স্পেনকে ১২ বছর পর ইউরোর ফাইনালে তোলা কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আপাতত দিনে তিন-চার ঘণ্টা ঘুমিয়েই সন্তুষ্ট হচ্ছেন।
গত সপ্তাহে রেডিও স্টেশন কোপের সঙ্গে কথোপকথনে ৬৩ বছর বয়সী বলেছেন, ‘আমাদের হাতে খুব কম সময় থাকে। আমি খুব সকালে উঠি, আমার রুটিন মেনে চলি, ব্যায়াম করি। সকাল ৯ টা থেকে কাজ শুরু করে রাতা ১ টা, ২টা, ৩টা, ৪টা পর্যন্ত কাজ করি। ফলে খুব একটা ঘুমাই না- কোনোদিন তিন ঘণ্টা, কোনোদিন চার, কোনোদিন পাঁচ। খাওয়ার পর ছোট একটা ঘুম দিতে পারেই, কিন্তু খুব বেশিক্ষণ না।’
রেডিও শো-র উপস্থাপক হুয়ানমা কাস্তানো ধারণা করছিলেন, টুর্নামেন্টের চাপ ও দুশ্চিন্তাই হয়তো তাঁকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।
কিন্তু সে ভুল ভেঙে দিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে, ‘মোটেও না। অনেক কাজ করতে হয়। ম্যাচের মাঝে বিরতি খুব কম। আমাদের খেলা বিশ্লেষণ করতে হয়, প্রতিপক্ষের খেলাও করতে হয়। দলের আলোচনা ঠিক করতে হয়, অনুশীলন ঠিক করতে হয়, প্রত্যেক খেলোয়াড় নিয়ে আলাদা কাজ করতে হয়…’
জেনেটিক কারণে কিছু মানুষের স্বাভাবিক মানুষের মতো না ঘুমালেও চলে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কারও কারও জন্য চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। নেপোলিয়ান দিনে মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমাতেন বলে শোনা যায়। থমাস এডিসন, মার্গারেট থ্যাচার বা ডোনাল্ড ট্রাম্পও নাকি খুব কম ঘুমান।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, দে লা ফুয়েন্তে এমন নন। স্বাভাবিক সময়ে ভালোই ঘুমান তিনি। কিন্তু টুর্নামেন্ট চলাকালে রাতে খুব কম ঘুমান। দুপুরের খাবারের পর বা বাসে আরেকটু ঘুম দেন।
ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এত কম ঘুম ক্ষতিকর। স্বাস্থ্যের জন্য, কার্যকারিতার জন্যও।
এমন কম ঘুমের পর কোচের যে হালই হোক না কেন, স্পেনের খেলোয়াড়রা টুর্নামেন্টে খেলছেন দুর্দান্ত। নকআউট পর্বে জর্জিয়াকে ৪ গোল দেওয়ার পর জার্মানি ও ফ্রান্সকে ২-১ হারিয়েছে স্পেন। এখন কোনো ম্যাচে পেনাল্টির ভাগ্য পরীক্ষা দিতে হয়নি তাদের।
খেলোয়াড়ি জীবনে লেফটব্যাকের ভূমিকা পালন করা দে লা ফুয়েন্তে অ্যাথলেটিক বিলবাওর হয়ে দুবার লা লিগা জিতেছেন। নব্বইয়ের দশকে কোচিংয়ে ঢুকলেও কোনো দলের মূল কোচ হতে বহু সময় লেগেছে তাঁর। সেটাও স্পেনের তৃতীয় স্তরে আলাভেসের দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাত্র ১১ ম্যাচে।
তাঁর ক্যারিয়ারের বাক বদলেছে ২০১৩ সালে। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। দুই বছর পর রদ্রি, মিকেল মেরিনো ও মার্কো আসেনসিওদের নিয়ে স্পেনকে অণূর্ধ-১৯ ইউরো জেতান লা ফুয়েন্তে।
২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো জিতেছেন দানি ওলমো, মিকেল ওয়ারসাবাল ও উনাই সিমনদের নিয়ে। প্রায় সে দলের সঙ্গে পেদ্রি ও কুকুরেয়াকে যুক্ত করে ২০২১ টোকিও অলিম্পিকে জিতেছেন রূপা। এর পাশেই মাদ্রিদে স্প্যানিশ ফেডারেশনে অন্য কোচদের শেখানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। ২০১৭ সালে তাঁর কাছে ক্লাস করা ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বোর্নমাউথ কোচ ইরোলা এবং আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জেতানো কোচ লিওনেল স্কালোনি।
কিন্তু দে লা ফুয়েন্তেকে কোচ করার চিন্তা লা লিগার কোনো ক্লাবের মাথায় আসেনি, তিনি নিজেও চেষ্টা করেননি। এমনকি জাতীয় দলেও তাঁকে কেউ চায়নি। ২০২২ বিশ্বকাপে চরম ব্যর্থতার পর সে সময়কার বোর্ড সভাপতি ভিন্ন পথে হাঁটতে চান।
২০২২ এর ডিসেম্বরে দায়িত্ব পাওয়ার পর দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ‘আমি একদম আশা করিনি। আমি ভেবেছিলাম লুইস এনরিকেই চালিয়ে যাবে। কিন্তু রুবিয়ালেস সবসময় আমাকে সমর্থন দিয়েছেন এবং বলেছেন তার চাওয়া আমি কোচ হই।’
নিজের প্রথম ঘোষিত দলে সের্হিও রামোসকে না ডাকার পরই স্প্যানিশ মিডিয়ার আসল রূপ দেখেছেন এই কোচ। মাদ্রিদ-ভিত্তিক সাংবাদিকেরা সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন।
ইউরোর বাছাইয়ে স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে বসে স্পেন। সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বোর্ডের লোকজনও দে লা ফুয়েন্তের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল। কিন্তু দে লা ফুয়েন্তের নিজের ওপর আস্থা ছিল, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নিজের প্রসেসে আস্থা রাখাই তো তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে।
২০২৩ সালে অবশ্য ভয়ংকর এক ভুল করে বসেন দে লা ফুয়েন্তে। স্পেনের নারী দল বিশ্বকাপ জয়ের পর ইয়ানি এরমোসোকে চুমু দিয়ে বসেন বোর্ড সভাপতি রুবিয়ালেস। এমন কাণ্ডের পরও পদ থেকে না সরার ঘোষণা দেন। এবং এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন দে লা ফুয়েন্তে। এ জন্য পরে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
এমনিতে বন্ধুসুলভ আচরণের জন্য পরিচিত হলেও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেও দুবার ভাবেন না। বয়সভিত্তিক দলে এক সঙ্গে কাজ করার সুবাদে দানি সেবায়োসকে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু জাতীয় দলে বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে বারবার ঝামেলা হচ্ছিল বলে তাঁকে বাদ দিয়েছেন। মাদ্রিদ মিডিয়ার চাপের পরও ব্রাহিম দিয়াসকে দলে ডাকেননি, যিনি পরে মরক্কো জাতীয় দলে খেলছেন। প্রতিভায় পিছিয়ে থাকলেও দলের জন্য ভালো হবে ভেবে বদলে আয়োজে পেরেজকে নিয়েছেন। বয়সভিত্তিক দলের মতো জাতীয় দলেও বন্ধন সৃষ্টিতে নজর দিয়েছেন তিনি। সে বন্ধনে সাংবাদিকরাও অংশ হন মাঝে মাঝে।
ডিফেন্ডার লাপোর্ত বলেছেন, ‘একজন খেলোয়াড়ের জন্য সুরক্ষিত থাকার অনুভূতিটা জরুরি।’ ১৬ বছরের লামিন ইয়ামালকে তাই খুব সতর্কতার সাথে সামলান সতীর্থ, কোচ ও ফেডারেশন স্টাফরা। গত মৌসুমে মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হোসেলু যেমনটা বলেছেন, ‘প্রথম দিন দলে যোগ দিয়ে আমি তাঁকে বলেছি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৈনন্দিন জীবন ও দলের মধ্যে একতা। সুসম্পর্ক ও প্রতিযোগিতামূলক করা। তিনিও একমত হয়েছেন। তিনি এখানে একটা পরিবার গড়েছেন, এটাই আমাদের এতদূর এখানে এনেছে।’
দে লা ফুয়েন্তে হয়তো চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারছেন না, তবে আজ রাতে ইংল্যান্ডকে হারাতে পারলে সেটা পুষিয়ে নেওয়ার কথাও হয়তো ভুলে যাবেন তিনি।