বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হওয়া এই টুর্নামেন্ট শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সেই বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি পরিকল্পনা ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রভাবশালী সংস্থা— ফিফা ও উয়েফা। ফিফা সভাপতি বিশ্বকাপের মালিকানার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করছেন। তার এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপের বর্তমান কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা বলছে, ‘ফুটবল বিক্রি করার মতো সম্পদ নয়।’ এমনকি পরিস্থিতি চরমে গেলে ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ বর্জনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
তাহলে ফিফার পরিকল্পনা আসলে কী? কেন এত বিরোধিতা? আর এর ফলে বিশ্ব ফুটবলে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
কী পরিকল্পনা করেছেন ইনফান্তিনো?
ফিফার পরিকল্পনার মূল বিষয় হলো নতুন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা—‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই)। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এর মধ্যে থাকবে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং লাইসেন্সিং চুক্তি।
ফিফা এই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে চায়। বিনিময়ে পাওয়া অর্থ বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি সদস্য দেশ শুরুতেই পেতে পারে ২ কোটি ডলার। এরপর ২০৩৮ সালের মধ্যে আরও কয়েক ধাপে অর্থ দেওয়া হবে। ফিফার যুক্তি, এর মাধ্যমে বিশ্বের ছোট ও পিছিয়ে থাকা ফুটবল দেশগুলোও বড় আর্থিক সুবিধা পাবে।
কেন এখন এমন উদ্যোগ?
২০২৬ বিশ্বকাপ ফিফার জন্য বড় অর্থনৈতিক সাফল্য হতে যাচ্ছে। এই আসর থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের প্রত্যাশা করছে ফিফা। ইনফান্তিনোর দাবি, বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি অর্থ আয় করতে হবে। সেই অর্থ বিশ্বের সব দেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। তার মতে, ফুটবল এখন সত্যিকারের বৈশ্বিক খেলা। তাই এর লাভও বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছানো উচিত।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, হঠাৎ করেই কেন এমন পরিকল্পনা? অনেকে মনে করছেন, ফিফা বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে আরও বড় বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হতে চাইছে।
ছোট দেশগুলো কেন সমর্থন করতে পারে?
ফিফার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের ভোট পদ্ধতি। এখানে ‘এক দেশ, এক ভোট’ নীতি চালু রয়েছে। ইউরোপের ৫৫টি দেশ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করলেও ফিফার বাকি সদস্য দেশগুলোর বড় অংশ রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও কনকাকাফ অঞ্চলে। এসব অঞ্চলের অনেক দেশ ফুটবল উন্নয়নে অর্থ সংকটে ভোগে। তাই ফিফার দেওয়া কোটি কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি তাদের কাছে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইনফান্তিনোর হিসাবও এখানেই। ইউরোপের বড় দেশগুলো বিরোধিতা করলেও ছোট দেশগুলোর সমর্থনে পরিকল্পনা পাস করানো সম্ভব হতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা কেন আগ্রহী?
বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া ইভেন্ট। এর সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ—সবকিছু থেকেই বিপুল অর্থ আসে। বিনিয়োগকারীরা এই বিশাল বাজারে অংশ নিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এখানেই তৈরি হয়েছে মূল শঙ্কা। সমালোচকদের ভয়, বিনিয়োগকারীরা যদি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে ফুটবলের চেয়ে লাভই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। ভবিষ্যতে টিকিটের দাম বাড়তে পারে, বিশ্বকাপ আরও ঘন ঘন আয়োজনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে, এমনকি টুর্নামেন্টের আকার ও আয়োজনের স্থানও অর্থনৈতিক লাভের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হতে পারে।
উয়েফার এত আপত্তি কেন?
ফিফার এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বিরোধী উয়েফা। কারণ ইউরোপই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল। বিশ্বের সেরা ক্লাব, লিগ এবং অসংখ্য তারকার অবস্থান ইউরোপে। উয়েফার অধীনে রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, বুন্দেসলিগা ও সেরি আ’র মতো বড় প্রতিযোগিতা। তাদের আশঙ্কা, ফিফা বিশ্বকাপের নিয়ন্ত্রণ আরও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে ফুটবলের ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর আগে ২০২১ সালে দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েও উয়েফার বিরোধিতার মুখে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল ফিফাকে। এবারও উয়েফা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বকাপ বয়কট হলে কী হবে?
যদি ইউরোপের দেশগুলো সত্যিই বিশ্বকাপ বর্জন করে, তাহলে টুর্নামেন্টের মান ও আকর্ষণ বড় ধাক্কা খাবে। কারণ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ ইউরোপের দলগুলো। তবে উয়েফার জন্যও এটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ ফিফা থেকে আলাদা হয়ে নতুন কোনো প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সহজ নয়।
কারা বিনিয়োগ করতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মতো অঞ্চলের বড় বিনিয়োগকারীরা এই পরিকল্পনায় আগ্রহী হতে পারে। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলে বড় বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বকাপ আয়োজন, ক্লাব মালিকানা ও ফুটবল অবকাঠামোয় এসব দেশের ভূমিকা এখন গুরুত্বপূর্ণ। ফিফার নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এসব অঞ্চলের বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
ফিফা সদস্য দেশগুলোকে পাঠানো চিঠিতে ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভোট বা সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
এখন উয়েফা চেষ্টা করবে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকিকে আরও শক্তিশালী করতে। এমনকি তারা ফিফা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করতে পারে। এরপর বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোকেও ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে রাজি করানোর চেষ্টা করবে।
তবে এই কাজ সহজ হবে না। কারণ অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়টি ছোট দেশগুলোর জন্য অনেক বড় ব্যাপার। অনেক দেশের কাছে এই অর্থ এক জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হতে পারে।
তবে ইউরোপ ছাড়া বিশ্বকাপের আকর্ষণ অনেক কমে যাবে। তাই উয়েফার হাতেও বড় চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
যদি উয়েফা সত্যিই ফিফা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তারা দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কিছু দেশের সঙ্গে মিলে নতুন একটি বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের চেষ্টা করতে পারে। এমন একটি টুর্নামেন্ট বাণিজ্যিকভাবেও আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে এত বিরোধিতা, সমালোচনা ও বিতর্কের কারণে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা ১৯ সেপ্টেম্বরের আগেই থেমে যেতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।
পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে কি ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি পদে টিকে থাকতে পারবেন?
রাজনীতির একটি সাধারণ নিয়ম হলো—সমর্থনের সংখ্যা ঠিকভাবে হিসাব করতে পারা। ইনফান্তিনো জানেন, ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তার অবস্থান শক্তিশালী। কারণ এখন পর্যন্ত তার কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী নেই এবং বিশ্বের অনেক দেশের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে সেটি ইনফান্তিনোর জন্য বড় ধাক্কা হবে। এতে তার নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সামনে আসার সুযোগ পেতে পারেন। তাই এই পরিকল্পনা এখন শুধু বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ নয়, ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
যদি তিনি সফল হন, তাহলে ফিফায় তার ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু ফিফা ও উয়েফার মধ্যে সম্পর্ক আগের মতো থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আগামী কয়েক মাস বিশ্ব ফুটবলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কারণ এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ফিফা নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বের ওপর পড়তে পারে।



