কেপ ভার্দের গোলকিপার

কে এই ভোজিনিয়া? যার সঙ্গে আছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সম্পর্ক 

কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়া- ইতোমধ্যে পুরো বিশ্ব ফুটবলের আলোচিত নাম। স্পেনকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ম্যাচসেরা হয়েছেন ৪০ বছর বয়সী এই তারকা। কেপ ভার্দের এই গোলকিপার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমানে ট্রেন্ডিংয়ে আছেন। বিশ্বকাপে নামার আগে তার ইন্সটাগ্রামে মাত্র ৪৪ হাজার অনুসারী ছিল। তবে প্রথম ম্যাচে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত ভোজিনিয়ার অনুসারী দাঁড়িয়েছে ৬৮ লাখ, যা প্রতি মুহূর্তেই বেড়ে চলেছে। 

স্পেনের মতো দলকে বিশ্বকাপে রুখে দিয়ে এমন খ্যাতি পাবেন তা অনেকটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভোজিনিয়ার ফুটবলের আসার গল্প এবং তার নিজের নামকরণের গল্প জানলে আপনি অবাক হবেনই।  

কেপ ভার্দের এই তারকার প্রকৃত নামে ভোজিনিয়া শব্দটাই ছিল না। তার নামের পেছনে আছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার অনন্য এক সম্পর্ক।  

ভোজিনিয়া মাঠের খেলায় প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম করলেও তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মজার অধ্যায়টি মাঠে নয়, বরং তাঁর নামকে ঘিরে। কেপ ভার্দের এই গোলকিপারের জন্মের পর তাঁর নাম নিয়ে এক ধরনের ‘আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল’ লড়াই শুরু হয়েছিল, যার ফল নির্ধারণ করেছিলেন একজন সরকারি নিবন্ধন কর্মকর্তা।

ভোজিনিয়ার আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। কিন্তু তাঁর বাবা জে পেদ্রো প্রথমে এই নাম রাখতে চাননি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স করা হোর্হে ভালদানো ছিলেন ভোজিনিয়ার বাবার প্রিয় খেলোয়াড়দের একজন। দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভালদানো চারটি গোল করেছিলেন সেই টুর্নামেন্টে এবং তাঁর খেলা এতটাই মুগ্ধ করেছিল জে পেদ্রোকে যে তিনি নিজের ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ভালদানো’।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রেন্ডিংয়ে ভোজিনিয়া। ছবি: রয়টার্স

সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু বাধা আসে কেপ ভার্দের নাম নিবন্ধন দপ্তর থেকে। সে সময় বিদেশি নাম নিবন্ধনের অনুমতি ছিল না। ফলে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির নামে ছেলের নাম রাখার স্বপ্ন ভেঙে যায় জে পেদ্রোর।

তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে নতুন পথ দেখায়। ভালদানোর নাম বাতিল হওয়ার পর জে পেদ্রো নজর দেন সেলেসাওদের দিকে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার জোসিমার তাঁর দুর্দান্ত গোল ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারণে আলোচনায় ছিলেন। উত্তর আয়ারল্যান্ড ও পোল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর গোলগুলো তখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।

যেহেতু জোসিমার ছিলেন পর্তুগিজভাষী ব্রাজিলের খেলোয়াড়, তাই তাঁর নাম নিবন্ধনে কোনো বাধা ছিল না। শেষ পর্যন্ত ভোজিনিয়ার বাবা ঠিক করেন আর্জেন্টিনার ভালদানোর বদলে ব্রাজিলের জোসিমারই রাখবেন ছেলের নাম। আর সেই নামই পান ভবিষ্যতের কেপ ভার্দে অধিনায়ক ও গোলকিপার।

বছর চল্লিশ পরে এই গল্প আরও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের অভিষেকের আগে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফিফা) যখন ভালদানোকে জানায় যে একজন গোলকিপারের নাম একসময় তাঁর নামে রাখতে চাওয়া হয়েছিল, তখন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি অবাক হন।

প্রতিক্রিয়ায় হাসতে হাসতে ভালদানো বলেন, ‘আমি অবাক হয়েছি। তাঁর বাবা কেন আমার কথা ভাবলেন? সে সময় তো ম্যারাডোনা ছিল! তবুও আমি ভীষণ গর্বিত।’

জোসিমার দিয়াস নাম রাখা হলেও বিশ্ব ফুটবল এই নাম পরিচিত হয়নি কেন? সেই প্রশ্নের জবাবেও আপনি অবাকই হবেন।

‘জোসিমার’ বা ‘ভালদানো’ নয় ছোটবেলা থেকেই সবাই কেপ ভার্দের বর্তমান অধিনায়ককে ‘ভোজিনিয়া’ নামে ডাকতে শুরু করে। 

এভাবেই স্পেনকে রুখে দিয়েছেন ভোজিনিয়া। ছবি: রয়টার্স

ভোজিনিয়ার শৈশবে বেড়ে ওঠা তাঁর দাদির কাছে। কারণ তাঁর বাবা ছিলেন সামরিক বাহিনীতে এবং মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। ফলে তিনি বড় হয়েছেন মূলত দাদা-দাদির কাছেই।

পর্তুগিজ ভাষায় ‘ভোজিনিয়া’ শব্দের অর্থ ‘ছোট দাদি’ বা ‘আদরের দাদি’। এই নামটি তাঁর দাদা-দাদির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের স্মারক হয়ে ওঠে।

একটা সময় ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুতে অ্যাঙ্গোলায় গিয়ে ভোজিনিয়া একটি সমস্যায় পড়েন। সেখানে দলের আরেক গোলকিপারের নাম ছিল জোসিমার। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জার্সিতে ‘জোসিমার-২’ লিখবেন না। বরং কেপ ভার্দেতে যেই নামে সবাই তাঁকে চিনত, সেই ‘ভোজিনিয়া’ নামটিই ব্যবহার করবেন।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি যখন অ্যাঙ্গোলায় যাই, সেখানে আরেকজন গোলকিপারের নাম ছিল জোসিমার। আমি বলেছিলাম, জার্সিতে ‘জোসিমার-২’ লিখব না। কেপ ভার্দেতে সবাই যদি আমাকে ভোজিনিয়া নামে চেনে, তাহলে সেটাই থাকবে।”

বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর ভোজিনিয়া আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ম্যাচ শেষে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, “আমি আমার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে ভীষণ গর্বিত। এটা আমার জন্য এক বড় সম্মানের বিষয়।”

কান্নার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর দাদা-দাদি আর বেঁচে নেই। অথচ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের মুহূর্তে তিনি তাঁদের খুব মনে করছিলেন।

‘আমি কেঁদেছিলাম কারণ আমি দাদা-দাদির কাছে বড় হয়েছি। কয়েক বছর আগে তাঁরা মারা গেছেন। আমার জীবনে যা কিছু পেয়েছি, তার পেছনে তাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি’- ভোজিনিয়া। 

কেপ ভার্দের এই গোলকিপারের আবেগের আরেকটি কারণ ছিল তাঁর মা। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও খরচের কারণে তিনি বিশ্বকাপে ছেলের খেলা দেখতে যেতে পারেননি।

ভোজিনিয়া বলেন, ‘আমার মা-ও এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন ছিল, আমরা সময়মতো তা জোগাড় করতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম তিনি যেন এখানে থাকতে পারেন।’

বিশ্বকাপের আগে ভোজিনিয়া পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব সাভেসের হয়ে খেলেছেন। তবে বিশ্বকাপ শেষে তিনি নতুন বড় কোনো নামকরা ক্লাবে যোগ দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুটা অবশ্য করেছিলেন নিজ দেশ কেপ ভার্দের ক্লাব বাতুক এফসির হয়ে।