ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

আর্জেন্টিনা দেখাল ব্রাজিল কোথায় ব্যর্থ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ঘুরে দাঁড়ানোর এক মহাকাব্য রচনা করে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে আর্জেন্টিনা। বুধবার রাউন্ড অব ১৬-এ মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও মাত্র ১৪ মিনিটের ব্যবধানে ৩টি গোল করে নাটকীয় এক জয় তুলে নেয় মেসি, রোমেরো, এনসো ফার্নান্দেজরা। 

আলবিসেলেস্তেদের এই মহাকাব্যিক জয়ে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক আছে। আরও আছে মিশরের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের করুণ দৃশ্য, মেসির আনন্দাশ্রু, আর হতাশা নিয়ে মোহাম্মদ সালাহ’র বিদায়। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে মিশরের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিয়েছে, ব্রাজিল ঠিক কোথায় ব্যর্থ হয়েছে। আরেকটি হেক্সা মিশনে ব্রাজিলের ব্যর্থতার নেপথ্যের অন্তত তিনটি কারণ যেন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। চলুন সে আলোচনাতেই যাওয়া যাক।

দুই কোচের কৌশল

প্রথমেই চোখ রাখা যাক, রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল কোচের কৌশলের দিকে। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁরা যে পরিবর্তনগুলো নিয়েছেন সেগুলোর দিকে। মিশরের বিপক্ষে ৬৬ মিনিটে দল যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে তখন কোচ লিওনেল স্কালোনি লেফটব্যাক তাগলিয়াফিকোর জায়গায় অফেন্সিভ লেফট উইংগার নিকো গনজালেসকে এবং মিডফিল্ডার রদ্রিগোর পরিবর্তে লাউতারো মার্তিনেজকে নিয়ে আসেন। এরই সাথে ৪-১-৩-২ ফরমেশন থেকে আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩ ফরমেশনে চলে যায়।

এই একটি মাস্টারস্ট্রোকেই তিনটি সমস্যার সমাধান করেন স্কালোনি। প্রথমত লেফট উইংয়ে নিকোর গতির কারণে আক্রমণে ধার বাড়ে এবং রাইট উইং দিয়ে মিশরের কাউন্টার অ্যাটাকে উঠার প্রবণতা হ্রাস পায়, কেননা তাঁদের রাইট উইংগার তখন নিজেদের অর্ধে ডিফেন্সে মনোযোগী হতে বাধ্য হন। 

এদিকে হুলিয়ান আলভারেজের পরিবর্তে ফরওয়ার্ড লাইনে মেসির সাথে যুক্ত হন লাউতারো মার্তিনেজ। এতে আক্রমণের গতি, তীব্রতা দুটোই বাড়ে। অন্যদিকে, হুলিয়ান আলভারেজ মিডফিল্ডে ডান দিকে চলে আসায় রাইট উইং দিয়েও দলের আক্রমণ আরও ত্বরান্বিত হয় এবং মেসি আরও বেশি ওয়াইড এরিয়াতে স্পেসটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পান।

এরপর ৬৭ মিনিটে মিশর দ্বিতীয় গোল করার পর ৭৩ মিনিটে রাইটব্যাক পজিশনে মলিনার জায়গায় আসেন মন্তিয়েল। এর ফলে রাইট উইং দিয়ে আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং আর্জেন্টিনার দুটি গোলই আসে রাইট উইং দিয়ে বক্সের ভেতরে বাড়ানো ক্রস থেকে।

সব মিলিয়ে ১৪ মিনিটের ঝড়ে আর্জেন্টিনা যে তিনটি গোল আদায় করে নেয়, তাঁর মধ্যে দুটি গোলেরই যোগানদাতা দু’জন বদলি খেলোয়াড় লাউতারো মার্তিনেজ ও গনজালো মন্তিয়েল।

এবারে নরওয়ে ম্যাচে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির কয়েকটি পরিবর্তনের দিকে চোখ রাখা যাক। ম্যাচ যখন গোলশূন্য এবং বল পজেশনে ব্রাজিল অনেকটাই পিছিয়ে তখন কোচ ইনজুরি থেকে ফেরা নেইমারকে মাঠে নামালেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির পরিবর্তে। একইসাথে নেইমার যেহেতু অফ দ্য বল সিচুয়েশনে ডিফেন্সিভ লোড নেবেন না তাই লেফট উয়ংগার রায়ানের জায়গায় মিডফিল্ডে দানিলো সান্তোসকে আনা হলো। 

কিন্তু তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি, কেননা নেইমারকে ফ্রি খেলার সুযোগ করে দিতে ভিনিসিয়ুস ও এনড্রিককে ওয়াইড এরিয়াতে খেলতে বাধ্য করা হলো, অথচ অ্যাটাকিং থার্ডে বক্সের আশেপাশে ভিনি-এনড্রিকই ছিলেন দলের মূল অস্ত্র। তাতে করে ৭৯ মিনিটে গোল হজম করার পরও ব্রাজিলের আক্রমণে ধারতো বাড়েইনি, বরং অনেকাংশে তা কমেছে। 

তার চেয়েও বড় কথা, এই পরিবর্তনের ফলে মিডফিল্ড অনেক বেশি ওপেন হয়েছে। এছাড়া পুরো ম্যাচে সেভাবে বলের সাপ্লাই না পাওয়া আরলিং হলান্ড দু দুটি গোলের রসদ পেয়েছেন নেইমার নামার পরে। কেননা নেইমার আসার পর দলের ডিফেন্সিভ শেপ যেমন নষ্ট হয়েছে তেমনি আক্রমণেও ধার কমেছে।

দলগত পারফরম্যান্স

এবারে চোখ রাখা যাক দলের সার্বিক পারফরম্যান্সের দিকে। ব্রাজিলের সাথে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানটাতেই। নরওয়ের বিপক্ষে ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেল্লিরা ব্যক্তিগত দক্ষতার ঝলক দেখালেও দল হিসেবে, একটি ইউনিট হিসেবে ব্রাজিল খেলতে পারেনি। 

বিশেষ করে দলগতভাবে একজোট হয়ে প্রেস করে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো মুভ নরওয়ের বিপক্ষে সেভাবে চোখে পড়েনি। ম্যাচে নরওয়ের দুই তৃতীয়াংশ বল পজেশনের এটাই অন্যতম বড় কারণ। দলগত পারফরম্যান্সের অভাব যে একক দক্ষতা বা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দিয়ে পূরণ করা যায় না, নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের সার্বিক পারফরম্যান্স সেটা আরও একবার প্রমাণ করেছে।

অন্যদিকে, দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা যেভাবে মিশরের বিপক্ষে ফিরে এসেছে সেখানে ব্যক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলগত পারফরম্যান্স। হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফার্নান্দেজ, মন্তিয়েলরা আক্রমণে যতটা দলের জন্য নিবেদিত ততটাই তাঁরা খেলেছেন লিওনেল মেসির জন্য। কারণ দলের ভেতরে মেসি নিজের সেই জায়গাটা তৈরি করেছেন পারফরম্যান্স দিয়ে, ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলগত সাফল্যকে প্রাধান্য দিয়ে।

এই যেমন ম্যাচ শেষে পেনাল্টি মিসের বিষয়ে মেসি অকপটে বলেছেন, ‘পেনাল্টি মিসের পর আমি সত্যিই খুব রেগে গিয়েছিলাম, আবারও পেনাল্টি মিস করায় খুব হতাশ ছিলাম। ওই মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল পেলে খেলার মোড় ঘুরে যেত। কারণ আমরা ভালো খেলছিলাম।’

মেসির প্রতি সতীর্থরা কতটা নিবেদিত সেটা মন্তিয়েলের কথাতেই বোঝা যায়। ম্যাচে মেসিকে অ্যাসিস্ট দেওয়া প্রসঙ্গে মন্তিয়েল বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা প্রত্যেকেই মেসিকে অ্যাসিস্ট করতে চাই। আমি শুধু খুশি যে, এবারে তাঁকে অ্যাসিস্ট দেওয়ার পালা আমার ছিল।’ 

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স

এবারে আসার যাক ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে। এখানেও প্রথমেই বলতে হবে লিওনেল মেসির কথা। হ্যাঁ এটা ঠিক, মেসি খুব বাজে একটি পেনাল্টি নিয়েছেন এবং মিস করেছেন। ঠিক যেমনটা নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের ব্রুনো গিমারায়েস করেছেন। কিন্তু পেনাল্টি মিসের পর পুরো ম্যাচে দলের জন্য নিজেকে উজার করে দিয়ে খেলেছেন এলএমটেন। 

দলের প্রথম গোলটি তিনি করিয়েছেন, দ্বিতীয়টি নিজে করেছেন। ম্যাচে গোলে শট নিয়েছেন ৫টি এবং গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ২টি। তাঁর বাড়ানো ৫০টি পাসের ৪১টিই ছিল নিখুঁত। এছাড়া সতীর্থদের গোলে শট নেওয়ার মতো পাস দিয়েছেন ৬টি এবং ক্রস করেছেন ১২টি। 

মিশরের বিপক্ষের নিজের স্বভাবসুলভ খেলা থেকেও বেরিয়ে আসতে হয়েছে মেসিকে। ডান দিক বল নিয়ে আড়াআড়ি বক্সের ভেতরে ঢুকে শট নেওয়া বা পাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে এদিন খুব একটা সফল হননি তিনি। ফলে দ্বিতীয়ার্ধে মেসিকে বেশ ক’বার রাইট উইং দিয়ে ওপরে উঠে বক্সের ভেতর ঢুকে বাইলাইনের কাছ থেকে কাটব্যাক করতে দেখা গেছে। এমনই একটি মুভ থেকে ম্যাচের ৮২ মিনিটে আর্জেন্টিনা সমতা ফেরাতে পারতো যদি না লাউতারো মার্তিনেজের হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো।

নরওয়ে বিপক্ষে ব্রাজিলের অ্যাটাকিং থার্ডে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেল্লি ও রায়ান। কিন্তু সেটাও কোনোভাবেই মেসির সাথে তুলনা করার মতো নয়। তার ওপর, নেইমারের আগমনে মার্তিনেল্লি ও রায়ান চলে গেলেন বাইরে। একইসাথে ভিনিসিয়ুসকে নিচে নেমে ওয়াইড এরিয়াতে অপারেট করতে হলো, যাতে নেইমার ফ্রি রোলে খেলতে পারেন। ফলে, আক্রমণে অবদান রাখার সুযোগটা কমে গেল ভিনির।

শেষ কথা

শেষ একটি পয়েন্ট বলে আলোচনার ইতি টানবো। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর নেইমার বিপক্ষ দলের গোলকিপারের সাথে কথার লড়াইয়ে জড়ালেন। অথচ তখনও তাঁর দল ২-১ গোলে পিছিয়ে এবং ম্যাচের বড়জোর আর দেড় থেকে দু’মিনিট বাকি। 

এবার একবার চোখ রাখা যাক মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটিতে। হেডে বল জালে জড়ানোর পর ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো নিজেতো সেলিব্রেট করলেন-ই না, উলটো সতীর্থদের হাত দিয়ে ইশারা করলেন, বল সেন্টার স্পটে বসিয়ে দ্রুত খেলা শুরু করার জন্য। কেননা দল তখনও পিছিয়ে আছে ২-১ ব্যবধানে।

নেইমার জাতীয় দলে খেলা শুরু করেছেন ২০১০ সালে, ম্যাচ খেলেছেন ১৩০টি, তাতে গোল করেছেন রেকর্ড ৮০টি। নিঃসন্দেহে ব্রাজিলের একজন লিজেন্ড তিনি। অন্যদিকে, রোমেরো আর্জেন্টিনা দলে খেলছেন ২০২১ সাল থেকে, এ পর্যন্ত খেলেছেন ৫৫টি ম্যাচ। কিন্তু দলের জন্য নিবেদনের দিক থেকে দু’জনের মানসিকতায় যে পরিবর্তন, সেটা বিশ্বকাপের মতো আসরে যেভাবে ফুটে উঠেছে, সেটা নেইমার এবং নেইমার ভক্তদের জন্য স্বস্তির হবে না নিশ্চিত।