থ্রো-ইনটা ভারতের ছিল। বাংলাদেশের বক্সে থ্রো এল, সাদ উদ্দীন হেড করে বক্সের বাইরে বের করে দিলেন বলটা। এরপর যা হলো, ভারত তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না! এক, দুই, তিন – মোটে তিন পাসে বল বাংলাদেশের বক্সের সামনে থেকে ভারতের জালে!
এমন দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাক ইউরোপের ফুটবলে রেয়াল মাদ্রিদ বিখ্যাত করেছে জোসে মরিনিওর অধীনে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো-বেনজেমা-দি মারিয়াদের সময়ে। ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে মো সালাহ, সাদিও মানে, রবের্তো ফিরমিনোরা এমন কাউন্টার অ্যাটাকে মন ভরিয়েছেন বারেবার। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে আজ ভারত চোখ কচলে আবিষ্কার করল, তেমনই এক দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাকে গোল করে ফেলেছে বাংলাদেশ!
এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের এই ম্যাচে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে শেখ মোরসালিনের ওই গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে বাংলাদেশ।
গোলটা যেভাবে হলো, সেটার ভিডিও বারবার দেখলেও বুঝি মন ভরবে না! সাদ উদ্দিন হেড করে বলটা ক্লিয়ার করার পর বাংলাদেশ বক্সের বাইরে বল গেল মোরসালিনের পায়ে। প্রথমার্ধজুড়ে দারুণ কিছু ‘ফার্স্ট টাচ পাসে’ মুগ্ধতা ছড়ানো মোরসালিন প্রথম স্পর্শের দারুণ পাসে বল দিলেন বাঁ পাশে রাকিব হোসেনের কাছে। রাকিবের গায়ের সঙ্গে লেগে ছিলেন এক ডিফেন্ডার, তাঁর পাস আটকাতে মাঠের মাঝদিকে দৌড়াচ্ছিলেন ভারতের আরও দুই ডিফেন্ডার। কিন্তু তাঁরা তিনজন খেয়াল করেননি, পাসটা দেওয়ার পরই ভোঁ-দৌড়ে মাঠের মাঝ ধরে তাঁদের তিনজনকে এড়িয়ে উঠছেন আরেকজন – মোরসালিন!
রাকিব বল পায়ে দৌড়ালেন বাঁ প্রান্ত ধরে। দু-এক সেকেন্ড পরই কি মোরসালিনের উদ্দেশে থ্রু বাড়াতে পারতেন রাকিব? হয়তো! কিন্তু সে সময়ে না পাঠাতে পারলেও রাকিব বল ধরে এগোতে থাকলেন। এক সেকেন্ডের জন্য একটু থেমে পায়ের স্পর্শে বোকা বানালেন গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা ডিফেন্ডারকে। আরেকটু এগোলেন। ভারতের ডিফেন্ডার তাঁকে ধরে ফেলছিলেন, এমন সময়ে ডান পায়ের বাইরের অংশের দারুণ স্পর্শে বক্সের মাঝের দিকে থ্রু বাড়ালেন রাকিব। ভারতের তিন ডিফেন্ডারকে এড়িয়েই বল চলে গেল দৌড়ে উঠতে থাকা মোরসালিনের দিকে।
ভারত গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু প্রমাদ গুনলেন। পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু টাইমিং ঠিক হলো না তাঁর। মোরসালিন আগেই বলের দিকে ছুটলেন। কিন্তু এরপর আরেক দফা মুগ্ধ করলেন মোরসালিন। তিনি যখন বল পায়ে পাচ্ছেন, তাঁর বাঁ দিকে ভারতের ডিফেন্ডার, সামনে গোলকিপার। তাঁর দৌড়ের গতিপথও তাঁকে বাঁ দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। ফলে মোরসালিনের পক্ষে হঠাৎ দিক বদলে ডানে যেতে গেলে অ্যাঙ্কেল ভাঙার ঝুঁকি ছিল, আবার বলে একটা স্পর্শ নিয়ে যে বাঁ দিকে যাবেন, সেটার সুযোগ খুব বেশি রাখেননি ভারতের ডিফেন্ডাররা। মোরসালিন করলেন কী! মুগ্ধতা ছড়ালেন! প্রথম স্পর্শেই সরল কিন্তু চোখধাঁধানো ফিনিশিংয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন ভারতের গোলকিপারের পায়ের ফাঁক গলে।
এমন গোল সালাহর পায়ে দেখেছেন, কিংবা রোনালদো-বেনজেমার পায়ে। এমন গোল আজ দেখল ঢাকা স্টেডিয়াম, মোরসালিনের পায়ে।
গোলের পর আরও দুটি আক্রমণে রাকিবের ক্রসটা ঠিকঠাক হলে বাংলাদেশ ভয় ধরাতে পারত ভারতের রক্ষণে। এরপর অবশ্য বাংলাদেশই ধাক্কা খেল আগেই কাঁধে চোট পাওয়া ডিফেন্ডার তারিক কাজী ২৭ মিনিটে উঠে যেতে বাধ্য হওয়ায়। বল পায়ে স্বচ্ছন্দ্য তারিক উঠে যাওয়ায় ভারত যেন হাই প্রেসিংয়ের আমন্ত্রণ পেল। হাই প্রেসিংয়ের মুখে বাংলাদেশ গোলকিপার মিতুলের এক ভুলে বাংলাদেশ গোলও খেয়ে যেতে বসেছিল!
বক্সের ডানপাশে গিয়ে মিতুল বল হারালেন, এক পাস ঘুরে বল বক্সের ওপরের দিকে বাঁ পাশে গেল লালিয়ানজুয়ালা রাংটের কাছে। তিনি যখন শট নিলেন, বাংলাদেশের পোস্টে গোলকিপার নেই। কিন্তু বাংলাদেশের যে একজন হামজা আছেন! প্রথমার্ধজুড়ে রক্ষণের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে ছিলেন, ওই এক মুহূর্তে হামজা বনে গেলেন ঠিক তা-ই, তিনি বাংলাদেশের ফুটবলে আসার আগে যে কারণে ‘হামজা’ শব্দটা সংবাদের শিরোনামে জায়গা করে নিত – উদ্ধারকারী জাহাজ!
শেষ দিকে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের অ্যাক্রোব্যাটিক ভলিতে ভারতের বুকও কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন হামজা। বলটা পোস্টে বাতাস লাগিয়ে চলে যাওয়ায় হামজার টানা দুই ম্যাচে চোখধাঁধানো গোল পাওয়া হলো না। মানে, প্রথমার্ধ পর্যন্ত হলো না আর কী!