এমবাপ্পে, ইয়ামাল, এমনকি লিওনেল মেসিকেও পেছনে ফেলে ২০২৬ ব্যালন ডি’অর জিতে নিলেন হ্যারি কেইন! ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর এই প্রথম কোনো ইংলিশ ফুটবলার জিতলেন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার এই ব্যক্তিগত পুরস্কার।
এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়। মেজর কোনো আন্তর্জাতিক বা মহাদেশীয় ট্রফি না জিতেও হ্যারি কেইনের এই ব্যালন ডি’অর জয় কি সত্যিই নায্য ছিল? নাকি অন্য কেউ এই পুরস্কারের বেশি যোগ্য ছিলেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক, কেন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের মুকুট উঠল হ্যারি কেইনের মাথায়!
গোলের অবিশ্বাস্য ক্ষুধা
শুরুটা করা যাক পরিসংখ্যান দিয়ে। গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখ এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সিতে হ্যারি কেইন যা করেছেন, তাকে এক কথায় ‘অতিমানবীয়’ বললেও কম বলা হয়। গত মৌসুমে শুধু বায়ার্নের হয়ে কেইন করেছেন ৬১ গোল। এক মৌসুমে বায়ার্নের কোনো খেলোয়াড় এর আগে এত গোল করতে পারেননি। বুন্দেসলিগায় ৩৬ গোল করে শুধু সর্বোচ্চ গোলদাতাই হননি, জিতেছেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটও।
শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, জাতীয় দলের জার্সিতেও কেইন ছিলেন বিধ্বংসী ফর্মে। ইংল্যান্ডের হয়ে গত মৌসুমে করেছেন ১২ গোল। ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ৭৩! সঙ্গে রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্ট। ফুটবল ইতিহাসে এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি গোল করতে পেরেছেন শুধু একজন, তিনি লিওনেল মেসি। ২০১১-১২ মৌসুমে ৮২ গোল করেছিলেন সাবেক আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তাহলে বিতর্কটা কোথায়?
শুধু গোলের পর গোল করেই থামেননি কেইন। জিতেছেন বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ আর সুপার কাপ। এরপরও বিতর্কটা কোথায়? বিতর্কটা মূলত ট্রফি নিয়ে। কেইন গত মৌসুমে ট্রেবল জিতলেও সেটা ছিল ঘরোয়া টেবল। গত মৌসুমের সবচেয়ে বড় দুই ট্রফি- বিশ্বকাপ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ— কোনোটারই স্বাদ পাননি তিনি। দুটি টুর্নামেন্টেই সেমিফাইনালে দলকে হারতে দেখেছেন কেইন। আর সে কারণেই ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এমবাপ্পে বা লামিন ইয়ামালদের সঙ্গে তাঁর লড়াইটা বেশ জমে উঠেছিল।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান কেমন ছিল?
কেইনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে দারুণ একটা মৌসুম কাটানো এমবাপ্পে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন, বিশ্বকাপেও জিতেছেন টানা দ্বিতীয় গোল্ডেন বুট। কিন্তু রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে যেমন কোনো শিরোপা জিততে পারেননি, তেমনি ফ্রান্সও হেরেছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
অন্যদিকে, ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে গত মৌসুমে ২৬ গোল ও ২১ অ্যাসিস্ট করেছেন। ক্লাবের হয়ে লা লিগা জিতেছেন, আর দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপ। কিন্তু স্পেনের সেই বিশ্বকাপ জয়ে ইয়ামালের প্রভাব কতটুকু, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ছিল ভোটারদের কাছে!
আর মেসি? ৩৯ বছর বয়সেও ৪৪ গোল আর ৩০ অ্যাসিস্ট করেছেন। বিশ্বকাপে ৮ গোল করে আর্জেন্টিনা প্রায় ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেই ফাইনালে তুলেছিলেন। তবে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে তেমন কিছুই করতে পারেননি এমএলটেন। ক্লাবের জার্সিতেও অবশ্য সফল ছিলেন মেসি। মায়ামিকে এনে দিয়েছেন প্রথম এমএলএস কাপ। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার হার এবং মেসির এমএলএসের পারফরম্যান্স ভোটারদের কাছে কতটা ওজন পেয়েছে, সেটাও প্রশ্ন।
হ্যারি কেইনের ব্যালন ডি’অর জয় কি তাহলে নায্য ছিল?
তাহলে শেষ পর্যন্ত হ্যারি কেইনই কেন ব্যালন ডি’অর জিতলেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যালন ডি’অরের মূল দর্শনে। এই পুরস্কার শুধু ট্রফির সংখ্যা গোনার জন্য নয়; বরং পুরো এক বছরে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব, মাঠে তাঁর প্রভাব এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি। কেইন কেবল গোলই করেননি, দলের খেলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, নিচে নেমে বল তৈরি করেছেন এবং সংকটময় মুহূর্তে বায়ার্ন ও ইংল্যান্ডকে টেনে তুলছেন একা হাতে।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে তাই কেইনের ব্যালন ডি’অর জয়কে প্রশ্নবিদ্ধ বলা কঠিন। ৭৩ গোল, বায়ার্নের হয়ে রেকর্ড ভাঙা মৌসুম, জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপের সাফল্য— সব মিলিয়ে কেইনের পক্ষে যুক্তি ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী।
এটাও ঠিক যে, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে থাকলে তাঁর জয় আরও নিরঙ্কুশ মনে হতে পারত। কিন্তু ব্যালন ডি’অর জিততে সব সময় সব শিরোপা জিততে হয় না। তবে যে ফুটবলারকে একসময় শিরোপা না জেতার খোঁটা শুনতে হয়েছে প্রতিনিয়ত, তিনিই এখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে।