে আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ। হাঁটুর চোটের জন্য একজন, কাঁধের জন্য আরেকজন, মাংসপেশির চোটের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন চিকিৎসক। কিন্তু বিসিবিতে এই পর্যায়ের বিশেষায়িত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। সেখানে আছেন শুধু সাধারণ স্পোর্টস ফিজিশিয়ানরা।
অবকাঠামোর ঘাটতি
বিসিবির মেডিকেল বিভাগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো— নিজস্ব কোনো স্পোর্টস ল্যাব নেই, নেই আলাদা স্পোর্টস রেডিওলজিস্টও, যিনি এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের রিপোর্ট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করবেন।
তাই চোট পরীক্ষা করাতে ক্রিকেটারদের যেতে হয় সাধারণ হাসপাতালে— যেখানে আর দশজন সাধারণ রোগীর মতোই তাদের পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের চোট আর সাধারণ মানুষের চোট এক নয়। শরীরের সামান্যতম সমস্যাও একজন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দরকার হয় আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর পরীক্ষার— যা এই মুহূর্তে দেশের সাধারণ ব্যবস্থায় সম্ভব হয়ে ওঠে না।
লিটন দাসের ঘটনা — সবচেয়ে বড় উদাহরণ
আর এই সংকটের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো লিটন দাসের কাফ মাসলের চোট। দেশে করা দুটি আলাদা পরীক্ষাতেও ধরাই পড়েনি তার চোট। অথচ সিঙ্গাপুরে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায়— সূক্ষ্ম একটা চোট আছে তার শরীরে।
যদিও বিসিবির মেডিকেল বিভাগ এই দাবি পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে করা স্ক্যানেও আসলে চোট ধরা পড়েছিল। সমস্যাটা ছিল শুধু এমআরআই টেকনিশিয়ানদের পজিশনিংয়ে— অর্থাৎ পরীক্ষার সময় সঠিক অবস্থানে না রাখার কারণে রিপোর্টে স্পষ্ট আসেনি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো— দেশের রিপোর্ট অনুযায়ী ৮ জুলাইয়ের মধ্যে সেরে ওঠার কথা থাকলেও, সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার প্রায় দুই সপ্তাহ পরও ঠিক হয়নি লিটনের চোট। ফলে নতুন করে চিকিৎসা শুরু করতে হয় তাকে, আর তিনি ছিটকে যান অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্ট থেকে। শেষ টেস্টেও তাকে নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
তাহলে সীমাবদ্ধতা কোথায়?
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়— বিষয়টা শুধু ডাক্তারদের ব্যক্তিগত দক্ষতার প্রশ্ন নয়। চোট নির্ণয় এখন আধুনিক প্রযুক্তি আর বিশেষায়িত জ্ঞানের বিষয়। একজন ক্রিকেটারের জন্য শুধু একজন ডাক্তার থাকলেই চলে না। প্রয়োজন স্পোর্টস ফিজিও, স্পোর্টস রেডিওলজিস্ট, নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আর আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা— সব একসঙ্গে।
এই পুরো পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে বিসিবির চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। মাঠে তৈরি হচ্ছে একের পর এক বিশ্বমানের ক্রিকেটার। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— সেই ক্রিকেটারদের সুস্থ রাখার ব্যবস্থাটাও কি একই গতিতে বিশ্বমানের হয়ে উঠছে? যতদিন না বিসিবির নিজস্ব বিশেষজ্ঞ প্যানেল, নিজস্ব ল্যাব আর আধুনিক স্পোর্টস মেডিসিন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, ততদিন হয়তো প্রতিটা চোটের জন্যই পাড়ি দিতে হবে হাজার মাইল।