ফ্রেঞ্চ লিগে পারি সাঁ জার্মেইয়ের (পিএসজি) দাপট এখন পুরোনো গল্প। ইনভেস্ট ফার্মের আড়ালে কাতার ২০১১ সালে মালিকানা বুঝের পর থেকেই লিগ আঁতে দলটির দাপট। ফ্রেঞ্চ লিগ জিততে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, এজেকিয়েল লাভেজ্জি, মার্কো ভেরাত্তি, থিয়াগো সিলভা, লুকাস মৌরা বা হাভিয়ের পাস্তোরেরাই যথেষ্ট ছিলেন।
কিন্তু কাতার স্পোর্টস ইনভেস্ট মালিকানা কেনার পর থেকেই ক্লাবটির শয়নে-স্বপনে ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব। সে যাত্রায় বিশ্বরেকর্ড গড়ে নেইমার, সে বিশ্বরেকর্ডের ধাক্কা সামলানোর আগেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অঙ্কে কিলিয়ান এমবাপ্পে, এমনকি লিওনেল মেসিকেও টেনেছিল তারা। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছে তারা। অবশেষে, ২০২৫ এ এসে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে পিএসজির। আর কী আশ্চর্য, সে শিরোপা এনে দিয়েছেন, একসময় হেলায় হারিয়ে যেতে বসা উসমান দেম্বেলে।
প্যারিসের ক্লাবটির যাত্রার সঙ্গে অনেকটা মিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যানচেস্টার সিটির। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন ক্লাবটিও পিএসজির মতো নিজেদের পরাশক্তি বানানোর লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে।
ঘরোয়া লিগে দাপট দেখালেও ইউরোপে এই অর্থের বিনিয়োগ উঠে আসছিল না কারোরই। অবশেষে ২০২৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে সেই বাধা কাটিয়েছে সিটি। এতে পিএসজি একা হয়ে পড়ে। চলতি মৌসুমেও তাই প্রায় ২৪ কোটি ইউরো খরচ করেছে দলবদলে। গত ১৪ বছরে ১৯০ কোটি ইউরো খরচ করার পর অবশেষে ইউরোপে সাফল্য পেল প্যারিসের ক্লাব।
যাত্রাটা বেশ দীর্ঘ ছিল। ইব্রাহিমোভিচের মতো শীর্ষ স্ট্রাইকারও থিয়াগো সিলভার মতো ডিফেন্ডার থাকার পরও ইউরোপে যে শুধু দুই-তিনজন তারকা দিয়ে হয় না, সেটা শুরুতেই বুঝতে পারে দলটি। তাই দিনে দিনে এই দলে যোগ হয়েছেন এডিনসন কাভানি, ডেভিড লুইজ, মারকিনিওসরা। অবশেষে আনহেল দি মারিয়ার মতো তারকাও টানতে সমর্থ হয় ক্লাবটি।
২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে ঘরের মাঠে বার্সেলোনাকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ইউরোপেও নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে জানান দেয়। কিন্তু ফিরতি লেগে নেইমারের জাদুতে ৬-১ গোলের অবিশ্বাস্য হার পিএসজিকে বড় এক শিক্ষা দেয়।
এরপর যা হয়েছে সেটা ৮ বছর পরও অবিশ্বাস্য ঠেকে। বার্সেলোনার কাছ থেকে নেইমারকে ছিনিয়ে নিতে ২২ কোটি ২০ লাখ ইউরো খরচ করে পিএসজি। অথচ তখনো পর্যন্ত দলবদলের বিশ্বরেকর্ড ছিল মাত্র ১০ কোটি ইউরোর একটু বেশি। একই দলবদলে রেয়াল মাদ্রিদকে টেক্কা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে টেনেছে ১৮ কোটি ইউরোতে।
একই দলবদলে নেইমারের শূন্যস্থান পূরণে দেম্বেলেকে কিনেছিল বার্সেলোনা, শর্তসাপেক্ষে যে দলবদলের খরচ সাড়ে ১৩ কোটি ইউরোতে ঠেকেছিল।
কিন্তু দুই দলেরই এমন বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়েছে। বার্সেলোনায় চোটজর্জর দেম্বেলে ৬ বছরে অর্ধেকেরও বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি, গোল করেছেন মাত্র ৪০টি। ওদিকে নেইমার-এমবাপ্পে গোলের পর গোল করেও পিএসজিকে শুধু ঘরোয়া শিরোপাই এনে দিয়েছেন, ইউরোপে আগের মতোই শূন্য হাত।
করোনার কারণে ফরম্যাট বদলে যাওয়া চ্যাম্পিয়নস লিগে ফাইনালে উঠলেও হানসি ফ্লিকের বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে পেরে ওঠেননি তাঁরা। ২০২১ সালে আবার চোখ কপালে তোলা এক দলবদলের জন্ম দেয় পিএসজি। লিওনেল মেসিও যোগ দেন পিএসজিতে। মাদ্রিদ থেকে যান সেন্টারব্যাক সের্হিও রামোস। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদের অধিনায়ক ছাড়াও দোন্নারুমা, ভাইনালদম ও আশরাফ হাকিমিকে টেনে নেয় ক্লাবটি।
কিন্তু এতেও ভাগ্য ফেরেনি। টানা দুই মৌসুম ব্যর্থতার পর ক্লাব ছেড়ে যান মেসি, চমক জাগিয়ে সৌদি আরবের পথ ধরেন নেইমারও। আর বার্সেলোনা থেকে ৫ কোটি ইউরোতে যোগ দেন দেম্বেলে। এমবাপ্পেকে ধরে রাখতে ফ্রান্স দলের আরেক সতীর্থ র্যান্ডল কোলো মুয়ানিকেও টেনে আনে ৮ কোটি ইউরোতে। আরও দুই ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড ব্র্যাডলি বারকোলা ও উগো একিতেকেও টানা হয়।
কিন্তু লাভ হয়নি। বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় পিএসজির। এবং ক্লাবে প্রায় ফ্রান্স জাতীয় দল বানিয়ে ফেলার পরও মৌসুম শেষে ক্লাব ছেড়ে বিদায় নেন এমবাপ্পে। একিতেকে ও মুয়ানিকেও পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাইরে।
এতেই যেন ভাগ্য ফেরে পিএসজির। এমবাপ্পের মতো গোলস্কোরারকে হারানোয় গোল করার দায়িত্ব দলের সবার মধ্যে ভাগ করে দেন কোচ লুইস এনরিকে। তবে নেতৃত্বটা দিয়েছেন দেম্বেলেই। বার্সেলোনায় ৬ বছরে ৪০ গোল করা ফরোয়ার্ড এই মৌসুমে করেছেন ৩৩ গোল, অন্যদের দিয়ে করিয়েছেন ১৫টি।
গতকাল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ইন্তার মিলানোর বিপক্ষে কোন গোল না করলেও সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন দুটি। চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রথম পাঁচ ম্যাচের তিনটিতেই হেরে বসা পিএসজির প্রথমবারের মতো ইউরোপের সেরা হওয়ার গল্পের শ্রেষ্ঠাংশে এখন দেম্বেলে। যে গল্পে মেসি, নেইমার ও এমবাপ্পেরা এখন ফুটনোট।