রোনালদোকে তাড়ানো কোচের জায়গা নিচ্ছেন রোনালদোরই ক্লাবের একজন

এরিক টেন হাগ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দুটি শিরোপা জিতেছেন বটে, তবে নতুন যুগের সূচনার ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শুরু করা কোচের সিভিতে শুধু এফএ কাপ আর লিগ কাপকে বড় করে দেখানোর সুযোগ সে অর্থে থাকে না। বরং ম্যান ইউনাইটেডের দায়িত্বে থাকার দুই বছরে টেন হাগের সবচেয়ে বড় ‘হাইলাইট’ যদি বলতে হয়, সে ক্ষেত্রে সম্ভবত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ম্যান ইউনাইটেড ছাড়তে বাধ্য করার কথাই আসবে।

রোনালদো ম্যান ইউনাইটেড ছেড়ে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের আল নাসরে ঠাঁই গেড়েছেন তা-ও প্রায় বছর দুয়েক হতে চলল, এর মধ্যে ম্যান ইউনাইটেড রোনালদোর অভাব কাটিয়ে উঠলেও রোনালদোকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া আর হয়নি টেন হাগের। শেষ পর্যন্ত গতকাল তাঁকে ছাঁটাই-ই করেছে ইংলিশ ক্লাবটি।

আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে টেন হাগের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, ইউনাইটেডেরই সাবেক স্ট্রাইকার রুদ ফন নিস্তলরুইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন কোচের খোঁজ তো চলছে ম্যান ইউনাইটেডের। সেই নতুন কোচ কে হতে যাচ্ছেন?

ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকে দলবদলের বাজারে স্বনামধন্য সাংবাদিক ডেভিড অর্নস্টাইনের প্রতিবেদন বলছে, সে খোঁজে রোনালদোরই প্রথম ক্লাব স্পোর্তিং ক্লুব দো পর্তুগালে চোখ পড়েছে ম্যান ইউনাইটেডের। স্পোর্তিং সিপির হয়ে দারুণ সাফল্য আর আকর্ষণীয় ফুটবলে ইউরোপের নজর কাড়া পর্তুগিজ কোচ রুবেন আমোরিমকে আনতে পর্তুগিজ ক্লাবটির সঙ্গে ইউনাইটেডের আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্নস্টাইন। দলবদলের বাজারে আরেক বিখ্যাত সাংবাদিক ফাব্রিসিও রোমানো-ও একই খবর জানিয়েছেন।

পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের কাছ থেকে পাওয়া খবর জানিয়ে অ্যাথলেটিক লিখেছে, আমোরিম এরই মধ্যে ইউনাইটেডের কোচ হতে তিনি সম্মত আছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। স্পোর্তিংয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আমোরিমকে আনতে ১ কোটি ইউরো রিলিজ ক্লজ পরিশোধে ম্যান ইউনাইটেডও রাজি বলে লেখা আছে প্রতিবেদনে।

যদিও এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিসবনভিত্তিক পর্তুগিজ সাংবাদিক পেদ্রো সেপুলভেদা লিখেছেন, আমোরিম মৌসুমের মাঝপথে স্পোর্তিং ছাড়তে খুব একটা ইচ্ছুক নন, তবে প্রিমিয়ার লিগে কোচিং করার ইচ্ছাও তাঁর অনেক বেশি। শোনা যাচ্ছে, আমোরিম এই মৌসুমের মাঝপথে ইউনাইটেডে যেতে রাজি না হলে সেক্ষেত্রে তাঁর জন্য অপেক্ষাও করতে পারে ইউনাইটেড, তখন মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্বটা সামলে যাবেন নিস্তলরুই। তবে তাঁর রিলিজ ক্লজের অঙ্কটা নিয়ে ভিন্ন খবর জানিয়েছেন পেদ্রো – অঙ্কটা নাকি ২ কোটি ইউরো।  

ইংলিশ ফুটবলে অবশ্য আমোরিমকে নিয়ে গুঞ্জন নতুন নয়। ইয়ুর্গেন ক্লপ দায়িত্ব ছাড়ার পর লিভারপুলের কোচ হওয়ার গুঞ্জনে একটা সময় তাঁর নাম বেশ জোরেশোরে শোনা গিয়েছিল। সেটা না হওয়ার পর ওয়েস্ট হ্যামের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে তো একবার পর্তুগাল থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়ায় বেশ সমালোচিতও হয়েছিলেন আমোরিম, যে কারণে পরে স্পোর্তিংয়ের সমর্থকদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। এবার ইউনাইটেডের সঙ্গে গুঞ্জনে জড়িয়ে গেছে ৩৯ বছর বয়সী এই কোচের নাম।

খেলোয়াড়ি জীবনে খুব একটা নাম করতে না পারলেও পর্তুগালের জার্সিতে ১৪টি ম্যাচ খেলা সাবেক এই মিডফিল্ডার কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সফল। ব্রাগার রিজার্ভ দল থেকে পদোন্নতি পেয়ে মূল দলের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ক্লাবটিকে পর্তুগিজ লিগ কাপ জিতিয়েছেন, এরপর ব্রাগার মূল দলে চার মাস দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায়ই দায়িত্ব নেন স্পোর্তিংয়ের। তাঁকে পেতে কোনো কোচের জন্য পর্তুগিজ রেকর্ড ১ কোটি ইউরো রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করেছে স্পোর্তিং – এটাই কোচিংয়ে আমোরিমের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ দেয়।

রোনালদোর প্রথম ক্লাবটির দায়িত্ব নিয়ে মাঝে অনেক বছরে বেনফিকা আর পোর্তোর দাপটের মধ্যে বলতে গেলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া স্পোর্তিংকে চেনা পথে ফিরিয়েছেন। মার্চে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এর পরের মৌসুমেই ব্রাগাকে হারিয়েই পর্তুগিজ লিগ কাপ জেতান। সেই মৌসুমেই স্পোর্তিংকে ১৯ বছরে প্রথম লিগ শিরোপা এনে দেন। এর মধ্যে তাঁর চুক্তি নবায়ন করে রিলিজ ক্লজ ৩ কোটি ইউরো করে নেয় স্পোর্তিং।

পরের মৌসুমে স্পোর্তিং লিগে রানার্সআপ হলেও পর্তুগিজ লিগ কাপ জিতেছে, চ্যাম্পিয়নস লিগেও ২০০৮-০৯ মৌসুমের পর প্রথমবার তাদের নকআউট রাউন্ডে নিয়ে যান আমোরিম। যদিও সেখানে ম্যান সিটির কাছে ৫-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে স্পোর্তিং।

মাঝে এক মৌসুম খারাপ কেটেছে, যেটির পেছনে মৌসুমের দলবদল পরিকল্পনা ঠিকভাবে করতে না পারার দায় নিজের কাঁধেই নেন আমোরিম। তবে পরের মৌসুমে দলে টেনে আনেন গত দুই মৌসুমে ইউরোপের নজরে পড়া স্ট্রাইকার ভিক্তর গিয়রকেরেশকে নিয়ে আসেন। সে মৌসুমে গিয়রকেরেশের নৈপুণ্যেই আবার লিগ জেতে স্পোর্তিং। শিরোপা উদ্‌যাপনের মধ্যেই আমোরিম ঘোষণা দিয়ে দেন, পরের মৌসুমে, অর্থাৎ এই মৌসুমে তিনি স্পোর্তিংয়েই থাকবেন।  

গিয়রকেরেশ ছাড়াও স্পোর্তিংয়ে আমোরিমের অধীনে খেলেই ইউরোপে নাম কুড়িয়েছেন পেদ্রো পোরো (বর্তমানে টটেনহ্যামে), জোয়াও পালিনিয়া (বায়ার্ন মিউনিখে), গনসালো ইনাসিও, উসমান দিয়ামন্দে, মাথেউস নুনেস (উলভারহ্যাম্পটন), নুনো মেন্দেস (পিএসজি), মানুয়েল উগার্তেরা (ম্যান ইউনাইটেড)।

প্রতিভা তুলে আনা কিংবা খুঁজে বের করার সামর্থের পাশাপাশি আমোরিমকে ইউরোপের কোচদের মধ্যে ‘এলিট’ শ্রেণিতে তুলে এনেছে তাঁর খেলানোর ধরন। জয় বের করে নেওয়ার সামর্থ আর সোজাসাপটা কথা বলার অভ্যাসের কারণে তাঁকে ‘মিনি মরিনিও’ ডাকা হলেও আমোরিমের খেলানোর ধরন মরিনিওর পুরো বিপরীত। মূলত বল দখলে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবলই খেলান আমোরিম। তাঁর পছন্দের ফর্মেশন সাধারণত তিন ডিফেন্ডার-ভিত্তিক, রক্ষণে ‘হাইলাইন ডিফেন্স’ রাখতে পছন্দ করেন তিনি।

পরিসংখ্যান বলছে, পর্তুগিজ প্রিমেইরা লিগাতে তাঁর দল আক্রমণের দিক থেকে যেমনি সেরা দলগুলোর একটি, রক্ষণেও তা-ই। তাছাড়া হাতে থাকা খেলোয়াড়ের ধরন বিবেচনায় নিয়ে কৌশলে বদল আনতেও দক্ষ আমোরিম।  সব মিলিয়ে লিভারপুল, ওয়েস্ট হ্যামের নজরে থাকা কোচের দিকে নজর না যাওয়ার তো কোনো কারণই নেই।

আমোরিমের বাইরে অবশ্য ইংলিশ লিগে আলোচিত কিছু নামও গুঞ্জনে জড়িয়েছে ইউনাইটেডের সঙ্গে। দ্য অ্যাথলেটিক জানাচ্ছে, গত মৌসুমের শেষেই টেন হাগকে ছাঁটাই করার কথা ভেবেছিল ইউনাইটেড, কিন্তু তখন তাঁর বিকল্প হিসেবে যাঁদের ভেবে রেখেছিল সেই টমাস টুখেল (কদিন আগে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছেন) কিংবা ব্রেন্টফোর্ডের টমাস ফ্রাঙ্ক বা ইপসউইচের কিয়েরান ম্যাককেনার কেউ ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিতে তখন রাজি না হওয়াতেই টেন হাগকে রেখে দেওয়া হয়। গুঞ্জনে ম্যাককেনা, ফ্রাঙ্ক, চেলসির সাবেক কোচ গ্রাহাম পটার, ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ গ্যারেথ সাউথগেট, নিউক্যাসলের কোচ এডি হাওয়ের নামও জড়িয়ে আছে। তবে আমোরিমকে নিয়ে গুঞ্জনটারই আওয়াজ সবচেয়ে বেশি।