এক মুহূর্তের ‘রেয়াল মাদ্রিদ’ বাংলাদেশেই শেষ ভারতের ২২ বছরের ‘দাদাগিরি’

বাংলাদেশ ভালো খেলেছে? উত্তরটা ‘না’ হওয়ারই কথা বেশিরভাগ দর্শকের। দ্বিতীয়ার্ধ তো পুরোটাতে বলতে গেলে ভারতের নিয়ন্ত্রণেই ছিল!

ফুটবলের কোচিং ম্যানুয়েলে ‘সেকেন্ড বল’ যেটিকে বলা হয়, প্রথম দফায় কোনো দলের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি না যাওয়া বলকে দ্বিতীয় দফায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সে খেলায় বারেবারে ভারতই এগিয়ে গেছে।

হাভিয়ের কাবরেরার অধীনে বেশ কিছু ম্যাচে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বনে যাওয়া পাসিং ফুটবলের দেখা মেলেনি। পাসিং ফুটবল তো পরের কথা, বাংলাদেশ তিনটি পাসও একটানা খেলতে পেরেছে খুব কম সময়ে।  

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিবেশি দুই দেশের ম্যাচে গা জোয়ারি ফুটবল কিছুটা দেখা যাওয়ারই কথা, তা হয়েছে। প্রথমার্ধে একবার তো ধাক্কাধাক্কিও হয়েছে! এই গা জোয়ারি ফুটবলে শমিত সোম মাঝমাঠে তাঁর দক্ষতার পুরোটা দেখাতে পারেননি। নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দারুণ খেলা ৩৩ বছর বয়সী জামাল ভুঁইয়াকে ফিটনেস ইস্যুতেই কি না, এই ম্যাচে শুরুতে নামাননি বাংলাদেশ কোচ। পরে নামানোর পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি। জায়ান আহমেদ রক্ষণে তাঁর দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করলেও আক্রমণে নৈপূণ্য দেখানোর সুযোগ সেভাবে পাননি।  

তবে হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের জার্সিতে আগের সব ম্যাচের মতোই আজও মাঝমাঠে দাপট দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ দল হিসেবেই আক্রমণে সেভাবে দাপট দেখাতে পারেনি বলে হামজারও আজ আক্রমণে উঠে কিছু করে দেখানোর সুযোগ এসেছে কম, তবে রক্ষণে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের ‘উদ্ধারকারী জাহাজ’ বনে গিয়েছিলেন হামজাই। সাদ-মোরসালিন-রাকিব-সোহেলরাও ভালো খেলেছেন।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ খুব বেশি ভালো খেলেনি। কিন্তু এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে আজ ঢাকা স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ওসব নিয়ে বাংলাদেশের কোচের বাইরে আর কেউ সম্ভবত ওসব নিয়ে আর ভাবিত নন! হবেনই-বা কেন!

২২ বছর ধরে ভারতের বিপক্ষে ফুটবলে জয় না দেখার আক্ষেপ যে আজ ঘুচিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ! শেষ পর্যন্ত জয়ের ব্যবধান ১-০! কিন্তু অতটুকু বললে ওই গোলটাকে খাটো করেই দেখানো হয়! ১১ মিনিটে শেখ মোরসালিনের গোলটা যে দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাক থেকে করেছে বাংলাদেশ, সেটি দেখে যে এক মুহূর্তের জন্য বাংলাদেশকে ‘রেয়াল মাদ্রিদ’ই মনে হচ্ছিল!  

গোলটা যেভাবে হলো, সেটার ভিডিও বারবার দেখলেও বুঝি মন ভরবে না! থ্রো-ইনটা ভারতের ছিল। বাংলাদেশের বক্সে থ্রো এল, সাদ উদ্দীন হেড করে বক্সের বাইরে বের করে দিলেন বলটা। এরপর যা হলো, ভারত তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না! এক, দুই, তিন – মোটে তিন পাসে বল বাংলাদেশের বক্সের সামনে থেকে ভারতের জালে!

এমন দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাক ইউরোপের ফুটবলে রেয়াল মাদ্রিদ বিখ্যাত করেছে জোসে মরিনিওর অধীনে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো-বেনজেমা-দি মারিয়াদের সময়ে। ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে মো সালাহ, সাদিও মানে, রবের্তো ফিরমিনোরা এমন কাউন্টার অ্যাটাকে মন ভরিয়েছেন বারেবার। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে আজ ভারত চোখ কচলে আবিষ্কার করল, তেমনই এক দুর্ধর্ষ কাউন্টার অ্যাটাকে গোল করে ফেলেছে বাংলাদেশ!

সাদ উদ্দিন হেড করে বলটা ক্লিয়ার করার পর বাংলাদেশ বক্সের বাইরে বল গেল মোরসালিনের পায়ে। প্রথমার্ধজুড়ে দারুণ কিছু ‘ফার্স্ট টাচ পাসে’ মুগ্ধতা ছড়ানো মোরসালিন প্রথম স্পর্শের দারুণ পাসে বল দিলেন বাঁ পাশে রাকিব হোসেনের কাছে। রাকিবের গায়ের সঙ্গে লেগে ছিলেন এক ডিফেন্ডার, তাঁর পাস আটকাতে মাঠের মাঝদিকে দৌড়াচ্ছিলেন ভারতের আরও দুই ডিফেন্ডার। কিন্তু তাঁরা তিনজন খেয়াল করেননি, পাসটা দেওয়ার পরই ভোঁ-দৌড়ে মাঠের মাঝ ধরে তাঁদের তিনজনকে এড়িয়ে উঠছেন আরেকজন – মোরসালিন!

রাকিব বল পায়ে দৌড়ালেন বাঁ প্রান্ত ধরে। দু-এক সেকেন্ড পরই কি মোরসালিনের উদ্দেশে থ্রু বাড়াতে পারতেন রাকিব? হয়তো! কিন্তু সে সময়ে না পাঠাতে পারলেও রাকিব বল ধরে এগোতে থাকলেন। এক সেকেন্ডের জন্য একটু থেমে পায়ের স্পর্শে বোকা বানালেন গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা ডিফেন্ডারকে। আরেকটু এগোলেন। ভারতের ডিফেন্ডার তাঁকে ধরে ফেলছিলেন, এমন সময়ে ডান পায়ের বাইরের অংশের দারুণ স্পর্শে বক্সের মাঝের দিকে থ্রু বাড়ালেন রাকিব। ভারতের তিন ডিফেন্ডারকে এড়িয়েই বল চলে গেল দৌড়ে উঠতে থাকা মোরসালিনের দিকে।

ভারত গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু প্রমাদ গুনলেন। পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু টাইমিং ঠিক হলো না তাঁর। মোরসালিন আগেই বলের দিকে ছুটলেন। কিন্তু এরপর আরেক দফা মুগ্ধ করলেন মোরসালিন। তিনি যখন বল পায়ে পাচ্ছেন, তাঁর বাঁ দিকে ভারতের ডিফেন্ডার, সামনে গোলকিপার। তাঁর দৌড়ের গতিপথও তাঁকে বাঁ দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। ফলে মোরসালিনের পক্ষে হঠাৎ দিক বদলে ডানে যেতে গেলে অ্যাঙ্কেল ভাঙার ঝুঁকি ছিল, আবার বলে একটা স্পর্শ নিয়ে যে বাঁ দিকে যাবেন, সেটার সুযোগ খুব বেশি রাখেননি ভারতের ডিফেন্ডাররা। মোরসালিন করলেন কী! মুগ্ধতা ছড়ালেন! প্রথম স্পর্শেই সরল কিন্তু চোখধাঁধানো ফিনিশিংয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন ভারতের গোলকিপারের পায়ের ফাঁক গলে।

এমন গোল সালাহর পায়ে দেখেছেন, কিংবা রোনালদো-বেনজেমার পায়ে। এমন গোল আজ দেখল ঢাকা স্টেডিয়াম, মোরসালিনের পায়ে।

গোলের পর আরও দুটি আক্রমণে রাকিবের ক্রসটা ঠিকঠাক হলে বাংলাদেশ ভয় ধরাতে পারত ভারতের রক্ষণে। এরপর অবশ্য বাংলাদেশই ধাক্কা খেল আগেই কাঁধে চোট পাওয়া ডিফেন্ডার তারিক কাজী ২৭ মিনিটে উঠে যেতে বাধ্য হওয়ায়। বল পায়ে স্বচ্ছন্দ্য তারিক উঠে যাওয়ায় ভারত যেন হাই প্রেসিংয়ের আমন্ত্রণ পেল। হাই প্রেসিংয়ের মুখে বাংলাদেশ গোলকিপার মিতুলের এক ভুলে বাংলাদেশ গোলও খেয়ে যেতে বসেছিল!

বক্সের ডানপাশে গিয়ে মিতুল বল হারালেন, এক পাস ঘুরে বল বক্সের ওপরের দিকে বাঁ পাশে গেল লালিয়ানজুয়ালা রাংটের কাছে। তিনি যখন শট নিলেন, বাংলাদেশের পোস্টে গোলকিপার নেই। কিন্তু বাংলাদেশের যে একজন হামজা আছেন! প্রথমার্ধজুড়ে রক্ষণের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে ছিলেন, ওই এক মুহূর্তে হামজা বনে গেলেন ঠিক তা-ই, তিনি বাংলাদেশের ফুটবলে আসার আগে যে কারণে ‘হামজা’ শব্দটা সংবাদের শিরোনামে জায়গা করে নিত – উদ্ধারকারী জাহাজ!

শেষ দিকে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের অ্যাক্রোব্যাটিক ভলিতে ভারতের বুকও কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন হামজা। বলটা পোস্টে বাতাস লাগিয়ে চলে যাওয়ায় হামজার টানা দুই ম্যাচে চোখধাঁধানো গোল পাওয়া হলো না।

দ্বিতীয়ার্ধে ভারত নেমেছেই মাঝমাঠে একটা পরিবর্তন করে – ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নিখিল প্রভুর বদলে নামিয়েছে ‘জার্সি নাম্বার টেন’ নাওরেম মাহেশ সিংকে। নাওরেম দারুণ সব পাস দিয়েছেন, তিনি নামার পর হাফ স্পেইসের দখল দারুণভাবে নিয়ে নেয় ভারত। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই চলে যায় ভারতের কাছে। শুরুতেই দুবার গোল দেওয়ার খুব কাছে চলে যায় ভারত। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অনেকটা সময় তো বাংলাদেশ নিজেদের অর্ধেই বন্দী হয়ে ছিল।

তবে ভারত একেবারে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বাংলাদেশও এই অর্ধের মাঝামাঝির পর থেকে দু-তিনবার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাসটা ঠিকঠাক না হওয়ায় আক্রমণে খেই হারিয়েছে। এর মধ্যে ৮২ মিনিটে বাংলাদেশের একটা পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেন রেফারি, ভিএআর থাকলে যে আবেদনে নিশ্চিত পেনাল্টি পেত বাংলাদেশ। বক্সে ভারতের অধিনায়ক সান্দেশ ঝিঙ্গানের হাতে বল লাগলেও রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় সেটি।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ম্যাচে বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে হতাশায় পুড়তে হয়েছে বলে ম্যাচ যত শেষের দিকে এগিয়েছে, বাংলাদেশের সমর্থকদের স্নায়ুচাপ তত বেড়েছে। তবে আজ আর তেমন হয়নি।

আজ যে ইতিহাস গড়ার দিন! ২০০৩ সাফের পর ভারতকে আরেকবার হারানোর দিন।