চার বছর পর পর আসে বিশ্বকাপ ফুটবলের এক একটি আসর। বিশ্বকাপ মানেই ফুটবলের টানটান উত্তেজনা, চোখ ধাঁধানো গোল, আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ। এবারের ৪৮ দলের এই টুর্নামেন্টের ১০৪ ম্যাচের ১০০টি ইতোমধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ একদিকে যেমন উপহার দিয়েছে মাঠের দুর্দান্ত সব জাদুকরী ফুটবল, অন্যদিকে জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু বিতর্কেরও।
মাঠের বাইরের নাটক, বিতর্ক আর বিশ্ব ফুটবলের নীতিনির্ধারক ফিফার কিছু অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছে ফুটবল বিশ্ব। এবারে চলুন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ৫টি বিতর্ক নিয়ে কথা বলা যাক।
রেফারিকে ভিসা না দেওয়া এবং ফিফার নীরবতা
তালিকার প্রথম বিতর্কটি ফুটবল মাঠের বাইরের, কিন্তু এটি পুরো টুর্নামেন্টকেই কলঙ্কিত করেছে। ২০২৫ সালের আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিএএফ) বর্ষসেরা রেফারি নির্বাচিত হন সোমালিয়ার ওমর আব্দুল কাদির আরতান। এবারের বিশ্বকাপেও ম্যাচ পরিচালনার কথা ছিল তাঁর। অথচ, বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বলি হতে হয়েছে তাকে। প্রশাসন থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তার বিরুদ্ধে অদ্ভুত অভিযোগ আনা হয়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় কী জানেন? ফিফা কিন্তু তাঁদের অন্যতম সেরা এই রেফারির পাশে দাঁড়ায়নি।
উল্টো ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সমালোচকদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘চিল অ্যান্ড রিল্যাক্স’, অর্থাৎ ‘এত মাথা না ঘামিয়ে আরাম করুন।’ একজন বিশ্বমানের রেফারির সাথে এমন আচরণ ফুটবল বিশ্ব সহজে মেনে নেয়নি।
বালোগানের লাল কার্ড ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ- ফিফার এই নিয়ম আমরা সবাই জানি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফিফাকে মাথা নত করতে দেখা গেছে।
এবারের টুর্নামেন্টের রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিপক্ষে আমেরিকার তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছেড়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর পরের ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ থাকার কথা।
কিন্তু ট্রাম্প সরাসরি ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেন। এরপর ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি বালোগানের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে।
উয়েফা ও বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বিষয়টির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাঁরা বলেছে, ফিফা এক্ষেত্রে ‘রেড লাইন ক্রস করেছে’। যদিও রাউন্ড অফ সিক্সটিনে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে আমেরিকা, কিন্তু এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ ও ভিএআর বিতর্ক
এবারের বিশ্বকাপে ‘ভিএআর’ বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সবচেয়ে বড় ঝড়টা উঠেছে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের মধ্যকার রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচে। ম্যাচের ৬২ মিনিটে মিশর যখন ২-০ গোলে এগিয়ে তখন মিশরের মোস্তফা জিকো আরেকটি গোল করে ব্যবধান ৩-০ করার ঠিক পরেই ভিএআর হস্তক্ষেপ করে। প্রায় ১০০ গজ দূরে মাঠের অন্যপ্রান্তে হওয়া একটি ফাউলের জন্য রেফারি মিশরের তৃতীয় গোলটি বাতিল করে দেয়।
এরপর ম্যাচের শেষ দিকে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ৩টি গোল করে আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে নেয়। এমনকি তাঁদের জয়সূচক গোলটির ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনার বক্সের ভেতর মিশর অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ’র বিপক্ষে ফাউল না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক উঠে।
ম্যাচের পর মিশরের কোচ হোসাম হাসান এবং অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। সার্বিকভাবে এই ম্যাচে ভিএআর-এর ভূমিকা নিয়ে ফুটবল সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
টিকিটের আকাশচুম্বী দাম
ফুটবলকে বলা হয় সাধারণ মানুষের খেলা। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের টিকিটের দাম দেখে মনে হচ্ছে এটি কেবল ধনকুবেরদের জন্য। এই যেমন, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া ফাইনাল ম্যাচের ক্যাটাগরি ২-এর একটি টিকিটের দাম রাখা হয়েছে প্রায় ৭,৩৮০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থের অংকটা ৯ লাখ টাকার ওপরে।
এ বছরের এপ্রিলে ফিফার রিসেল মার্কেটে চারটি টিকিটের এক একটির দাম উঠেছিল ২০ লাখ ডলার। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করলেও এই আকাশছোঁয়া দামের পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরেন।
টিকিটের এই অতিরিক্ত দামের বিরুদ্ধে ফ্যান গ্রুপগুলো মামলা পর্যন্ত করেছে। এমনকি নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্য ফিফাকে এ বিষয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। অতিরিক্ত লোভের কারণে সাধারণ ফুটবল ভক্তদেরকে ফুটবল থেকেই দূরে ঠেলে দেওয়ার এই মানসিকতার জন্য ফিফাকে চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
বিজ্ঞাপনের জন্য হাইড্রেশন ব্রেক?
এই বিশ্বকাপের আরেকটি আলোচিত বিতর্ক হলো ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা খেলোয়াড়দের পানি পানের বিরতি। আপাতদৃষ্টিতে একে খেলোয়াড়দের কল্যাণে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্যিক খেলা।
ফিফা নিয়ম করেছে, তাপমাত্রা যাই হোক না কেন, প্রতি অর্ধে ৩ মিনিটের একটি বাধ্যতামূলক বিরতি থাকবে। আমেরিকার ডালাস বা ভ্যানকুভারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ইনডোর স্টেডিয়ামেও এই বিরতি দেওয়া হচ্ছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আসলে খেলাকে চার কোয়ার্টারে ভাগ করে টিভি চ্যানেলগুলোকে কোটি কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দেওয়ার একটা ফাঁদ মাত্র, যা ফুটবলের স্বাভাবিক গতি ও ছন্দকে নষ্ট করছে।
মাঠের ফুটবলের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে মাঠের বাইরের এসব বিতর্কের জন্যেও ফুটবল ভক্তরা এবারের বিশ্বকাপকে মনে রাখবে। আপনার চোখে এর মধ্যে কোন বিতর্কটি সবচেয়ে দৃষ্টিকটু লেগেছে, কমেন্টে জানান।