বাংলাদেশের দাবায় সবচেয়ে বড় কিংবদন্তির নাম সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন, রাণী হামিদ নামেই যাঁকে চেনেন সবাই। ৮১ বছর বয়সে দাবার বোর্ডে এখনও খেলে যাচ্ছেন এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ। তবে এবার ভারতে টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী আন্তর্জাতিক মাস্টার।
বার্ধক্যের কারণে রাণী হামিদ একা বিদেশে কোনো টুর্নামেন্ট খেলতে যান না। সব সময় একজন সঙ্গী রাখেন। এবার দিল্লি আন্তর্জাতিক ওপেন গ্র্যান্ড মাস্টার টুর্নামেন্টে তাঁর সঙ্গী ছিলেন আরেক বাংলাদেশি দাবাড়ু আছিয়া সুলতানা। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে নামতেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছে ৩৭ বছর বয়সী এই দাবাড়ুকে। দিল্লি ইমিগ্রেশন ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি আছিয়াকে, ফেরত পাঠিয়েছে বাংলাদেশে।
ভারতের গণমাধ্যম টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এই ঘটনায় রাণী হামিদ হতবাক এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দিল্লির জিএম ওপেনে নিজের ও আছিয়ার সঙ্গে ঘটে যাওয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন রাণী হামিদ।
ঈদের আগের দিন আছিয়া ও রাণী হামিদ দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু সেদিন রাতে আছিয়াকে দিল্লি বিমানবন্দরেই থাকতে হয়। ঈদের দিন সকালে তাঁকে দ্বিগুণ দামে টিকিট কেটে দেশে ফেরত যেতে বাধ্য করে দিল্লি ইমিগ্রেশন।
আছিয়ার বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া। ভারতের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসের (এফআরআরও) কালো তালিকায়ও রয়েছে আছিয়ার নাম। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, শেষ বার তিনি ভারতে এসেছিলেন মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে। কিন্তু কোনো চিকিৎসা করাননি তখন। উল্টো সে সময় কলকাতায় একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ফিরে যান। অসত্য তথ্য দিয়ে ভারতের আসার অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন আছিয়া।
দিল্লি বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া সেই অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কিংবদন্তি রাণী হামিদ টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘আমার অনেক খারাপ লাগছে। আমার সঙ্গে আসা ব্যক্তিকে ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ওকে ইমিগ্রেশন সেন্টারে রাত কাটাতে বাধ্য করা হয়েছিল। ওরা (ইমিগ্রেশন) ওকে ওর লাগেজও নিতে দেয়নি। পরের দিন, ওকে দ্বিগুণ দামে ফিরতি টিকিট কিনতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমার মন ভালো নেই এবং আমি খেলায় মনোযোগ দিতে পারছি না।’
সফরে তাঁর পাশে কেউ না থাকার কথা জানিয়ে রাণী হামিদ বলেন, ‘আমি কখনো একা ভ্রমণ করি না। আমার সাথে সবসময় কেউ না কেউ থাকে। ও আমার সাথে ছিল, আর এখন ও চলে গেছে। আমি একা রয়ে গেছি।’
এই ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের উপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাণী হামিদ। ইমিগ্রেশন চাইলে আছিয়াকে জরিমানা করতে পারত জানিয়ে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়া রাণী হামিদ বলেন, ‘ওর পাসপোর্ট পরিষ্কার ছিল, সমস্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু ইমিগ্রেশন ওকে বলেছিল, মেডিকেল ভিসায় পূর্ববর্তী একটি টুর্নামেন্টে খেলার জন্য ওকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।সেই সময় ও জানতও না যে এটি একটি নিয়মের লঙ্ঘন। যদি ওকে আগে জানানো হতো, তাহলে ও কখনও আসত না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনকে অবহিত করা।’
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কাছে নমনীয়তার জন্য আবেদনও করেছিলেন কিংবদন্তি এই দাবাড়ু, ‘আমি ওদের অনুরোধ করেছি, যদি আপনারা বিশ্বাস করেন যে ও নিয়ম লঙ্ঘন করেছে, তাহলে জরিমানা করুন, ১০০ ডলার, ২০০ ডলার, যা-ই হোক না কেন, কিন্তু ওকে সাত দিন থাকতে দিন এবং খেলতে দিন। ও অপরাধী নয়। ও কোনো অপরাধ করেনি। ও কাউকে হত্যা করেনি, চুরি করেনি, ডাকাতি করেনি। ওর একমাত্র অপরাধ হলো ও দাবা খেলেছে।’
এমন পরিস্থিতিতে খেলাতেও মনোযোগ দিতে পারছেন না রাণী হামিদ। চলমান এই টুর্নামেন্টে প্রাপ্তির তালিকায় ৬ রাউন্ডে এখন পর্যন্ত একটি জয় ও একটি ড্র।