ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬

সুইজারল্যান্ডের বাধা পেরোতে পারবে আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপের নকআউটে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে পরপর দুটি রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নেওয়ার পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের লড়াকু দল সুইজারল্যান্ডের। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা ফেবারিট হলেও সুইজারল্যান্ড যে ছেড়ে কথা বলবে না তার প্রমাণ এই টুর্নামেন্টেই তাঁরা দিয়েছে। তাই সোমবার সকাল ৭টায় (বাংলাদেশ সময়) এই দুই দলের মাঝে দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি কোয়ার্টার ফাইনাল দেখার প্রত্যাশা করতেই পারেন ফুটবলপ্রেমীরা।

একদিকে ৩৯ বছর বয়সেও অবিশ্বাস্য ফর্মে থাকা লিওনেল মেসি, অন্যদিকে পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটের জন্যও পিছিয়ে না পড়া এক অপরাজেয় সুইস দেওয়াল। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচকে সামনে রেখে চলুন জেনে নেওয়া যাক দু'দলের শক্তি-সামর্থ্য কেমন, আর পরিসংখ্যানের দিক থেকেও তাঁদের অবস্থন কোথায়?

নকআউটে আর্জেন্টিনার ছন্দপতন

গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়া, জর্ডান আর আলজেরিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নকআউটের টিকিট পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু নকআউট পর্বে আসতেই যেন চেনা ছন্দ হারায় আলবিসেলেস্তেরা। রাউন্ড অব থার্টি টুতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে ৩-২ গোলের জয়, আর রাউন্ড অফ সিক্সটিনে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ৩-২ ব্যবধানে উদ্ধার পাওয়ার মাধ্যমে শেষ আটের টিকিট পায় আর্জেন্টিনা। 

নকআউটের এই দুই ম্যাচে একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার হার-না-মানা মানসিকতা এবং দলগতভাবে একসাথে লড়াই করার সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে তাঁদের রক্ষণভাগের দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে তৈরি আক্রমণভাগই আর্জেন্টিনার মূল শক্তি।

সুশৃঙ্খল সুইজারল্যান্ড 

সুইজারল্যান্ড এবার বিশ্বকাপের অন্যতম সুশৃঙ্খল দল। গ্রুপ পর্বে কানাডা ও বসনিয়াকে হারিয়ে এবং নকআউটে আলজেরিয়া ও কলম্বিয়াকে বিদায় করে দিয়ে ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে তারা। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে মূল পর্বে এখন পর্যন্ত একবারের জন্যেও কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়েনি সুইসরা। ম্যাচের আগে সুইস কোচ মুরত ইয়াকিন তো সরাসরি হুঙ্কার দিয়ে রেখেছেন, 'আর্জেন্টিনা অপরাজেয় নয়।' 

মাঝমাঠে অধিনায়ক গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে বল হোল্ড করে আক্রমণে উঠতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সুইজারল্যান্ড। তবে বলের পজেশন হারালে মাঝমাঠ কমপক্যাক্ট রেখে মিড-ব্লক ডিফেন্সিভ কৌশলে খেলতে সিদ্ধহস্ত কোচ মুরাত ইয়াকিনের দল। 

৩৯ বছর বয়সী মেসির ক্লান্তি ও কান্না

বয়স ৩৯ হলেও লিওনেল মেসি প্রমাণ করছেন তিনি এখনও অনন্য। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে এখন পর্যন্ত ৫ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল পেয়েছেন এলএমটেন। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৫ ম্যাচে ৮ গোল করে মেসি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন। 

তবে মিশর ম্যাচের পর মাঠেই মেসির কান্নার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, এই দলটিকে টেনে নিয়ে যেতে কতটা চাপ নিতে হচ্ছে তাকে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের হাই-ভোল্টেজ লড়াই, আর মিশরের বিপক্ষে মহাকাব্যিক ম্যাচের পর এই বয়সে মেসির জন্য ক্লান্তি কতটুকু বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

হেড-টু-হেড: ইতিহাস কী বলে?

পরিসংখ্যান অবশ্য পুরোপুরি আর্জেন্টিনার পক্ষে। দুই দল এ পর্যন্ত মোট ৭ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি ম্যাচই জিতেছে আর্জেন্টিনা, বাকি ২টি হয়েছে ড্র। বিশ্বকাপে এর আগে তাঁদের দেখা হয়েছে দুবার (১৯৬৬ এবং ২০১৪), দুবারই শেষ হাসি হেসেছে আলবিসেলেস্তারা। 

২০১৪ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে অতিরিক্ত সময়ে আনহেল দি মারিয়ার গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের স্কোয়াড থেকে বর্তমানে টিকে আছেন ৩ জন খেলোয়াড়- আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি এবং সুইজারল্যান্ডের গ্রানিত জাকা ও রিকার্দো রদ্রিগেস।

ট্যাকটিক্যাল লড়াই ও সম্ভাব্য একাদশ

কোচ লিওনেল স্কালোনির মূল মাথাব্যথার কারণ রক্ষণভাগ। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অন টার্গেট শট ফেস করেছে মাত্র ৯টি, কিন্তু এর মধ্যে ৫টিতেই তাঁরা গোল হজম করেছে। অর্থাৎ, ডিফেন্স ভেঙে বল ভেতরে ঢুকলেই বিপদে পড়ছে দল। 

অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের বড় শক্তি মাঝমাঠে অধিনায়ক গ্রানিত জাকার উপস্থিতি, যিনি এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৫টি লাইন-ব্রেকিং পাস দিয়েছেন। তবে আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে সুইসদের জন্য বড় ধাক্কা ইনজুরির কারণে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ২০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার জোহান মানজাম্বির অনুপস্থিতি। 

আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ (৪-১-৩-২):

এমি মার্তিনেস (গোলকিপার); মলিনা, রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, তাগলিয়াফিকো; পারেদেস; দি পল, এনসো ফার্নান্দেস, ম্যাক অ্যালিস্টার; মেসি, লাউতারো মার্তিনেস

সুইজারল্যান্ডের সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১):

কোবেল (গোলকিপার); জাকারিয়া, এলভেদি, আকানজি, রদ্রিগেস; ফ্রয়লার, জাকা; ভার্গাস, রিডার, এনদয়ে; এমবোলো

জয়ের সম্ভাবনা কার কত?

অপ্টা সুপারকম্পিউটারের ২৫ হাজার সিমুলেশন অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ। সুইজারল্যান্ডের সরাসরি জয়ের সম্ভাবনা ১৮ শতাংশ এবং ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে সেমিফাইনালে যাওয়ার দৌড়ে ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ এগিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরাই। উল্লেখ্য, এই ম্যাচের বিজয়ী দল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচের বিজয়ী দলের বিপক্ষে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মেসি কি পারবেন সব ক্লান্তি ভুলে আর্জেন্টিনাকে আরও একবার সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে, নাকি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে ইতিহাস গড়বে সুইজারল্যান্ড? উত্তরটা মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।